আজ ডুয়েট ডে: একটি ভাবনা ও বিশ্লেষণ

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১, ২০১৭

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী:

আজ (০১ সেপ্টেম্বর) ) ডুয়েট ডে। আজকের এমন একটি দিনে শিক্ষা ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর । অবাক বিস্ময়ে পৃথিবী তাকিয়ে দেখেছিল একটি জয়যাত্রার গল্প আর অসম্ভবকে  সম্ভব করার ঘটনা। ইতিহাসের পাতা আজও তার স্বাক্ষর বহন করছে। যদিও এই বিশ্ববদ্যালয়ের ইতিহাস অনেক পুরাতন ও ঐতিহ্যমন্ডিত তবে তা খুব সহজে অর্জিত হয়নি । অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে আজকের এই ডুয়েট। শোষণ, বঞ্চনা  আর যড়যন্ত্র বার বার এসেছে আর এখনও চলছে। এর বিরুদ্ধে  ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর লড়াইয়ের মাধ্যমে আজকের এই ডুয়েট। আজ শ্রদ্ধা অবনত চিত্তে স্মরণ করছি সেই সফলতার স্বপ্নদর্শী মহানায়কদের। অনেক স্বপ্ন আর অবারিত সম্ভাবনার আশা ও লক্ষ নিয়ে তাঁদের এই অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল আর এখনও তা অব্যাহত আছে।

বাংলাদেশের এই একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যারা দেখিয়েছে কিভাবে অধিকার আদায় করে নিতে হয়। শিক্ষা যে কখনও বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট করা যায় না তার প্রমান রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। আজকে আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সচল  রেখেছে একমাত্র ডুয়েটের ছাত্ররাই। এমন কোন সরকারি ও বেসরকারি শিল্প কারখানা ও সংস্থা নেই যেখানে ডুয়েটের ছাত্রদের পদচারণা নেই। আর এখানকার ছাত্ররা অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে  থিওরিটিক্যাল ও প্রাকটিক্যাল কাজের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অগ্রসরমান ভূমিকা রাখছে । এটি কোন আবেগের কথা নয়। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার মানের উৎকর্ষতা ও গুণগতমান নির্ধারণের জন্য ইনস্টিটিউশনাল অফ কোয়ালিটি  এসুরেন্স  সেলের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় যে জরিপ চালানো হয়েছিল  তা থেকে এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে ।আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, বিদেশে চাকুরী করার ও সেখানে সারাজীবনের জন্য বসবাস করার সুযোগ থাকলেও ডুয়েটের ছাত্ররা দেশপ্রেমকে অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদালয়ের চেয়ে সর্বক্ষেত্রেই প্রাধান্য দিয়েছে। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য গৌরব ও অহংকারের একটি বিষয়।

উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও ডুয়েটের ছাত্ররা পিছিয়ে নেই বরং এগিয়ে আছে । আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশে এখানকার ছাত্ররা তাঁদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে | তাঁদের গবেষণাকর্ম, পেটেণ্ট ও মৌলিক আবিষ্কার ডুয়েটকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। ফলে এখন পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ডুয়েটের সাথে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করছে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বুকে ধারণ করে যে মানুষটি আগলে রেখেছেন  তিনি হলেন এই বিশ্ববিদালয়ের বর্তমান ভাইস  চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন । বিশ্ববিদ্যালয়কে সন্তানের মতো গড়ে তুলেছেন তিনি আর সেই অভিযাত্রা এখনও অব্যাহত আছে। এই প্রথিতযশা শিক্ষাবিদের জীবন কিংবদন্তির মতো | এটি এই কারণে বলছি যে, দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আর বীর ও অদম্য সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেই ডুয়েট ও ডুয়েটের শিক্ষার্থীদের অন্তর থেকে লালন ও ধারণ করে নিজ পরিবারকে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় রেখে আজও ডুয়েটের শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তিনি সকল ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে তাঁর মহতী উদ্যোগে ইউনিভার্সিটি অফ পারলিস, মালয়েশিয়া, ইউনিভার্সিটি অফ সাগা, জাপান, ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন সিডনি সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদালয়ের সাথে সমঝোতা যুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ও হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে সকলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাঁর সাম্প্রতিকালে আরেকটি অর্জন হচ্ছে তিনি বিশ্ববিদালয়ের সম্প্রসারণে উদ্যোগী হয়েছেন  আর ইতিমধ্যে ডুয়েটের ভূমি সম্প্রসারিত হয়েছে। এ বছরেই তাঁর ব্যক্তিগত  অনুপ্রেরণায় ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছে। এছাড়া ইনস্টিটিউট অফ এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স, ইনস্টিটিউট অফ ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি, সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড সাসটেনেবল রিসার্চ তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার মাধ্যমে কাজ শুরু করেছে। বিশ্ববিদালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রকল্প খাতে  ২৭৭.৫ কোটি টাকার অনুমোদন তাঁর প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে, যেটি একসময় অনেকের কাছে অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্রদের আবাসন সমস্যা দূর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে | আর বর্তমানে আবাসিক হল বর্ধিতকরণের কাজ শুরু হয়েছে | এছাড়া শিক্ষা ও গবেষণার অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়াও অব্যাহত আছে। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, একজন ব্যক্তির প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় যে অর্জন করেছে তার সফল বাস্তবায়ন সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। এখানে একটি বিষয় সকলের জন্য প্রণিধানযোগ্য হওয়া উচিত বলে মনে করা যেতে পারে সেটি হল ব্যক্তি স্বার্থ ও  গোষ্ঠী স্বার্থের চেয়ে ডুয়েটের স্বার্থকে বড় করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সকলের মধ্যে গড়ে তোলা দরকার। তা না হলে ডুয়েট তার কাঙ্খিত লক্ষ অর্জন থেকে বঞ্চিত হবে। তার দায় দায়িত্ব সকলকেই বহন করতে হবে। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় সকলকে সম্মানিত  করেছে, সমাজ ও রাষ্ট্রে মর্যাদা দিয়েছে, যেভাবে মা তার সন্তানকে উজাড় করে দেন | এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হল ত্যাগের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে নিঃস্বার্থভাবে অবদান রাখা ও প্রকৃত অর্থে  কাজ করা।

