Advertisement

সালমার বিবাহ বিচ্ছেদ, বিতর্ক এবং আমার ব্যক্তিগত প্যাঁচালঃ লুৎফর হাসান

প্রকাশঃ নভেম্বর ২৯, ২০১৬

Advertisement

নিয়াজ শুভ।।

ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সংগীতশিল্পী সালমা। ২০১১ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। দাম্পত্য কলহের জের ধরেই স্বামী দিনাজপুর ৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের সঙ্গে তার পাঁচ বছরের সংসার জীবনের ইতি ঘটে।ডিভোর্সের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সালমা নিজেই। কিছুদিন ধরেই তার বিচ্ছেদ ঘটনায় চলছে মুখরোচক নানান কথা। এবার সে প্রসঙ্গে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী লুৎফর হাসান। বিডিমর্নিং পাঠকদের জন্য তার স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘শুরুতেই বলে নিচ্ছি, কেউ কেউ অতি আগ্রহ নিয়ে বলতে পারেন ও ভাই, আপনি এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর আগেভাগে দিয়েই মূল বক্তব্যে যাচ্ছি। এই প্রশ্নের উত্তর, প্রথমত সালমা একজন জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য কণ্ঠশিল্পী। তার সমস্যা নিয়ে ভাবতে বসা এবং তার মেধাকে বাঁচানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া গানের মানুষদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এছাড়াও একটা কারণ, বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে একটা মেয়ের জীবন যে পরিমাণ টালমাটাল হবার উপক্রম হয়, মানবিক কারণেও তার পাশে থাকাটা অবশ্যই প্রয়োজন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কেন কথা বলতে আসছি, এর ব্যাখ্যাটাই পরিস্কার করছি।

দশ বছর আগে সে যখন ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন আমি নিয়মিত গান লিখছি, সুর করছি। কাজ করতাম আরশি নামের এক অডিও কোম্পানিতে। অবসকিউর ব্যান্ডের টিপু ভাইর তত্ত্বাবধানে সে সময় গান লিখতাম যাদের, তাঁরা অধিকাংশই ব্যান্ড আর্টিস্ট। তুমুল জনপ্রিয় ব্যান্ডের ভোকাল একেকজন। আমি চেয়েছিলাম খুব, একটু ধুম ধারাক্কা রকমের কিছুও লিখতে। সে সময় বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগে ছোটখাটো পোস্টে কাজ করতাম। একদিন ঈদের এক শুটিংয়ে সেখানে গেলেন কুমার বিশ্বজিৎ দাদা আর আসিফ ইকবাল ভাই, আলী আকবর রুপু ভাই তাঁদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। গান শোনাতে বললেন। আমি শোনালাম। তাঁরা দুজনেই বললেন কাল সন্ধ্যায় বারিধারার গানচিল স্টুডিওতে আসো। ক্লোজআপ ওয়ানের শিল্পীরা তখন তুমুল জনপ্রিয়। তাদের নানা রকম অ্যালবামের কাজ চলছিলো গানচিল স্টুডিওতে।

পরদিন গেলাম। গিয়ে দেখি লম্বা ফ্রক পরা ছোট্ট একটা মেয়ে ফড়িঙয়ের মতো তিড়িংবিড়িং করছে। হো হো করে হাসছে। হেসে হেসে গড়াগড়ি করছে। কেউ ধমক দিচ্ছে। সে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। এই মেয়েটাই সালমা। এবারের চ্যাম্পিয়ন। তার জন্যই গান লিখতে হবে। আমি গাইড ভয়েস দিয়ে চলে এলাম। বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেই গান তুমুল জনপ্রিয় হয়ে গেলো । গানটা ছিলো, তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, মইধ্যে চিত্রা নদী…। তারপর দুই বছর তেমন যোগাযোগ নাই। আমিও ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত।

চার বছর পর দু’হাজার দশ সাল। জিতুর স্টুডিওতে আমাদের তুমুল আড্ডাবাজি। সালমা আসতো মাঝেমাঝে গানের কাজে। ততদিনে রিংকু, রাজীবসহ অনেকের বেশকিছু জনপ্রিয় গান আমি লিখে ফেলেছি। সালমা আমাকে বললো ভাই, কয়েকটা গান শোনাও। আমি বললাম, কী করবি? সে বললো শোনাও আগে। শোনালাম। সে বললো আজ  থেকেই কাজ শুরু করো। আমার ফুল অ্যালবাম করে দাও। সব গান তোমার সুরে গাইতে চাই।

কাজ শুরু হলো। সোমেশ্বর অলির তিনটা, কাওনাইন সৌরভের একটা আর বাকিগুলো আমার,আর সবগুলো গানের সুর করলাম। অ্যালবাম প্রকাশ পেলো জি সিরিজ থেকে। অ্যালবামের নাম বৃন্দাবন। ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেলো। সালমার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক দারুণ তখন।

কিছুদিন বাদেই সে বিয়ে করলো। তখন আমার প্রথম একক অ্যালবাম ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ এর কাজ চলছে। খুব ব্যস্ত নিজের টেলিভিশনের জব নিয়েও। সালমা দাওয়াত করলো। যেতে হবে তার শ্বশুরবাড়ি। দিনাজপুরের স্বপ্নপুরীতে গেলাম আমরা অনেকেই। সালমার স্বামী শিবলি সাদিকের সাথেও সম্পর্কটাও দারুণ আমাদের। সালমা আমাকে বেশ বড় অংকের টাকা দিলো গানের রয়্যালিটি হিসেবে। আমি ঘুড়ি অ্যালবামের কাজ সম্পন্ন করলাম। সালমা আমাকে নানানভাবে সহযোগিতা করেছিলো সেসময়। আমি সারা জীবন এই কৃতজ্ঞতা বোধ স্বীকার করবো উচ্চস্বরেই। এতো বড় ভূমিকা দেবার আগ্রহ এসব কারণেই। এবার মূল বক্তব্য অল্প কথায় সেরে নিচ্ছি।

