অস্কার জয়ী জ্যাকি চ্যান, কণ্ঠে যার গান ভাসে

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ১২, ২০১৬

আইরীন নিয়াজী মান্না।।

শেষ অবধি হংকং সুপারস্টার জ্যাকি চ্যানের হাতে উঠলো অস্কারের মূর্তি। গত ১২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত গভর্নর অ্যাওয়ার্ডসে অস্কারের সোনার মূর্তি পেলেন এই মার্শাল আর্টস তারকা। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সম্মানসূচক বিশেষ অস্কার দেওয়া হলো জ্যাকিকে।

জমকালো এই অনুষ্ঠানে পুরস্কার তুলে ধরে এই অভিনেতা বলেন, ‘এটা একটা স্বপ্ন। চলচ্চিত্র শিল্পে ৫৬ বছর পেরিয়ে আসা, ২০০ ছবিতে কাজ করা ও শরীরের হাড় ভাঙার পর অবশেষে স্বীকৃতি পেলাম। ধন্যবাদ হলিউড। এ জায়গায় কাজ করে অনেক কিছু শিখেছি, হলিউডই আমাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘একজন চীনা হিসেবে আমি গর্ববোধ করছি। হলিউডকে ধন্যবাদ। আমার স্ত্রী লি ফেং চিয়াও এবং ছেলে ফাং জু মিংকেও ধন্যবাদ। এছাড়াও যারা আমার সঙ্গে সিনেমায় কাজ করছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। সবসময় আমাকে সমর্থন করা বিশ্বের সব অনুরাগীকে ধন্যবাদ’।

এ বিশাল গৌরব অর্জনকারী প্রথম চীনা ব্যক্তি জ্যাকি। বিদেশী ভক্তরা সাধারণত সিনেমার মাধ্যমে অভিনেতা জ্যাকি চ্যানকে জেনেছেন। কিন্তু তিনি যে বেশ ভালো গান গাইতে পারেন তা অনেকেই জানেন না। বাজারে তার গানের বেশ কিছু রেকর্ডও রয়েছে। তার একটি জনপ্রিয় গানের প্রথম কলি ‘আমরা কখনো বিচ্ছিন্ন হবো না’। ২০০৮ সালে চীনের সিছুয়ান প্রদেশের ওয়েনছুন শহরে ব্যাপক ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করে এ গানটি রচিত হয়। জ্যাকি চ্যানের কণ্ঠে চীন কেন্দ্রীয় টেলিভিশন গানটি প্রচার করে। প্রচারের পর লাখ লাখ দর্শকের মন জয় করেন তিনি। জ্যাকির গাওয়া আরেকটি গানের কথাও বেশ হৃদয়স্পর্শী। সেটি হলো, ‘তোমাকে না দেখলে আমি অস্থির হয়ে যাই। আমি সময় গুণতে গুণতে তোমার জন্য অপেক্ষা করি। তোমার জন্য প্রার্থনা করি। তুমি অন্য কোথাও থাকলেও তোমাকে খুঁজবো। মরে গেলেও আমরা বিচ্ছিন্ন হবো না। দুঃখ পেলেও কখনো কাঁদবে না। আমার হাত দিয়ে তোমার বাড়ি ফেরার পথ নির্মিত হবে।’

জ্যাকি চ্যানের চীনা নাম চেং লোং। তিনি ১৯৫৪ সালের ৭ এপ্রিল হংকংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একই সঙ্গে অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, নাট্যকার এবং গায়ক। অভিনেতা হিসেবে জ্যাকি চ্যান হংকংয়ের সিনেমায় সফলতাভাবে প্রতিনিধিত্ব করছেন। সারা বিশ্বে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। চীনের কুংফু সিনেমার প্রতিনিধি হিসেবে তিনি হলিউডে চীনের ঐতিহ্যবাহি সংস্কৃতিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। সিনেমার মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে চীনের সংস্কৃতি জানার জানালা খুলে দিয়েছেন তিনি। আজও জ্যাকি চীনা সিনেমার উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রেখে যাচ্ছেন। জ্যাকি চ্যানের ‘দেশ’ নামে একটি গান রয়েছে। ২০০৯ সালে গানটি রেকর্ড করা হয়। তার সঙ্গে এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন চীনা কণ্ঠশিল্পী লিউ ইউয়ান ইউয়ান। এটি একটি দেশাত্মবোধক গান। ২০১২ সালে জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার পায় গানটি। এ গানে দেশ এবং পরিবারের শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতি তুলে ধরা হয়েছে। দেশ ও পরিবারের প্রতি গভীর আবেগ ও ভালোবাসা ফুটে উঠেছে গানটিতে। চীনা একটি কথা প্রচলিত রয়েছে।

