ফরিদী নেই, বসন্তের রঙ নেই

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭

নিয়াজ শুভ।।

নায়ক নয়, ভিলনকে দেখতে সিনেমা হলে যেতেন দর্শকশ্রোতারা। তার সাবলীল কণ্ঠ, দক্ষ অভিনয়ে চোখ ফেরানোর কোন সুযোগ নেই। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। হয়তো বাস্তব জীবনের একাকীত্বই তাকে সকলের প্রিয় মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। তিনি অভিনয়ের কিংবদন্তী পুরুষ হুমায়ুন ফরীদি।

খুব বেশি সংস্কৃতিময় মানুষটাই বাংলার ফাগুনের আমেজের প্রথম দিনেই ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চলে যান না ফেরার দেশে। অবশ্য তাঁর যাওয়া হয়নি কোথাও। এমন অভিনেতা শত বছরেও কোথাও যেতে পারে না। যতদিন বাংলা থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবেন হুমায়ূন ফরীদি।

কালজয়ী এ অভিনেতার জন্ম ঢাকার নারিন্দায়। তাঁর বাবার নাম এটিএম নূরুল ইসলাম ও মা বেগম ফরিদা ইসলাম। চার ভাই-বোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ইউনাইটেড ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণের পর চাঁদপুর সরকারী কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনান্তে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি আল-বেরুনী হলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি বিশিষ্ট নাট্যকার সেলিম আল-দীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

১৯৭৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উৎসব আয়োজনেরও প্রধান সংগঠক ছিলেন ফরীদি। এ উত্সবের মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গনে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি গড়ে ওঠে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে একজন মেধাবী ও শক্তিমান নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে যে আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন ফরীদি, তাঁর সেই উচ্চতায় এ দেশের খুব কম মানুষই পৌঁছতে পেরেছেন।

২০০৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার প্রাক্তন অর্থনীতির এই ছাত্রকে পুরস্কৃত করেন। অভিনয় জগতে বেশিরভাগ সময়ে ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেই যে মানুষ ক্যারিয়ার ছুটেছে সেই মানুষটিই ছিল ভিন্নরকম ভিন্ন মেজাজে অন্য চরিত্রে । “সংশপ্তক” টিভি নাটকের ‘কানকাটা রমজান’ কিংবা “একাত্তরের যীশু” চলচ্চিত্রের ‘কেয়ারটেকার ডেসমন্ড’ যেন চিনিয়ে দেয় একজন অভিনেতার জাতকে। “একাত্তরের যীশু” চলচ্চিত্রের গির্জার সেই কেয়ারটেকার ডেসমন্ড কিংবা কোন চলচ্চিত্রের ভিলেন কিংবা শ্যামল ছায়ার সেই গায়েন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিটি কাহিনীর চরিত্রই যেন নিজের সাথে নিজের লড়াই।

ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ুন ফরীদি দুবার বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ে করেন ১৯৮০’র দশকে। ‘দেবযানী’ নামের তাঁর এক মেয়ে রয়েছে এ সংসারে। পরবর্তীতে বিখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফাকে তিনি বিয়ে করলেও তাঁদের মধ্যেকার বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে ২০০৮ সালে।

২০১২ সালের এই দিনে ফাগুনের আগুনে বিষাদের কালো আভা ছড়িয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন অভিনয় শিল্পের অনন্য এই কারিগর। তার মৃত্যুতে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন হারিয়েছে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রকে। আজও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তিনি আর নেই। পর্দায় তার ঝলমলে হাসি দেখলে মনে হয় এই বুঝি পাশেই আছেন তিনি। তার অভাব পূরণ হওয়ার নয়। আজ তার জন্মদিনে খুব জানতে ইচ্ছে করছে, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আকাশের ওপারে কেমন আছেন সকলের প্রিয় মুখ হুমায়ুন ফরীদি?

 

Advertisement

কমেন্টস