বেঁচে থাকুক এই ছন্নছাড়া হিমু !

প্রকাশঃ জুলাই ১৯, ২০১৭

সুমাইয়া আকরাম।।

সেইদিন বৃষ্টি ছিল, আজো! সময় আর স্রোত বয়ে যায় কিন্তু থেকে যায় কর্ম, নাম আর ভালবাসা। যেমন ভালবাসার মিতালি করে শব্দ বুনতেন তিনি। নিমিষেই বানিয়ে ফেলতেন কোন গল্প কিংবা কাব্য। তিনি ছিলেন লাখো পাঠকের প্রাণের লেখক। তবে আর নেই প্রিয় লেখক। আর ফিরে এলেন না তিনি। শায়িত হলেন প্রিয় লিচুতলায়। আজ তার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি নন্দিত কথা সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার হুমায়ূন আহমেদ।

খালি পায়ে পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো হিমুর জনক এই হুমায়ূন। অন্যদিকে যুক্তিবাদী মানুষ মিসির আলীকেও ফুটিয়ে তুলেছেন ঠিক হিমুর বিপরীতভাবে। যেই হিমু যেমন যুক্তি মানে না তার বিপরীত চরিত্র মিসির আলী যুক্তির বাইরে হাঁটেন না। কিন্তু এদের থেকে আলাদা ছিল মোটা ফ্রেমের চশমা পরে বইয়ের মাঝে ডুবে থাকা শুভ্র। নিজেকে পৃথিবীর যাবতীয় জটিলতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টায় রত শুভ্রদের পরিচয় করিয়েছেন এই লেখক।

বাংলাদেশে বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম হুয়ায়ূন ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোণা মহুকুমার কেন্দুয়ার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজের প্রথম সন্তান তিনি। হুমায়ূন আহমেদের ভাই বোন ছিল ড. জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব এবং তাদের তিন বোন। তাদের বাবা পুলিশ অফিসার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি।

হুমায়ূন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। নব্বই দশকের মাঝামাঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে লেখালেখিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেন। পারিবারিক জীবনেও তিনি সুখী ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। তাঁদের বিয়ে হয় ১৯৭৩। এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং এক ছেলে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ। অন্য আরেকটি ছেলে মারা যায়। ১৯৯০ মধ্যভাগ তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫ এ গুলতেকিনের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয় এবং ঐ বছরই শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যাটি মারা যায়। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।

তবে সুখের জীবন শেষ হতে শুরু করে তার। হুমায়ূন আহমেদের শরীরে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপর তিনি উন্নত চিকিত্সার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান সেখানে ২০১২ সালের জুলাই মাসের ১৬ তারিখ তিনি চলে যান লাইফ সাপোর্টে। সে অবস্থাতেই ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে এগারোটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিউইয়র্ক থেকে ২০১২ সালের ২৩ জুলাই দেশে ফিরিয়ে আনা হয় হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। পরদিন তাকে সমাহিত করা হয় তারই গড়ে তোলা নন্দনকানন নুহাশ পল্লীর লিচুতলায়।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনকও বটে। উপন্যাসে ও নাটকে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো বিশেষ করে ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’, ‘শুভ্র’ তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে ওঠে অনুকরণীয়। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, জোছনা ও জননীর গল্প প্রভৃতি। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে আগুনের পরশমনি, শ্যামল ছায়া, ঘেটুপুত্র কমলা প্রভৃতি। আশির দশকের মাঝামাঝি তাঁর টিভি নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ তাঁকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে হুমায়ূন আহমেদ ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্র পরিচালনা ও চিত্রনাট্য করে গিয়েছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে- শঙ্খনীল কারাগার, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, শ্যামল ছায়া, নন্দিত নরকেও ঘেটু পুত্র কমলা।

লেখক বলেছিলেন, ‘মানুষের যা করতে ইচ্ছা হয় তা করা উচিত, মানুষ আর বাঁচে কতদিন?’ জীবনের নানান সময়, চরাই উৎরাই পার করে জীবনের স্বাদ নিতে শিখেছিলেন তিনি। জীবনকে নিয়ে, জীবনের উপলব্ধি নিয়েই শুধু ক্ষ্যান্ত ছিলেন না তিনি। লিখেছেন হাজারো পাতা। ভালবাসা, প্রেম, মনুষ্য ও জীবনকে তুলে এনেছিলেন বইয়ের পাতায়। পাঠকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ত বইমেলায়, হুমায়ূনের নতুন বইয়ের জন্য। সেই হুমায়ূন আজ আর নেই, নেই কোন নতুন বই, কোন উক্তি আর উপলব্ধি।

হুমায়ূন আহমেদের পাঠকদের কাছে তার দেখানো পথ বেশ উত্তম। তার পথ অনুসরণ করেই বেরিয়ে আনতে হবে আমাদের হিমু, মিসির আলী ও শুভ্রকে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মত আজীবন আগলে থাকবে হুমায়ূন। খালি পায়ে বের হয়ে রাতের আকাশে জ্যোৎস্না দেখা হিমু। মিসির আলীর অমীমাংসীত রহস্য সমাধান আর মোটা চশমার আড়ালের শুভ্র কখনো হারাবে না।

আজ হুমায়ূন আহমেদ নেই, আছে তার ভালবাসা আর তার সৃষ্টি। এই সৃষ্টিই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে হাজারো বছর। বেঁচে থাকুক এই হিমু ও শুভ্র!

Advertisement

কমেন্টস