হৃদয়ে কড়া নাড়ছে প্রাণহীন তারেক মাসুদ

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ৬, ২০১৬

নিয়াজ শুভ।।

প্রাণ মানেই হাজারো স্মৃতি। জীবন থেকে প্রাণপাখিটি উড়াল দিলে নিথর দেহ শুধু দুঃখ বাড়াতে পারে। সেই দেহ চোখের সামনে থাকলেও স্মরণে থাকে প্রাণময় স্মৃতি। মানুষের সেই স্মৃতিকে প্রাণবন্ত করে তার কর্ম। মৃত্যুর পরও তার আলোড়নে মুখর থাকে হাজারো ভক্তের হৃদয়। তেমনই একজন প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ। আজ (৬ ডিসেম্বর) তার ৬০তম জন্মবার্ষিকী।

কোন এক শীত কনকনে দিনে পৃথিবীর আলোতে চোখ খুলেছিলেন তারেক মাসুদ। সেই আলোয় নিজের জীবন গড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবীময়। আজকের এই দিনটি আসার আগেই ওপারে বাসা বেঁধেছেন এই কারিগর। হয়তো চন্দ্র কারিগরের সান্নিধ্য পেতেই সকলের মায়া ছেড়েছেন তিনি। বিশেষ দিনটিতে বিশেষ মানুষটি না থাকলেও বিশেষ কাজ তাকে বিশেষ ভাবে সকলের মনে কড়া নেড়েছে।

চলচ্চিত্র নির্মাণের আইকন তারেক মাসুদের কৃতিত্ব নতুন করে বলার কিছু নেই। বর্তমান সময়ের তরুণরা ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাচ্ছেন, ফিল্ম পরিচালনার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তরুণদের এই স্বপ্নের বুনিয়াদ তারেক মাসুদ। তার চিন্তা-ভাবনা, সমাজ পর্যবেক্ষণ, জীবনবোধ আমাদের গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। তার কাজের ধরণ আমাদের আন্দোলিত করেছে। তার প্রকাশভঙ্গি তরুণদের মুগ্ধ করেছে। একটা প্রজন্মের কাছে, যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে এবং দেখছে তাদের কাছে তারেক মাসুদ একজন আইডল।

জাতীয় আত্মপরিচয়, লোকজ ধর্ম ও সংস্কৃতি তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে বিশেষ গুরুত্বসহকারে চিত্রিত হয়েছে। যেজন্য তার বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্যচিত্র ও অ্যানিমেশন মিলিয়ে তারেক মাসুদ মোট ১৬টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।

কাজের প্রতি তারেক মাসুদের ধৈর্য, ভালোবাসা ছিলো এক নিদর্শন। চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র আদম সুরত (১৯৮৯) নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় সাত বছর তিনি শিল্পীর সান্নিধ্যে কাটান। সেই সময়েই তার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই রাজনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি ও দর্শনচর্চায় তারেক মাসুদ নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৮৮ সালে মার্কিন নাগরিক ক্যাথেরিন মাসুদকে বিয়ে করেন তারেক মাসুদ।

মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির গানের (১৯৯৫) মাধ্যমে চলচ্চিত্রকার হিসেবে তারেক মাসুদ বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত লাভ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পকালীন প্রবাসজীবনে তিনি আবিষ্কার করেন মার্কিন পরিচালক লিয়ার লেভিনের ধারণকৃত ১৯৭১ সালের ফুটেজ, যা তার জীবনধারা বদলে দেয়। লিয়ার লেভিনের ফুটেজ ও পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফুটেজ নিয়ে তিনি ও তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ মিলে নির্মাণ করেন মুক্তির গান, যা জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইডের পর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।

মুক্তির গান ফিল্ম সাউথ এশিয়া (১৯৯৭) থেকে বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে। এই ছবিটি সারাদেশে বিকল্প পরিবেশনায় প্রদর্শিত হয় এবং এই চলচ্চিত্রটি দেখে সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তার ভিত্তিতে ভিডিও চলচ্চিত্র মুক্তির কথা (১৯৯৯) নির্মিত হয়। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র মাটির ময়নার (২০০২) মাধ্যমে তারেক মাসুদ আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তারেক মাসুদের উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো অর্ন্তযাত্রা (২০০৬), নরসুন্দর (২০০৯) এবং রানওয়ে (২০১০)।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জে তার পরবর্তী ছবি ‘কাগজের ফুল’ এর শুটিং লোকেশন খুঁজতে গিয়েছিলেন তারেক মাসুদ। ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি। তার মৃত্যু আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তরুণদের মধ্যে চলচ্চিত্র নিয়ে যে স্বপ্নশিখা তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন তার মাধ্যমেই তিনি বেঁচে থাকবেন। তার মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে ছিলেন, বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। ভালো থেকে সিনে কারিগর। শুভ জন্মদিন তারেক মাসুদ।

 

Advertisement

কমেন্টস