‘অপু’ অভিশাপে ‘সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু’ এবার শাকিবের পালা!

প্রকাশঃ মে ১০, ২০১৭

সুমাইয়া আকরাম ।।

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আর রাজনীতি দুইটি বিষয়ই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকাই চলচ্চিত্র জগৎ-এ এমন অনেক দৃষ্টান্ত যুগে যুগে ধরে হয়ে এসেছে। সাফল্য, সম্ভাবনা ও প্রতিভায় নিজেকে ঢালিউডে প্রমাণ করেছেন এমন নায়কের অভাব নেই গোটা সিনেমাঞ্চলে কিন্তু হারিয়েও গিয়েছে অনেক নাম, অনেক অভিনেতা। জানা অজানাভাবে অনেকে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছুতে গেলেই ছিটকে পড়েছেন ‘চক্রান্তের অন্তরালে’। শিকার হয়েছেন রাজনীতি ও ঈর্ষার, এরপর আড়াল হয়ে হারিয়ে গেছেন কেউ আর কেউ হারিয়েছেন প্রাণ। কাজের জন্য অভিনয়ের জন্য প্রাণ দিয়েও এখনো ঘুচেনি সে সিনেমা রাজনীতি। এটি অবিচ্ছেদ্য, অবিরাম এবং চলমান।

কিন্তু এমনটা কেন হয়? বিষয়টি অনেকটাই অনৈতিক কিন্তু আপেক্ষিক। পৃথিবীতে দ্রুত সফলতা পাওয়ার উদাহরণ খুব কমই আছে। নিজে সফলতা না পেলে অনেকেই পথভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েন। মানসিকতা ঠিক রাখা কিংবা স্বাভাবিক চিন্তা চেতনা যখন কাজ করে না তখনই মানুষ ভুল পদক্ষেপ কিংবা নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে যান। এমনটাই ধরা হয় এই সিনেমার জগতের ক্ষেত্রেও। কে কখন সফলতা পাবেন আর কে কখন তা হারিয়ে ফেলবেন বিষয়টি স্থায়ী নয়। ক্ষণস্থায়ী এই সমস্যার মূলে এমন কিছু মূলমন্ত্র কাজ করে যা অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হতে বাধ্য করে। নিজের সাফল্যের আশায় অন্যের ক্ষতি করে বসেন। তাই তো রাজনীতির ময়দান আর সিনেমার জগতকে একই গণ্য করা হয়।

বিব্রতকর পরিস্থিতিকে বুঝে বিবেচনা করে সঠিক পথে স্থির থাকতে হয় যারা সেটি  পারেন তারা সফল হন। কিন্তু যারা আত্মসমর্পণ করে নিজেকে ঘুচিয়ে নেন তারা টিকে থাকেন না এই সুক্ষ রাজনীতির মাঠে। সাফল্য তাদের ধরা দেয় না, তারা হারিয়ে যান।

উপরের লেখা আর শিরোনাম দেখে মনে প্রশ্ন আসতে পারে সিনেমা রাজনীতি নিয়ে লেখায় অপু আসলো কোথা থেকে? ঢালিউড, ঢাকাই চলচ্চিত্র জগতের রূপালি পর্দায় অনেক নাম হারিয়ে যাওয়ার পেছনে একটাই কারণ এই সুক্ষভাবে বোনা ‘অপু’ রাজনীতির জাল। যে ‘অপু’  চক্রান্তের কারণেই ঢাকাই ছবির অনেক নায়ক, তার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়েছে আর অনেকে হারিয়েছেন প্রাণ। কিন্তু এর ফলে চলচ্চিত্র হারায় প্রতিভাবান নায়ক, দর্শকরা হারায় তাদের প্রিয় তারকা।  এমনই কয়েকটি নাম হল ঢাকাই ছবির সোহেল চৌধুরী, সালমান শাহ, রিয়াজ, শাকিল খান এবং সর্বশেষ সময়ের আলোচিত ও জনপ্রিয় চিত্রনায়ক শাকিব খান।

৯০’এর দশকের জনপ্রিয় তারকা অভিনেতা ছিলেন সোহেল চৌধুরী। ১৯৮৪ সালে শুরু হয় তার সিনেমার দুনিয়ায় পথ চলা। সাফল্য পেলেও খুব বেশি সময় আর তা ধরে রাখতে পারেননি। মাত্র কয়েক বছর কাজ করেই ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর খুন হন এ নায়ক, হারিয়ে যান চলচ্চিত্র জগত থেকে।

সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু অতঃপর শাকিব নিষিদ্ধের আড়ালের গডফাদার কারা ?

