উত্তরপত্র মূল্যায়নে গুরুত্ব দিন

প্রকাশঃ জুন ২, ২০১৮

ফাতিহুল কাদির সম্রাট।।

পরীক্ষা হচ্ছে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দিক, শিখনফল মূল্যায়নের একটি প্রক্রিয়া। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিচালিত পঠন-পাঠন কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার ফল অনুযায়ী যে সনদ দেওয়া হয়, তা কেবল তার পরবর্তী ধাপের শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা পেশা, বৃত্তি বা জীবন গঠনেরও নিয়ামক বটে। তাই পরীক্ষা-সংশ্নিষ্ট সব বিষয় সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হওয়া আবশ্যক।

পরীক্ষা কার্যক্রমের প্রতিটি ইনস্ট্রুমেন্ট ও কর্মধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ, বিতরণ, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুত কোনোটিই কম গুরুত্ববহ নয়। এর কোনো একটিতে দুর্নীতি, অনিয়ম বা অস্বচ্ছতা থাকলে পরীক্ষা ত্রুটিপূর্ণ ও ফল প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষার দুর্নীতি ও অনিয়ম হিসেবে নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টিই বরাবর গুরুত্ব পেয়েছে, ধর্তব্য বলে গণ্য হয়েছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা ও মেধার যথাযথ লালন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পরীক্ষা-সংশ্নিষ্ট আরও কিছু বিষয় সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া জরুরি। যেমন নির্ভুল ও মানসম্পন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন।

উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়টি বলা চলে বরাবর অনির্দেশিত থেকে গেছে। সংশ্নিষ্টরাই কেবল জানেন এ ক্ষেত্রে কী হয়, কিসের ভিত্তিতে পরীক্ষার ফল নির্ধারিত হয়। পরীক্ষার উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়িত হলে পাসের হার ও জিপিএ সবকিছু অন্যরকম হতো। পিইসি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত একই কথা প্রযোজ্য। উত্তরপত্র মূল্যায়নে অদক্ষতা ও শৈথিল্যের কারণে পরীক্ষার ফল অনেক সময় ভুয়া হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণে পরীক্ষা নিয়ে সব কড়াকড়ি ও বিধিব্যবস্থা ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

উত্তরপত্রের দুটি অংশ থাকে। একটি নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষা, অন্যটি সৃজনশীল বা বিচরণমূলক। নৈর্ব্যক্তিক অংশটি মূল্যায়িত হয় কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে। এখানে মানবীয় ভুল, অদক্ষতা কাণ্ড ত্রুটির সুযোগ কম। বিচরণমূলক অংশটি মূল্যায়নে বলতে গেলে একটি নৈরাজ্য চলছে। যদিও ফল নির্ধারণে অংশটি ব্যাপক প্রভাব রাখছে। কারণ এই অংশে নম্বরের পরিমাণ (এইচএসসি পর্যায়ে ৭০ শতাংশ) বেশি, মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিক ভুলত্রুটি বা প্রবণতার প্রভাবও তাই বেশি।

উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে খাতা না পড়ে এবং প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা খুবই সাধারণ। ফেল না করানোকে অনেক পরীক্ষক দায়িত্ব হিসেবে মাথায় চাপিয়ে নিয়েছেন। অনেক দায়িত্বশীল সুযোগ্য শিক্ষক বোর্ডের খাতা দেখতে চান না এই বলে যে, ঠিকমতো খাতা দেখলে ফেলের সংখ্যা বাড়ে, বেশি ফেল করলে আবার বোর্ড থেকে ধমক খেতে হয়। কাজেই তারা বোর্ডের কাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। এই ‘ধমক’ হয়তো বাড়িয়ে বলা; তবে খাতা বিতরণের সময় বোর্ড থেকে একটু নমনীয় হয়ে বা কঠিন না হয়ে খাতা দেখার নির্দেশনা অনেক সময় থাকে। একটু সদয় হতে গিয়ে অনেকে দাতা হাতেম তাঈ হয়ে উদার হস্তে নম্বর দিয়ে থাকেন। ফলে ভালো-মন্দ একাকার হয়ে যায়। এতে পরীক্ষার ফলে প্রকৃত শিখনফলের চিত্র ফুটে ওঠে না। অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকে ভালো ফল করে কিংবা পাস করে যায়, উচ্চশিক্ষায় বাড়তি চাপ তৈরি করে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পাসের হারের সঙ্গে এমপিও বা বেতন ভাতাকে সম্পর্কিত করে দেখার একটা প্রবণতা আছে। এই প্রবণতার পেছনে কিছু কারণও সক্রিয় আছে। পাসের হার এবং জিপিএকে প্রাতিষ্ঠানিক সফলতার নির্দেশকরূপে দেখার সামাজিক প্রবণতাও শিক্ষকদের উদারহস্ত হওয়ার আরেকটি কারণ।

খাতা দেখার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতার অভাব এবং দায়িত্বহীনতার বাইরে সবচেয়ে বড় কারণ সময়ের অভাব। পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ আগেই নির্ধারিত থাকে। নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে বোর্ডগুলো ফল প্রস্তুত করতে গিয়ে পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের জন্য খুবই অল্প সময় দিয়ে থাকে। একজন পরীক্ষককে পাঁচ শতাধিক খাতার বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন সময় দেওয়া হয়। নিত্যদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজকর্ম ইত্যাদি করার পর কিছুতেই এতগুলো খাতা মূল্যায়ন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না।