সালমা একজন গান পাগল মেয়ে। বানিজ্যিক ধারার ফোক গানে সালমা এখনও শীর্ষে অবস্থান করছে। মঞ্চে হোক আর অডিও গানে হোক, তার গ্রহণযোগ্যতা এখনও ঈর্ষা করার মতো অবস্থানেই। একজন শিল্পীর এতগুলো মৌলিক গান জনপ্রিয় হয়েছে এই সময়ে এসে, ব্যাপারটা খুব সহজ না। সে গান গাইবে, এটাই স্বাভাবিক। আর গানের ক্ষেত্রে কোনও প্রকার শর্ত চলে না। তার স্বামী শিবলি সাদিককে সে ভালোবাসে মনেপ্রাণেই। এতে কোনও সন্দেহ নাই। স্বামী, সন্তান আর সংসারের প্রতি তার মনোযোগ শতভাগ। আমি গত দশ বছরে খুব কাছে থেকে তাকে দেখেছি। শিবলি সাদিক নিজেও ভালো গান করেন। স্বামীর গান নিয়েও সালমার পাগলামির শেষ নাই। কোন অশুভ শক্তির প্ররোচনায় আজ তাদের দুজনের এই পরিণাম, সে কথার কিছুই জানি না। শুধু এতোটুকু মনে হচ্ছে, বিচ্ছেদটা মোটেও কাম্য নয়।

সালমার বক্তব্যে কোনও বাড়াবাড়ি নাই। তার স্বামীর বক্তব্য শুনি নাই। কখনও শিবলি ভাইয়ের সাথে দেখা হলে শুনতে পারবো হয়তো। তবে সালমার সারল্য সত্যিই নির্ভেজাল। আমি সালমার নুন খেয়েছি বলে গুণগান গাইছি না। যা সত্য মনে হচ্ছে, তাই বলছি। সালমার স্তুতি গাওয়া না এটা, মেয়েটার কান্না কান্না কণ্ঠ আমাকে স্পর্শ করেছে খুব। সালমার সরাসরি উপকারে উপকৃত অনেক কালপ্রিট এখন দাঁত কেলিয়ে হাসছে দেখে হতাশ হয়ে এসব বলছি। মেয়েটা কারো অপকার করে নাই কখনও। শুরু থেকেই সে সবার জন্য করতো। যাকে যেভাবে পারে সহযোগিতা করে। দাম্পত্য জীবনে কলহ থাকতেই পারে। যারা খুব মজা নিচ্ছে এই দুঃখজনক ঘটনায়, তাদের পরিবারে বুঝি কলহ বিবাদ হয় না?

সালমা জাত শিল্পী। সে গানের জন্য কম ছাড় দেয় নাই। বিয়ে করার পর শুধুই স্বামী সংসারে সময় দিতে গিয়ে পাঁচটা বছর সেভাবে গানই করতে পারে নাই। তাহলে কেন আজ তার কপাল ভাঙলো? যে মেয়ে তার সন্তান হারায়, কেবল সেই জানে সন্তান হারাবার যন্ত্রণা। নানান সেক্রিফাইসে তিলতিল করে গড়ে তোলা নিজের সংসার এভাবে ভেঙে গেলো, মাত্র বাইশ বছর বয়সী মেয়েটা সামলাচ্ছে কিভাবে সেটা কেউ কি বুঝবে না? এখন এর প্রতিকার কী, আমি জানি না। তবে শিবলি ভাইকে বলবো, দোষারোপ নয়, যদি আর সম্ভব নাই হয়, এতদিনের সুখের স্মৃতির দিকে তাকিয়ে সময় নিন, মেয়েটার গান শুনেই তো ছুটে এসেছিলেন, তার গানের জন্য মায়া করে হলেও তার সামনের ক্যারিয়ার নির্ঝঞ্ঝাট রাখতে সহযোগিতা করুন। আর সালমাকে কোনও কিছুই অনুরোধ করবার নাই। সে গানের মানুষ। সে গান করবে। সারা জীবন গান করবে। ভেঙে না পড়ুক সে। জীবনে তো কতো ঝড়ই আসে।

শেষকথা আমাদের মিউজিক ইন্ডস্ট্রির প্রতি। স্বচ্ছ এবং সফল কোনও সংগঠন নাই আমাদের। নানারকম ক্রাইসিসে সম্মিলিত উদ্যোগ নেবার ব্যবস্থা নাই। কেউ বিপদে পড়লে পাশ কাটানোটাই অধিক জ্বলজ্বলে হয়ে আসে। এরকম একে অপরের বেদনায় কাছাকাছি না এসে বাইরের কথিত মানুষের সাথে সাথে হাসাহাসি করার বদভ্যাসের কারণেই বুঝি আমাদের শেষ পরিণাম আসে দুরারোগ্য ব্যধিতে, দুস্থ বলে আখ্যায়িত হই প্রায় সকলেই।

আসুন, সালমার পাশে থাকি, খাঁটি বাংলা গানের পাশে থাকি। পাশে থাকি গানের সমৃদ্ধিতেও।’

Advertisement

 

Advertisement

কমেন্টস