১৯৮৪ সালে বিএফডিসি এর একটি কর্মসূচি ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ এর মাধ্যমেই সোহেলের আগমন, সাথে ছিলেন অভিনেত্রী দিতিও। একসাথে তাদের পথচলায় দিতি নিজেকে দৃড় অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। একসময় দিতি-সোহেল নিয়ে অনেক কথাও হতো। এমনকি দু’জনে বিয়ে করেন কিছু সময় পর। তবে দিতিকে ছেড়ে পরপারে হারিয়ে যান সোহেল চৌধুরী। ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের আবেদীন টাওয়ারে ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে সোহেলকে গুলি করে হত্যা করে শত্রুপক্ষ। তবে অভিনেতা সোহেল খুন হওয়ার পর চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে কথিত এক বান্ধবীকে নিয়ে এক ক্লাবের মধ্যে সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের তর্কাতর্কি হয়। তখন উত্তেজিত হয়ে সোহেল ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে গালাগালি করেন। তার প্রতিশোধ হিসেবে সোহেলকে হত্যা করা হয়।

ঘটনার দিন সোহেলের ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেন। কিন্তু অভিযোগ গঠনের পর মামলা খারিজ চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করে আসামি পক্ষ যার দরুণ নিন্ম আদালতে আটকে যায় বিচার। আর সেই মামলা আজ প্রায় দুই দশক সময় পরেও সুরাহা পায়নি। এই নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আইনজীবীরা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানাতেও ব্যার্থ।

১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবুল কাশেম ব্যাপারী ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। অন্য আসামিরা হলেন- ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলাম ও আশীষ চৌধুরী, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, আদনান সিদ্দিকী, তারিক সাঈদ মামুন, সেলিম খান, হারুন অর রশীদ ওরফে লেদার লিটন ও ফারুক আব্বাসী। মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, আসামিদের মধ্যে ইমন কারাগারে এবং আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ সাত আসামি জামিনে আছেন তবে আশীষ চৌধুরী পলাতক।

পরবর্তীতে ঢালিউডে রাজ করেন কিংবদন্তী অভিনেতা সালমান শাহ। তিনি যেন ছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের মুকুটবিহীন সম্রাট। তবে সাফল্যে গাঁথায় তার নাম বেশিদিন থাকেনি মিডিয়াঙ্গনে। আজিজ মোহাম্মদ ভাই সোহেল চৌধুরীর খুনের মামলায় আসামীর নাম যুক্ত হয় সালমানের সাথে। এই অভিযুক্তের ব্যক্তির হাতেই নিহত হন নায়ক সালমান শাহ এমনটাই তখন কথা উঠেছিল।

সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু অতঃপর শাকিব নিষিদ্ধের আড়ালের গডফাদার কারা ?

বাংলা চলচ্চিত্রের এক অবিস্মরণীয় নাম সালমান শাহ। নিজ প্রতিভাগুণ ও সুদর্শন চেহারায়  শীর্ষ নায়কের তালিকায় নামভুক্ত হন। জীবিত থাকাকালীন নানা ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়েন সালমান বারবার। কতিপয় পরিচালক ও প্রযোজক মিলে তাকে কোণঠাসা করে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এমনকি তিনি নিষিদ্ধ নায়কের তালিকায়ও ছিলেন একসময়। সেই নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন  নায়ক তবে মেলেনি শেষ রক্ষা। খুন হন অভিনেতা তবে আজ সেই খুনের পর্দা ফাঁস হয়নি। খুনের রহস্য মেলেনি এখনও। তবে অভিনেতার এমন আকস্মিক রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনের কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় তার স্ত্রী সামিরা!

