ঢাবি শিক্ষকদের লোভের বলি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অনার্স প্রোগ্রাম

প্রকাশঃ অক্টোবর ১২, ২০১৭

ইয়াসিন অভি।।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজ্ঞান অনুষদের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে ঢাবি প্রশাসন। তবে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম আগের মতোই চলবে। কার্যক্রম চালুর এক বছরের মাথায় স্নাতক প্রোগ্রাম বন্ধের পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করছেন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষকদের নানান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণেই বিভাগটির অনার্স পর্যায়ের পড়ালেখা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।গত বছরই বিভাগটিতে অনার্স প্রোগ্রাম চালু হয়। বর্তমানে ২০১৬-১৭ সেশনের প্রথম বর্ষে ২৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষক রয়েছেন চার জন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, যারা ইতোমধ্যে ভর্তি হয়েছেন, তারা অনার্স শেষ করতে পারবেন।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান আরশাদ মোমেন ও সহকারী অধ্যাপক তানভীর হানিফ বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর একটি আবেদন দাখিল করে। অবকাঠামোগত সুবিধা, শিক্ষক ও উপযুক্ত ল্যাবরেটরির অভাবে বিভাগের অনার্সের কার্যক্রম স্থগিত করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।  গত ২৪ সেপ্টেম্বর উপাচার্য ও ডিনদের এক মিটিংয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রোগ্রামে নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। স্থগিতাদেশের একটি চিঠি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগেও পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো নতুন বিভাগ চালু আছে তার কোনোটিতেই কোনও সঙ্কট নেই। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে আরও নেই। তাছাড়া সংকট থাকলেও তা নিরসন না করে প্রোগ্রাম বন্ধ করা হচ্ছে। এটা কেন, কিসের ভিত্তিতে করা হচ্ছে তা আমার জানা নেই। আমি নিজেও এ বিষয়ে কিছু জানতাম না। হঠাৎ জেনেছি। এর পেছনে কোনও ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বিভাগে একই সাথে মাস্টার্সসহ ১ম বর্ষ থেকে ৩য় বর্ষ পর্যন্ত ক্লাস নেয়ার সুযোগ রয়েছে। আর ১ম বর্ষের জন্য যে ল্যাব আছে, সেটা অনেক মানসম্মত। ২য় বর্ষে কোন ছাত্র-ছাত্রী নেই বলে ২য় বর্ষের ল্যাব নাই। তবে সেটাও করা যাবে। আর নতুন বিভাগ খোলার পর এমনি শিক্ষক কম থাকে, আস্তে আস্তে শিক্ষক বাড়ানো যায়। আমরা চাইলেই আরও ৪ জন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারি। ফ্যাকাল্টির ডিনও প্রথমে এই স্থগিতাদেশের আবেদন সম্পর্কে জানতেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বিভাগের যে দুই শিক্ষক বিভিন্ন সংকটের কথা উল্লেখ করে উপাচার্যের কাছে চিঠি দিয়েছেন তাদের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আরশাদ মোমেন এখন শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন। তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছিলেন না। বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেই ব্যস্ত থাকতেন। যে দুই শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনার্স প্রোগ্রাম স্থগিতের আবেদন করেছেন  তারা বিভাগের প্রতি আন্তরিক নন। অনার্স প্রোগ্রাম চালু থাকলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়াসহ তাদের অন্যান্য ব্যক্তিগত কার্যক্রম পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটবে। তারা বিভাগে সপ্তাহে একবার আসেন। শুধু শনিবার ক্লাস নিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। অনার্স প্রোগ্রাম চালু থাকলে নিয়মিত বিভাগে সময় দিতে হবে। এ কারণে তারা ষড়যন্ত্র করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ডিন কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, বিভাগের স্নাতক প্রোগ্রামে ভর্তি বন্ধ থাকবে। বিভাগটি চালু করার সময় কোনও প্রস্তুতি ছিল না। বিভাগে ল্যাব সুবিধা নেই। রয়েছে শিক্ষক সংকট। এ কারণে বিভাগটির স্নাতক পর্যায়ে আপাতত ভর্তি স্থগিত থাকবে। সুবিধা পর্যাপ্ত করে তারপর শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হবে। তিনি আরও বলেন, গত বছর যে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়েছিল তাদের লেখাপড়া শেষ করানো হবে। শুধু নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে না। এছাড়া, মাস্টার্স প্রোগ্রাম আগের মতোই চালু থাকবে।

প্রোগ্রাম বন্ধ না করে সংকট নিরসন করা যেত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংকট আরও বাড়তো। কারণ সংকট সমাধান হুট করে করা যায় না। বিভাগে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করে তবেই অনার্স প্রোগ্রাম আবার চালু করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৫ সালে শুধু মাস্টার্স প্রোগ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ। তবে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে তিন বছর পরই বিভাগটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে অধ্যাপক এ এম হারুন-অর-রশিদ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। ড. গোলাম মোহাম্মদ ভুঁইয়া, ড. আব্দুল মোমেন এবং ড. মো. কামরুল হাসান বিভাগটির পুনরুজ্জীবনের প্রাথমিক উদ্যোগ নেন। ২০০৭ সালে আবারও মাস্টার্স প্রোগ্রাম নিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করে বিভাগটি।

Advertisement

কমেন্টস