শাওনের কাছে হুমায়ূনের প্রশ্নঃ যদি একা চলে যাই, সবছেড়ে? তুমি থাকবে?

প্রকাশঃ জুলাই ১৯, ২০১৭

সুমাইয়া আকরাম ।।

আজ প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। এমন দিনে তার স্ত্রী শাওন স্মৃতিতে ধারণ করলেন ভালবাসার সেই দিনগুলো, প্রেমের সময়, প্রেমের শুরু। হুমায়ূন আহমেদের বয়স যখন ৫০ প্রায় শয়ে সময় শাওনের প্রতি ভালবাসার অভিব্যক্তি করেন তিনি।

লেখক প্রেম নিবেদন করেন শাওনকে। সেসময় শাওনের অনুভূতি কি ছিল, কিভাবে তাকে তিনি প্রেম নিবেদন করেছিলেন, কেমন করে শাওন উত্তর দেন লেখকে সেসব কথা শাওন নির্দ্বিধায় তুলে ধরেন। কথা আর অনুভুতিগুলো নিয়ে নিচের কথাগুলো বলেন শাওন।

শাওন তখন দশম শ্রেণিতে। শাওন তখন স্কার্ট ফ্রক আর বেণিতে তার চলন। এই প্রজাপতি-সময়ে এমন একটি গভীর প্রশ্নের সামনে পড়ে, ধুকপুক বেড়ে যাবে- এ আর আশ্চর্য কী। আর প্রশ্নকর্তাটিও তো যে সে নন। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা লেখক, পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই হুমায়ুন আহমেদ।

প্রশ্নটি এবং প্রশ্নকর্তাকে আজও চোখের সামনে যেন ভাসতে দেখেন শাওন। ঢাকা ক্লাবের প্রশস্ত লনে এই প্রসঙ্গে তিনি কিছুটা স্মৃতিকাতরও। ‘উনি বলেছিলেন, গুহাচিত্র যাঁরা আঁকতেন, তাঁদেরও কাউকে লাগত ওই অন্ধকারে প্রদীপটা ধরে রাখার জন্য। যাতে সেই চিত্রকর নিজের কাজটা করতে পারেন। তুমি কি আমার জন্য সেই আলোটা ধরবে?’

তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল কিশোরী মেহের আফরোজ শাওনের পৃথিবী। চুপ করে থেকেছিলেন কয়েকটা দিন। ‘কী বলব বলুন! ওই কথার মর্মোদ্ধার করার মতো বয়সও নয় সেটা। তারই চার-পাঁচ দিন পর উনি আবার বললেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যদি একা চলে যাই, সবছেড়ে? তুমি থাকবে? আর কিন্তু উত্তর দিতে দেরি করিনি আমি। বলেছিলাম, থাকব। সবসময় থাকব।’

কথা রেখেছিলেন শাওন। হিমুর স্রষ্টা প্রবাদপ্রতিম এই মানুষটির হাত ছাড়েননি তাঁর মৃত্যু অবধি। তার অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের ঝড় উঠেছিল হুমায়ুনের দ্বিতীয় এবং অসমবয়সী বিবাহ নিয়ে। ছড়িয়েছিল অনেক রটনা, যা এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে শাওনকে।

সম্প্রতি যার প্রতিবাদ করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন শাওন নিজেই। ইরফান খান এবং বাংলাদেশি অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনীত চলচ্চিত্র ‘ডুব’ ছবিটিকে ছাড়পত্র না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সেন্সর বোর্ডে একটি চিঠি জমা দিয়েছেন তিনি। ‘ডুব’ নিয়ে শাওনের অভিযোগ, হুমায়ুন আহমেদের জীবনের কিছু স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সিনেমাটির চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছে, যার মাধ্যমে হুমায়ুন আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মানহানি ঘটতে পারে।