অভিনেতা সালমান শাহ মাত্র ২১ বছর বয়সে তার মা নীলা চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর মেয়ে সামিরাকে বিয়ে করেন। সেই সময় আলোচিত দম্পতি হিসেবে তারা ছিলেন শীর্ষে। সালমান-সামিরা নিয়ে সকলেই কথা বলতেন। কিন্তু সালমান শাহর স্ত্রী সামিরার সঙ্গে বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং এ দু’জন মিলে সালমানকে হত্যা করেছে এমনটা জানা যায়। অপরদিকে সামিরা পুরো ঘটনার জন্য সালমান-শাবনুরের প্রেমকে দায়ী করেন।

সালমানের মৃত্যুর পর তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যু মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে মা নীলা চৌধুরী সালমানের স্ত্রী, শ্বশুর, শাশুড়িসহ কয়েকজনকে আসামি করে আদালতে হত্যা মামলাও করেন। সে মামলায় দায়ী করা হয় সালমানের স্ত্রী সামিরাকে। তবে মামলা সুরাহা হওয়ার আগেই দেশান্তরিত হয়েছিলেন স্ত্রী সামিরা। সে সময়ে নিজেকে নির্দোষ ও নিষ্পাপ বলে দাবি করেন সামিরা। বর্তমানে সামিরা সুখে শান্তিতে পরিবারের সাথে ভিনদেশে ভাল সময় কাটাচ্ছেন।

সালমান শাহের মৃত্যু নিয়ে তার মা নীলা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমান শাহের লাশ পাওয়া গেলেও তার মৃত্যু কোনো আত্মহত্যা ছিল না সেটা পুরো স্পষ্ট। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই এবং এ হত্যার পেছনে সালমানের খুব কাছের মানুষ জড়িত এবং আগে থেকে কেউ কেউ কিছুটা টেরও পেয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা রহস্য সেই হত্যাটা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হল! এই হত্যার বিচার আজও হয়নি এবং হয়তো আগামীতেও হবে না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।’

প্রয়াত সালমান শাহ’র স্ত্রী সামিরা হক এখন থাইল্যান্ড প্রবাসী। সালমানের মৃত্যুর কয়েক বছর পর বিয়ে করেন মুস্তাক ওয়াইজ নামক এক ব্যক্তিকে যিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। বিয়ের পর থাইল্যান্ডে ঘর বাঁধেন সামিরা। তার নতুন সংসারে আছে তিন ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে আর দুজন মেয়ে।

সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু অতঃপর শাকিব নিষিদ্ধের আড়ালের গডফাদার কারা ?

এরপর আসেন একে একে রিয়াজ, শাকিল খান। চলচ্চিত্র জগতে এখনো রিয়াজের কথা মনে পড়ে সকলের। বেশ সফলতা পেয়েছিলেন রিয়াজ। তিনি ১৯৯৫ সালে ‘বাংলার নায়ক’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ করেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত করে। তবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই কৌশলে এক বিশিষ্ট মহল  রিয়াজকে সরিয়ে দেয় সিনেমা থেকে।

নিজের কর্মজীবনে রিয়াজ নায়িকা শাবনুরের সাথে বেশ কয়েকটি সিনেমা করেছিলেন যার জের ধরে তুমুল হিট জুটি হিসেবে গুঞ্জন উঠে তাদের প্রেমের। তখন থেকেই তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে প্রেমের নামে শুরু হয় বির্তক।  এমনকি তাদের প্রেম ও গোপন বিয়ের খবর ঝড় তুলেছিল ২০০০ সালের প্রথম পর্যন্ত চলচ্চিত্র এবং এ অঙ্গনের বাইরে। তবে একসময় জুটি ভেঙে যায় তাদের। ফলাফল তারাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যান শীর্ষস্থান থেকে। এছাড়া পূর্নিমার সাথেও তার সম্পর্কের খবর কিছুদিন লোকমুখে শোনা গিয়েছিল। তবে রিয়াজ ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর ২০০৪-এর বিনোদন বিচিত্রার ফটো সুন্দরী বিজয়ী মডেল মুশফিকা তিনাকে বিয়ে করে সংসারী হন এবং সকল গুঞ্জনের অবসান ঘটে কিন্তু হারানো নাম আর ফিরে পাননি তিনি। বর্তমানে চলচ্চিরে থেকে দূরেই আছেন কিছুটা রিয়াজ।

সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু অতঃপর শাকিব নিষিদ্ধের আড়ালের গডফাদার কারা ?