পরীক্ষকদের ভুলত্রুটি শুধরে খাতা পুনরায় দেখার কাজটি আন্তরিকতা থাকলেও প্রধান পরীক্ষকদের পক্ষে তা সম্ভব হয় না সময়ের অভাবে। প্রধান পরীক্ষকদের পুষিয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ পরীক্ষকদের চেয়ে বেশি খাতা মূল্যায়ন করতে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বোর্ডের উদাহরণ দেই। এই বোর্ড এবার এইচএসসি পরীক্ষায় সাধারণ পরীক্ষকদের ইংরেজি বিষয়ে ছয়শ’ ও প্রধান পরীক্ষকদের আটশ’ করে খাতা দিয়েছে। নিজের এই বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা ছাড়াও একজন প্রধান পরীক্ষককে গড়ে পাঁচ হাজার খাতার নিরীক্ষা, পুনর্মূল্যায়ন ও আনুষঙ্গিক কাজ করতে হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ সময়ের মধ্যে খাতার প্রয়োজনীয় বৃত্ত ভরাট, স্বাক্ষর, লেখালেখি এসব করাই কষ্টসাধ্য। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে তারা নিজেদের ওপর জুলুম চাপিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরীক্ষকপ্রতি আরও কম সংখ্যক খাতা বরাদ্দ দিলে সুষ্ঠুভাবে খাতা মূল্যায়ন করা সম্ভব। কিন্তু বোর্ড কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন যে, সিনিয়র, মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকরা উত্তরপত্র মূল্যায়নে আগ্রহী কম। এমনকি প্রধান পরীক্ষকও হতে চান না ভালো ও সিনিয়র শিক্ষকরা। প্রতিবছর যেসব শিক্ষক পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক হওয়ার জন্য নাম নিবন্ধন করেন, তাদের অধিকাংশই দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকেন। এই অবস্থায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেককে খাতা গছিয়ে দিতে বাধ্য হন। এই গছিয়ে দেওয়া খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে এমন আস্থা না থাকলেও বোর্ড কর্তৃপক্ষের করার কিছুই থাকে না।

সাম্প্রতিক প্রবণতায় দেখা যায় যে, সরকারি স্কুলের শিক্ষক ও সরকারি কলেজের ক্যাডার কর্মকর্তাদের পরীক্ষার কাজে অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। অথচ সরকারি কাজে তাদের দায়বদ্ধতা বেশি, সঙ্গত কিছু কারণে তাদের গ্রহণ ও নির্ভরযোগ্যতা বেশি। সদ্য সমাপ্ত এইচএসসি পরীক্ষার পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক তালিকা ঘেঁটে দেখলেই বিষয়টি পরিস্কার হবে।

যোগ্য শিক্ষকদের পরীক্ষার কাছে অনীহার পেছনে অনেক কারণ চিহ্নিত করা যায়। অনেকে বোর্ডগুলোর উত্তরপত্র বিতরণ ব্যবস্থায় নাখোশ। বোর্ড অফিসে উপস্থিত হয়ে খাতা গ্রহণের কাজকে অনেকে অসম্মানজনক ও ঝক্কিপূর্ণ মনে করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়ানো খাতার বস্তা মাথায় নিয়ে বোর্ড অফিস থেকে মুটের মতো বেরিয়ে আসছেন শিক্ষকদের এমন ছবি মুখরোচক আলোচনার কারণ। খাতা দেখার পারিশ্রমিক নিয়েও অসন্তুষ্টি আছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য বরাদ্দকৃত সময় খুব বলে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত রাখার পক্ষপাতী নন কেউ কেউ। সিনসিয়ার ও পরিতৃপ্তি নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত এমন শিক্ষকরা শুধু সময়ের কারণ দেখিয়ে নিজেদের গুটিয়ে রাখেন। অনেক শিক্ষক আবার প্রাইভেট টিউশনি ছেড়ে তাদের ভাষার সামান্য টাকার জন্য মৌসুমি কাজে নিয়োজিত হতে রাজি নন। বেতন ভাতা বৃদ্ধির ফলে শিক্ষকদের আর্থিক সঙ্গতি আগের চেয়ে বেড়েছে। কাজেই অনেকে অল্প কিছু টাকার জন্য বাড়তি চাপ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন না। পারিশ্রমিক বণ্টনের দীর্ঘসূত্রতাও অনেকে নিরুৎসাহিত করে।

উত্তরপত্রের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে কতিপয় ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান শিক্ষকদের নিয়ে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক পুল তৈরি করতে হবে। পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক হতে চেয়ে নাম নিবন্ধন করার পর উপযুক্ত কারণ ছাড়া দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, উত্তরপত্র মূল্যায়নের পারিশ্রমিক ও সময় বৃদ্ধি করতে হবে।

তৃতীয়ত, মাথাপিছু আরও কমসংখ্যক উত্তরপত্র বিতরণ হবে। পরীক্ষক এবং প্রধান পরীক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষকরা যাতে ঘরে বসে ডাকে বা কুরিয়ারে খাতা পেতে পারেন, সেই উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

পঞ্চমত, সরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সংশ্নিষ্ট কাজে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রধান পরীক্ষকদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করতে হবে। তারা যাতে পরীক্ষকদের খাতা সুষ্ঠুভাবে পুনর্মূল্যায়ন করতে পারেন, সে জন্য তাদের সাধারণ পরীক্ষকের মতো উত্তরপত্র মূল্যায়ন থেকে অব্যাহতি দেওয়া।

লেখক, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ।

[email protected]

কমেন্টস