যে চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন তার ভাষা অনেকটা এ রকম, ‘বেশ কিছুদিন আগে কলকাতা ও বাংলাদেশের কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমে ‘ডুব’ সিনেমার নায়কের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। যেখানে চরিত্র ও কাহিনি বিন্যাসে প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের জীবনীকেই তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ছবিটির পরিচালক নিজে কখনও এই বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছুই বলেননি। আর আমার দুশ্চিন্তা মূলত এখানেই। আমি চাই না প্রয়াত স্বামী ও আমার জীবনের স্পর্শকাতর কোনও ঘটনা তুলে ধরা হোক যার কোনও ভিত্তি নেই। আর এ সব কারণেই ‘ডুব’ ছবি নিয়ে আমি আশঙ্কা প্রকাশ করেছি।’

তিনি বললেন, ‘আমি চাই না আমার সন্তান, পরবর্তী প্রজন্ম ভুল ধারণা নিয়ে বাঁচুক। হুমায়ুন আহমেদের মতো মাপের মানুষকে নিয়ে কোনও কাজ করতে হলে গবেষণা করা উচিত। আমি সেন্সর বোর্ডকে জানিয়েছি, যদি এই ছবি পরিমার্জন না করা হয়, আমি বাধা দিয়ে যাব।’

কী সেই স্পর্শকাতর ঘটনা?

এ বার আর স্মৃতিকাতরতা নেই। বরঞ্চ ঝাঁঝালো ক্ষোভ। ‘অনেক দিন ধরেই একটি গুজব সচেতন ভাবে ছড়ানো হয়েছে আমাদের লোকচক্ষে খাটো করার জন্য। এই ছবিটিও সে ভাবেই সাজানো হয়েছে। দেখানো হয়েছে, হুমায়ুন আহমেদের মেয়ের এক বান্ধবী তাঁদের বাড়ি আসত। সেখান থেকেই নাকি প্রেম। কি ডাহা মিথ্যা কথা এটা।’ শাওন জানান, কস্মিনকালেও হুমায়ুনের কন্যার সঙ্গে বন্ধুত্ব দূরস্থান, কোনও পরিচিতিও ছিল না। ‘থাকবেই বা কী করে! আমাদের স্কুল-কলেজ সবইতো আলাদা। পরিচয়ের সূত্রটাতো ছিল গান।’

রবীন্দ্রসঙ্গীতের অত্যন্ত ভক্ত ছিলেন হুমায়ুন। দিনভর প্রবল পরিশ্রমের মধ্যে সেটাই ছিল তাঁর বড় আশ্রয়ের জায়গা। সেখানেই গান দিয়ে দ্বার খুলেছিলেন শাওন। বা বলা ভাল, তিনি খোলেননি, দরজা খুলে গিয়েছিল আপনা হতেই। শাওন বলছেন, ‘সেই ক্লাস সিক্স এ পড়ার সময় থেকেই তো ওনার নাটকে অভিনয়, গান করি। ইউনিটের কেউ যদি গান জানতেন, উনি রিহার্সালের পর তাঁর কাছে শুনতে চাইতেন। সেই ভাবে আমার কাছেও অনেক বার শুনতে চেয়েছেন। আমি খুব চটপট গান তুলে নিতে পারতাম বলে আমার নাম দিয়েছিলেন টেপ রেকর্ডার!’ সেই ‘টেপ রেকর্ডার’ যে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কবে থেকে বাজতে শুরু করল হুমায়ুনের জীবনে, আজ আর তার সঠিক ঠাহর পান না শাওন। মাঝে মাঝে সিগারেটের রাংতায় হাতচিঠি দিতেন।

একবার লিখে দিয়েছিলেন সুনীলের লাইন- ‘ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে।’ হয়তো রিহার্সালের পর একা বসে খাচ্ছেন, আমি হয়তো এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছি কিছু লাগবে কি না। ছেলেমানুষের মতো খুশি হতেন। একটু যত একটু মায়া খুবই চাইতেন উনি।‘সেই মায়ার কি অভাব ঘটেছিল একটা সময়ে পৌঁছে? আজো অমর চরিত্রের এই স্রষ্টা কি মধ্যজীবন পার করে নিজেই হয়ে উঠছিলেন নিঃসঙ্গ কোনও চরিত্র?’

এভাবেই ভালবাসার প্রারম্ভ করেন হুমায়ূন-শাওন।

Advertisement

কমেন্টস