অনেকটা একই অবস্থা হয়েছিল অভিনেতা শাকিল খানের সাথেও তবে বর্তমানে ভাল আছেন তিনি। ‘রোজ হারবাল’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি, ঢাকার বাংলামোটরে অফিস। ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক কাজেও যোগ দিয়েছেন শাকিল খান। চট্টগ্রামে পাবলিক হাসপাতাল নামে একটি ক্লিনিক স্থাপন করেছেন যেখান থেকে দুঃস্থদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এ ছাড়া গাজীপুরে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে জমি কিনেছেন তিনি। কিন্তু কেন তিনি সিনেমা থেকে দূরে?

কেননা সালমান শাহের পর বেশ সম্ভাবনাময় নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শাকিল খান। চলচ্চিত্রের চক্রান্ত ও রাজনীতি রোষানলে বেশ এঁটেছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় তার আগমন। সিনেমাটিতে প্রথম সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন নায়িকা পপি। ১৯৯৭ সালেই ‘কুলি’ ছবির দ্বারা অভিনয়ে আসেন এই নায়িকা।  প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেন শাকিল-পপি জুটি। একইসাথে অনেক সিনেমা করে একে একে অনেক ব্যবসা সফল ছবি উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। আর সেই সময় শুরু হয় তাদের সম্পর্ক নিয়ে অনেক গুজব ও প্রেমের গুঞ্জন। কানাঘুষা একসময় মাথা চড়াও হয়। গোপনে বিয়ে করেছেন তারা এমনটা শোনা যেতে থাকে। যদিও তার সত্যতা মেলেনি আজও।

কারণ হিসেবে অনেকেই বলেন পপির মা ও পরিবার ছিলেন তাদের প্রেমের বিরুদ্ধে।  শাকিল খান একসময় নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সংসার ও পপিকে নিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনে পপিকে সময় দিতে গিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ফলে নির্মাতাদের ঠিকভাবে সময়ও দেয়া ও সিনেমায় কাজ করা সেভাবে হয়ে উঠছিল না। তাকে নিয়ে চলে ফিল্মি পলিটিক্স, এক সময় ভেঙে যায় জুটি। রাজনীতির কারণে শাকিল খান এখন শুধুই একজন সাবেক নায়ক।

সবশেষে এবার আসেন কিংবদন্তী ঢালিউদের সুপারস্টার শাকিব খান। গত কয়েকদিন ধরেই শিরোনাম জুড়ে শুধু শাকিব এবং শাকিব। এর কারণ কি?

গত শনিবার ২৯ এপ্রিল বিএফডিসির পরিচালক সমিতি শাকিব ইস্যু নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয় যে শাকিবের সাথে কাজ করা হবে না। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কুশলীদের সব সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এক যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সর্ব সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, যেহেতু চিত্রনায়ক শাকিব খান দেশের সমগ্র চলচ্চিত্র পরিচালকদের অসম্মান ও হেয় প্রতিপন্ন করে জাতীয় দৈনিকসহ মিডিয়াতে বক্তব্য দিয়েছেন। বর্তমানেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সব কুশলী মনে করেন, শাকিব দেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কুশলীদের তুচ্ছজ্ঞান করেছেন। কারণ পরিচালকই হচ্ছেন ‘ক্যাপ্টেন অব দ্য শীপ’। তাদের অপমান করা মানে কুশলীদের অপমান করা। তাই আজ থেকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকল সংগঠনের সদস্যরা অনির্দিষ্টকালের জন্য শাকিব খানের সাথে কোনো সিনেমার শুটিং ও ডাবিংয়ের কাজে অংশগ্রহণ করবেন না।

সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু অতঃপর শাকিব নিষিদ্ধের আড়ালের গডফাদার কারা ?