‘ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছে এবং সৃষ্টি করেছে জ্যাকি চ্যানকে।’ এ কথা শুনে অতিরঞ্জিত বলে মনে হয়। কিন্তু এ কথার যথেষ্ঠ যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে। জ্যাকি চ্যান চীনের গ্রামাঞ্চলে একটি অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান। তার কোনো বিশিষ্ট পারিবারিক পরিচয় নেই। আজকের এ সফলতার জন্য তাকে অনেক লগাই করতে হয়েছে। সিনেমায় কাজ করার জন্য জ্যাকির শক্তিশালী কোনো সমর্থন ছিল না। বহু বছর ধরে অন্যের দেয়া অসহ্য কষ্ট ও ব্যথা বেদনা সহ্য করে কাজ করেছেন তিনি। ফলে সিনেমা জগতে একের পর এক বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন। এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে তার অভিনিত সিনেমার আয় ২২০ কোটি মার্কিন ডলার। তিনি সতেরোবার চীনা সিনেমায় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন। অভিনয়ের মাধ্যমে তার এখন পর্যন্ত আয় ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার।

অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব জ্যাকি। উদার, দয়ালু, সদাহাস্যময়ী এবং প্রাণবন্ত জ্যাকি চ্যানের অনেক বন্ধু। তার বন্ধুরা সবাই তাকে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকেন। বন্ধুদের জন্যও জ্যাকি গান গেয়েছেন ‘মনের বন্ধু’। জ্যাকি চ্যানের খ্যাতির পেছনে একটি প্রধান কারণ তিনি সবসময় পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। তিনি উসু (এক ধরনের শারীরিক ব্যায়াম) এবং অভিনয়কে একই সুত্রে গেঁথেছেন। জ্যাকি চ্যানই প্রথম সিনেমায় মার্শাল আর্ট কমেডির সূচনা করেন। সিনেমায় কুংফু প্রদর্শনের পাশাপাশি রক্তাক্ত সহিংসতা এড়িয়ে যান তিনি। তার লক্ষ্য প্রতিটি পরিবারের সব সদস্য যাতে একসাথে বসে তার সিনেমা দেখতে পারে।

ভোলাভালা, সাদামাটা গোছের এ লোকটি কিন্তু অত্যন্ত সাহসী। জ্যাকি কুংফু সিনেমায় অভিনয় করার সময় কখনো ‘স্টান্টম্যান’ ব্যবহার করেন না। যত কঠিন ও ঝুঁকির কাজই হোক না কেনো তিনি সবসময় নিজেই তা করেন। আর তাই তো সিনেমার শুটিংয়ের সময় জ্যাকি চ্যান মোট ২৯ বার গুরুতর আহত হন। তার মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত কোনো জায়গা নেই যেখানে আঘাত লাগেনি। বিশেষ করে তার নাকের হাড়, গলা এবং পাঁজর বার বার আহত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শরীরের ক্ষত হচ্ছে পুরুষের পদক। সিনেমা আমার স্বপ্ন। সিনেমার জন্য আমি প্রাণও দিতে পারি।’

জ্যাকি চ্যান সাধারণ মানুষ নন। এক সময় তিনি নানা রকম চাপের মধ্যে ছিলেন। ব্রুস লি’র উজ্জ্বল সফলতার সময়কে অতিক্রম করে আধুনিক কুংফু সিনেমায় জ্যাকি নতুন যুগের প্রবর্তন করেছেন। এখন তার বয়স ৬০ বছরের বেশি। এ বয়সেও তিনি প্রতি বছর অনুরাগীদের নানা চমক দিচ্ছেন। শুধু সিনেমাই নয়; জ্যাকি চ্যান সমাজসেবার কাজ করছেন।

২০০৪ সালে তিনি জাতিসংঘ শিশু তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হন। ২০০৬ সালে তিনি ফোর্বস পত্রিকার নির্বাচিত ‘সেরা দশজন দাতব্য তারকা’ হন। ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিক গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠানের একটি গান গেয়েছেন জ্যাকি। গানের নাম ‘বিদায় বলা খুবই কঠিন’। এ গানে তার সাথে যৌথভাবে কণ্ঠ দিয়েছেন লিউ হুয়ান, লিউ দে হুয়া এবং চৌ হুয়া চিয়ান নামে চীনের বিখ্যাত তিনজন কণ্ঠশিল্পী। গানে তারা গেয়েছেন, ‘বিদায় বলা খুবই কঠিন। বিদায় আমরা বলবো না। আবারো দেখা হবে আমাদের। এ পৃথিবী খুব ছোট। দেখা হবে হৃদয়ের জগতে’। তিনি সিনেমার মাধ্যমে বিশ্বের দর্শকদের অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি আরো নতুন নতুন চসক সৃষ্টি করবেন এ প্রত্যাশাই রইলো।

কমেন্টস