ডুয়েটের জন্মের পর থেকেই কৌশলে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে শোষণ ও বঞ্চনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কাজ করেছে নেপথ্যের কুশীলবরা। বর্তমানেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেহেতু লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ডুয়েটের ছাত্ররা অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকে সেজন্য কিভাবে অপকৌশল প্রয়োগ করে ছাত্রদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা যায় সে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। বর্তমান সময়ের সার্কুলারগুলো বিশ্লেষণ করলে দুটি বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটি হল ডুয়েট বাদে বাকি চারটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। সেখানে অখ্যাত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েরও নাম উল্লেখ করা হলেও খুব সুকৌশলে ডুয়েটকে বাদ দেওয়া হচ্ছে | এটি  ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার একটি যড়যন্ত্র বলে ধরে নেওয়া যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৩ সালে সংসদে পাশকৃত অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এটি কারোও দয়ার দান নয়। কাজেই এই ধরণের অপকৌশল রাষ্ট্রীয় আইনের পরিপন্থী। আবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল। যেটি কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। আরেকভাবে চাকুরীক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে শিক্ষাথীরা। সেটি হল সার্কুলারে এস এস সি ও এইচ এস সি  উল্লেখ থাকছে। সেখানে এইচ এস সি বা সমমান বা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কথাগুলি উল্লেখ করা হচ্ছেনা। এটাও একধরণের অপশক্তির অপকৌশল। এটি কেন ঘটছে আর কাদের কারণে ঘটছে তা বিশ্লেষণ করার সময় এখন এসেছে। কারণ, যখন অধিকারের প্রশ্ন আসে সেখানে কোন আপোষ চলেনা। সম্মিলিত প্রতিবাদ, সাক্ষাৎ ও লিখিতভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে ও যোগাযোগ করে চিরতরে এই বঞ্চনা ও শোষণের অবসান ঘটাতে হবে। কেননা স্বল্পমেয়াদি সমাধান কোন সমাধান নয়, স্থায়ীভাবে এই সমস্যার সমাধান এখন সময়ের দাবি। কারণ এর সাথে শুধু ছাত্রদেরই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ জড়িত। সকলকে এব্যাপারে আন্তরিক হয়ে প্রকৃত অর্থে সম্প্রীতির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তা না হলে অস্তিত্বের সংকট সবাইকে গ্রাস করবে আর মর্যাদার প্রশ্নে কোন ছাড় দেওয়া যায়না, আর দেওয়াও যেতে পারেনা। বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো গবেষণামুখী হতে হবে। শিল্পকারখানা ও সরকারি বেসরকারি সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে কলাবোরেশন করার চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। ছাত্ররা ও শিক্ষকরা  যে সৃজনশীল ভূমিকার মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে তাঁদের অবদান রাখছে তা প্রচার ও প্রসারের বাস্তব উদ্যোগ কর্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। শুধু বড় বড় পরিকল্পনা করলেই হবে না এর সফল বাস্তবায়নের জন্য সকলকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। ডুয়েটের লক্ষ্য অনেক বড়, সেই লক্ষ্যের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে হবে। ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক আন্তরিকতাপূর্ণ হতে হবে। ছাত্রদের মনের কথা, তাদের ব্যক্তিগত  ও অন্যান্য সমস্যাগুলো শুনার ও তা সমাধানের মতো সময় দিতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে। অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনেক সময় তাদের থাকেনা। এজন্য তাদের শিক্ষাবৃত্তি কিভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা  করা যায় তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এধরনের শিক্ষাবৃত্তির প্রচলন রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করা যেতে পারে।

ডুয়েট আশা ও বিশ্বাস করে এই বিশ্ববিদ্যালয় একদিন ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান করবে আর এখানে থেকে নোবেল লোরিয়েটরা বের হবে। গোটা পৃথিবীর শিক্ষা ও গবেষণার সূতিঁকাগার একদিন ডুয়েট হবেই হবে। এটা কারো কারো কাছে উচ্চবিলাসী পরিকল্পনা মনে হতে পারে। কিন্তু এটি কোন উচ্চবিলাসী ধারণা নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও তার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি সম্ভব। আর এর জন্য যে বিষয়টি বেশি দরকার তা হল সকলকে স্বার্থহীনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আনুগত্য রেখে কাজ করতে হবে। এর জন্য দরকার ঐক্য, আন্তরিকতা ও সম্প্রীতি। এটাই হোক আজকের ডুয়েট ডে এর  প্রত্যাশা |

লেখক:

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

শিক্ষাবিদ, কলামিষ্ট ও লেখক

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

Advertisement

কমেন্টস