মূলত গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিচালকদের বিপক্ষে শাকিবের কটূক্তি নিয়েই এই মামলা চলছে। শাকিব খানকে উকিল নোটিশ অতঃপর তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পরিচালক সমিতি। এরপর থেকেই শুরু হয় শাকিব খানের প্রতি নির্মাতাদের ক্ষোভ বেরোতে থাকে। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে বেশ সমালোচনা। এমনকি এর এর সুরাহা না করেই শাকিবকে নিষিদ্ধ করা হয়।

যার প্রসঙ্গে প্রতিবাদের ঝড় তুলে ফেসবুক ফ্যান পেজে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকে ‘বয়কট’ বিজ্ঞপ্তির ব্যাপারে নিজের বক্তব্য পেশ করে ২১ বছর আগে ১৯৯৬ সালের একটি পেপার কাটিং এবং পরিচালক সমিতির বর্তমান বিজ্ঞপ্তি সংযুক্ত করে দেন শাকিব খান। সালমান শাহর মতো সেই চক্রান্তের শিকার বলে দাবি করেন শাকিব। সালমান শাহের এই পেপার কাটিংয়ের সঙ্গে শাকিব খান ফেসবুকে লেখেন, ‘নিচের ছবি ২টি দেখলে আপনারা বুঝবেন ১৯ জুলাই ১৯৯৬ সালে প্রয়াত নায়ক সালমান শাহের সঙ্গে যেভাবে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, বর্তমানে একই কাজ আমার সঙ্গে হচ্ছে। তাই আমি একটা কথাই বলব, চলচ্চিত্রের স্বার্থে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত বন্ধ করুন।’

এদিকে গত মাসে হঠাৎ করে লাইভে ফিরে আসেন চলচ্চিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া শাকিবের অধিকাংশ সিনেমার নায়িকা অপু বিশ্বাস। কিন্তু লাইভে এসে অপু জানান তার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা। লাইভে এসে নিজের ও শাকিবের সম্পর্ক নিয়ে রহস্য খোলেন অপু আর এরপরেই সমগ্র মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। সেই নিয়েও বেশ কথা ও সমালোচনার স্বীকার হন অভিনেতা। তিনি পুরো বিষয়টিকে শত্রু পক্ষের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেন।

শাকিবের মতে ২০০৮ সালে তিনি অপুকে বিয়ে করেন কিন্তু এটি তিনি জনসম্মুখে এভাবে আনতে চাননি। এমনকি ছেলে আব্রামকে নিয়ে চোখের জল ফেলে অপু জাতীয় টেলিভিশনে এসেছেন যা কিনা শাকিব কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। এর মাঝে শাকিবের সহশিল্পী বুবলীর নামও জুড়েছে। তবে সম্প্রতি শাকিবের বলা উক্তি নিয়ে শাকিবকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে বুবলীও বেশ তোপের মুখে। শাকিবের পক্ষ নিয়ে বুবলী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘শাকিব খান বাংলা চলচ্চিত্রে একটি ইতিহাস। উনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন ইনশাআল্লাহ। কোন অপশক্তি, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত তাকে দমাতে পারবে না। যখনই তিনি জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রকে নিয়ে যাচ্ছে তখনই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যার প্রমাণ এর মধ্যে পাচ্ছে সবাই। কিন্তু আমরা শিল্পীরা, সহকর্মীরা, দর্শকরা, ভক্তরা তাকে আজীবন সাপোর্ট দিয়ে যাবো। আমরা আমাদের নিজেদের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের সার্থেই কাজ করতে চাচ্ছি। তাই আমাদের নিজেদের শিল্পীদের সম্মান করুন, পাশে থাকুন।’

