নারী বৈষম্য যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

প্রকাশঃ আগস্ট ১২, ২০১৭

নুঝাত নাবিলাহ:

আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর বৈষম্যের শিকার হওয়া নতুন কোন ঘটনা নয়। আমরা প্রতিনিয়ত সজ্ঞানে কিংবা অবচেতনে নিজেরা লিঙ্গ বৈষম্য করে থাকি। একটি শিশু যখন জন্ম নেয় তখন আমরা মেয়ে হলে তাকে গোলাপী জামা কিনে দেই, সুন্দর করে সাজাই, হাড়ি-পাতিল বা পুতুল দিয়ে খেলতে দেই। এভাবে তাকে ভবিষ্যতে তার একটি জায়গা দেখিয়ে দেই যে তোমাকে সুন্দর পরিপাটি থাকতে হবে, ঘরের কাজ করতে হবে, বাচ্চার দেখাশুনা করতে হবে।

বিখ্যাত দার্শনিক সিমন দ্য বেভোয়ার এ ব্যাপারে বলেন, ‘’নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, নারী হয়ে ওঠে’’ অর্থাৎ সমাজ তাকে নারী পরিচয়ে পরিচিত করে তোলায় বিভিন্ন ভূমিকা রাখে।

অপরদিকে ছেলে হলে তাকে নীল জামা পড়াই, তাকে সাইকেল চালানো শেখাই, দেই খেলনা গাড়ি দিয়ে খেলতে, বিভিন্নভাবে তাকে প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে করি উৎসাহিত। এভাবে সমাজ তাকে পুরুষ করে তোলে। এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, যদিও আমরা লিঙ্গ বৈষম্য বললে বেশীর ভাগ সময় নারীর প্রতি বৈষম্য করা বুঝি, লিঙ্গ বৈষম্য বলতে শুধু নারীর প্রতি বৈষম্যই বোঝায় না। বৈষম্যের শিকার নারী-পুরুষ উভয়ে হতে পারে।

প্রতি বছর সারা দেশ থেকে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হয় স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তির ক্ষেত্রে ছেলে হোক বা মেয়ে উত্তীর্ণ হওয়াটাই ভর্তির জন্য যথেষ্ট। এখানে ছাত্র কতজন কিংবা ছাত্রী কতজন ভর্তি করা হবে এমন কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই যেমনটি আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আবাসিক হলের ক্ষেত্রে ২৩টি হল বা হোস্টেলের মধ্যে অধিকাংশই ছেলেদের জন্য। মেয়েদের হলের সংখ্যা বেশ কম (মাত্র পাঁচটি) হওয়ায় অনেক ছাত্রী হলে সিট পায়না। অনেক ছাত্রীকে সিটের জন্য বেশ কয়েক মাস করতে হয় অপেক্ষা।

ছেলেদের আবাসিক হলগুলোয় যেখানে মাস্টার্স পাশ করা অনেক ছাত্রকে নিয়ম লঙ্ঘন করে দিব্যি হলে থাকতে দেখা যায়, মেয়েদের হলে এমনটি দেখা যায়না। তাদের নোটিশ দিয়ে হল ছাড়ার কথা বলা হয় এবং হল থেকে নাম কেটে দেয়া হয়। ফলে মাস্টার্স শেষ হওয়ার সাথে সাথে তাকে হল ছাড়তে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হলগুলোয় হলভেদে রাত ৯.৩০মিনিট থেকে ১০টার মধ্যে গেট বন্ধ করে দেয় এবং এই ব্যাপারে যথেষ্ট কড়াকড়ি রয়েছে। কোন ছাত্রীর টিউশনি বা অন্য কাজ থেকে ফিরতে একটু দেরি হলে তার আর হলে ঢোকার উপায় থাকেনা। অথচ ছেলেরা হলে যখন খুশি ঢুকতে কিংবা বের হতে পারে। এ ব্যাপারে কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই। এছাড়া ছেলেদের হলগুলোয় যে কেউ যখন-তখন প্রবেশ করতে পারে, চাইলে রাতে থাকতে পারে। আর মেয়েদের হলে নন-আবাসিক ছাত্রীরাও চাইলে অনেক সময় ঢুকতে পারেনা। হলের কোন ছাত্রীর সাথে তার আত্মীয় দেখা করতে এলে হলে তাকে গেস্ট রুমে বসতে দেয়া হয় কিন্তু রাতে থাকতে দেয়া হয় না। ফলে অনেক সময় দূর থেকে আসা এসব ছাত্রীদের পরিবারের সদস্যরা পড়েন বিপাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো বছর জুড়ে বিভিন্ন সময় প্রতিযোগীতামূলক খেলাধুলার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু মেয়েদের খেলাধুলার চেয়ে ছেলেদের খেলাধুলায় খরচ করা হয় বেশি। এ প্রসঙ্গে কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রী শারমিন সুলতানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,”ছেলেদের মত মেয়েদের হলেও ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট খেলা হয়। এখন আমাদের দেখা যায় ক্রিকেট খেলা আগে হয় তাই ক্রিকেটের জার্সি, জুতা দেয় কিন্তু এরপরে ভলিবলে আর জার্সি, জুতা দেয় না। ছেলেদের জন্য প্রতি খেলায় জার্সি, ক্যাপ, প্যাড ইত্যাদি দেয়া হয়। এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে কর্তৃপক্ষ বলে মেয়েদের খেলার জন্য বাজেট কম।“

হল সংক্রান্ত বিষয়গুলো ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা যায়। বেশীরভাগ ক্লাসরুমে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কথা বলার জন্য যে ডায়েস দেয়া হয় তা সাধারণত বেশ উঁচু হয়। দেখলে মনে হয় শিক্ষক হিসেবে পুরুষই কাম্য, নারী নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কখনো কোন নারী ভিসি দেখা যায়নি। যেখানে নারী দেশ শাসন করছে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো নারী ভিসি না থাকার বিষয়টি বেশ চোখে পড়ার মত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরকার সংগঠনগুলোর মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে হোক আর বিভিন্ন পদ দেয়ার ক্ষেত্রেই হোক ছেলেদের প্রাধান্য বেশি দেয়া হয় বলে মনে করেন অনেক শিক্ষার্থী।

কলাভবনে মেয়েদের জন্য দুইটি কমনরুম থাকলেও নেই প্রতি তালায় ওয়াশরুমের ব্যবস্থা। প্রায়শই এই দুই কমনরুমের ওয়াশরুমের সামনে তাই দেখা যায় বেশ বড় লাইন। এছাড়া কমনরুমে নেই কোন খেলার সরঞ্জাম। অবশ্য এফবিএস ফ্যাকাল্টিতে ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য কমনরুমের সুব্যবস্থা আছে।

একটি উন্নত সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য কখনোই আশানরূপ ফল এনে দিতে পারবে না। আর এই বৈষম্য দেশের প্রথম সারির কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সামান্য হলেও গ্রহণযোগ্য নয়।

কমেন্টস