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে শাকিবের নতুন সিনেমা ‘রংবাজ’ এর পরিচালক শামীম আহমেদ রনিকেও নিষিদ্ধ করা হয় এবং তার চলচ্চিত্র সমিতির সদস্যপদ বাতিল করা হয়। পরিচালক সমিতির ১৩টি সংগঠনের নেতারা গত ১ মে বিকালে বিএফডিসিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন সংবাদ সম্মেলন করে লিখিত বক্তব্যে জানান শাকিব খানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব অভিযোগ তারা তুলে নিয়েছেন। এদিন থেকে চলচ্চিত্রের সবাই শাকিব খানকে নিয়ে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু শাকিবকে বয়কট করার পরও তাকে নিয়ে ‘রংবাজ’ নামে একটি সিনেমার শুটিং চালিয়ে যাওয়ায় পরিচালক সমিতির সদস্যপদ বাতিল করা হয় এ ছবির নির্মাতা শামীম আহমেদ রনির। শাকিবের ক্ষমা মিললেও এখনও রনির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি পরিচালক সমিতি।

সমিতির সিদ্ধান্তের বড়খেলাপ করে শাকিব খানকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করছিলেন রনি এমনকি শুটিং বন্ধ রাখেননি। উল্টো ক্ষমা না চেয়ে পরিচালক সমিতিকে চ্যালেঞ্জ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন এ পরিচালক। শুধু তাই নয়, সমিতি তার কিছুই করতে পারবে না বলেও হুমকি দিয়েছেন।

সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু অতঃপর শাকিব নিষিদ্ধের আড়ালের গডফাদার কারা ?

এই বিষয়ে শাকিব বলেছিলেন তার আর সালমান শাহের সময়ের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। শাকিব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, ‘১৯শে জুলাই ১৯৯৬ সালে প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ এর সাথে যেভাবে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, ঠিক বর্তমানে একই কাজটি আমার সাথে হচ্ছে। তাই আমিও একটা কথাই বলবো, চলচ্চিত্রের স্বার্থেই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত বন্ধ করুন।’

এমন দুঃসময়ের মাঝে শাকিব নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন নতুন ঝামেলায়। গত ৫ মে রাতে শুক্রবার গভীর রাতে এফডিসিতে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে তিনি প্রবেশ করেন। এ সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। এই ঘটনায় আরেক চিত্রনায়ক জায়েদ খানসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় জিডিও করেছেন।

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন, শাকিব খানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ পরিচালক সমিতি কিংবা অন্যরা করেছেন, এর সবই হয়েছে রনির কারণে। কারণ তিনিই শাকিবকে ভুল বুঝিয়ে সবসময় ভুল পথে ধাবিত করার চেষ্টা করেছেন। রনির বিরুদ্ধে তার স্ত্রী তমাও পরকীয়ার অভিযোগ করেছেন। শীঘ্রই এ ব্যাপারে তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানিয়েছেন। এসব কিছুর অন্তরালে শাকিবের বিরুদ্ধে কি চক্রান্ত চলছে এবং কেই বা এমন পলিটিক্স করে শাকিবের ক্যারিয়ার বরবাদ করছেন তাই এখন চিন্তার বিষয়।

ঢালিজগতের গডফাদার হিসেবে নাম আসে প্রথমেই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই ব্যাংককে অবস্থান করছেন রহস্যময় ব্যক্তিত্ব এই আজিজ মোহাম্মদ ভাই। চলচ্চিত্র জগতের গুটিকয় মানুষের সাথে তারা আনাগোণা চলে। ‘ভাই’ মূলত আজিজ মোহাম্মদের পারিবারিক পদবী। আর এই পদবীর জন্যই অনেকে তাকে গডফাদার মনে করে থাকেন।

আজিজ মোহাম্মদ ভাই মূলত একজন ধনাট্য ব্যবসায়ী। প্রায় ১১টি ইন্ডাস্ট্রির মালিক তিনি। অলিম্পিক ব্যাটারী, অলিম্পিক বলপেন, এমবি ফার্মাসিটিউক্যাল, এমবি ফিল্ম, টিপ বিস্কুট, এনার্জি বিস্কুট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তিনি। এছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং, সিঙ্গাপুরে রয়েছে তার উঁচু মানের রিসোর্ট।

সোহেল চৌধুরী থেকে সালমানের মৃত্যু অতঃপর শাকিব নিষিদ্ধের আড়ালের গডফাদার কারা ?

চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মূলত তার এই জগতে আসা। অনেক আগে থেকেই তিনি বেনামে অর্থ লগ্নি করতেন চলচ্চিত্রে। প্রায় ৫০টি সফল চলচ্চিত্র বেনামে প্রযোজনা করেছেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। কিন্তু তাকে কেন গডফাদার বলা হয় সেই নিয়ে রহস্য খোলাসা হয়। আজিজ মোহাম্মদ ভাই ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি মর্নিং সানের সম্পাদকের মেয়েকে বিয়ে করেই তিনি সাংবাদিকদের চক্ষুশূলে পরিণিত হন। এরপর সাংবাদিকরাই তাকে মিডিয়া ডনে পরিণত করে। এই নিয়ে আজিজ ভাই ভিন্ন চিন্তা পোষণ করেন। তিনি যখন পত্র পত্রিকায় তাকে নিয়ে ‘রং চড়িয়ে’ লেখা গুলো দেখেন তখন সেগুলো  তিনি উপভোগ করেন। তার ভাষ্যে ‘এতো লোকের মাঝে আমাকেই গডফাদার বলা হয়, তাই বা কম কিসে!’

এখন প্রশ্ন স্বচ্ছ কিংবা সৎ থেকে এতোগুলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালান আজিজ মোহাম্মদ। চলচ্চিত্র ব্যবসায় পুঁজি জোগাতেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই সে কারণেই কি তবে সালমান শাহর মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী? যদিও সালমান শাহের আকস্মিক মৃত্যুর সময়ে ব্যংককে ছিলেন ‘গডফাদার’ আজিজ মোহাম্মদ ভাই। তাহলে নায়ক সোহেল চৌধুরীর হত্যা মামলায় জড়িত ছিলেন কি করে? সেই অভিযোগে গ্রেফতারও হয়েছিলেন তিনি। তবে কি আজিজ ভাইয়ের ‘গডফাদার’ উপমা শুধুই মিডিয়ার সৃষ্টি নাকি চলচ্চিত্র জগতের এই রাজনীতির মাঠে তার অবদান যেমনটা শোনা যায় তেমনটাই আছে?

সিনেমা পাড়ায় গডফাদেরদের ক্ষমতা নিয়ে বহু আগে নায়করাজ রাজ্জাক বলেছেন, ‘আজকাল একদল লোক লুটেপুটে খাচ্ছে সিনেমা। সিনেমায় এখন অনেক গডফাদার জুটে গেছে। সবাই এখন ব্যবসা করার মানসিকতায় কাজ করছে, কেউ সিনেমাকে ভালোবাসছে না। আমার দুঃখ লাগে, আমার সেই বয়স নেই, ক্ষমতা নেই এখন আবার নতুন করে যুদ্ধ করার। একজন যোদ্ধা লাগবে, যিনি সিনেমাকে ভালোবেসে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’

ঢালিপাড়ায় আজিজ ভাইয়েরা আগেও ছিলেন, বর্তমানেও আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। কিন্তু ফাঁসির আসামী যদি ফাঁসির মঞ্চে হেসে হেসে গলায় দড়ি তুলে নেয়, তাহলে বুঝতে হবে তিনি বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখিয়ে  বিজয়ের সাথেই চলমান। কারন তার সেই শেষ হাসিটার উত্তর, ‘আমি গডফাদার’।

এই মুহুর্তে আমাদের চলচ্চিত্র খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলার সিনেমার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা! সিনেমাকে বাঁচাতে গেলে এখনি বড় ভুমিকাটা নিতে হবে আমাদের। একই সঙ্গে ঘরের শত্রু বিভীষণদের চিনে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে।  কবি ফররুখ আহমদের ‘পাঞ্জেরী’র অপেক্ষার পালা যে এখন শেষ। তা না হলে সিনেমার মৃত্যু অবধারিত।

Advertisement

কমেন্টস