পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকানো শিশুর ১৩ দিনেও জ্ঞান ফেরেনি, আটক ৩

প্রকাশঃ জুলাই ৪, ২০১৭

জাহিদ তারিক, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি-

বাড়ির সামনের রাস্তার উপর এক মেয়ের সাথে কথা বলার অপরাধে পারভেজ মোল্ল্যা (১৩) নামের এক শিশুকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২২ জুন বিকেলে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দাস বাইসা গ্রামে।

ওই শিশুকে ব্যাপক মারপিট করে ধরে নিয়ে গোপন স্থানে আটকে রাখে মেয়ের পিতা ও চাচারা। পরে রাতভর তাকে হাত, পা, বুক, পিঠে পিটিয়ে এবং পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পারভেজের নানা লিটন চৌধুরী। নির্যাতনের কারণে জ্ঞান হারায় পারভেজ। গত ১৩ দিনেও তার জ্ঞান ফেরেনি। নির্যাতনকারীরা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায়। পারভেজকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এলাকায় আনার পর বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় সোমবার (৩ জুলাই) পারভেজের মা পারভিনা বেগম বাদি হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ২ জনকে আসামি করে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। মামলা নং-২। ৩ জুলাই সোমবার ২০১৭ ইং।

মামলার আসামিরা হচ্ছেন দাসবাইসা গ্রামের মৃত.ছদোর আলী লস্কারের তিন ছেলে আজিজুল লস্কার (৪২), মাজিদুল লস্কার ( ৩৮) ও রবিউল লস্কার (৩৫)। অন্যান্য আসামিরা হচ্ছেন, দাস বাইসা  গ্রামের তছির উদ্দীন, আব্দুস সালাম, ইমামুল, আজিজ শেখ, আজিজুলসহ অজ্ঞাত আরো ২ জন। মামলার পর পুলিশ মাজিদুল লস্কার, তছির উদ্দীন ও সন্দেহজনক আলফাজকে গ্রেপ্তার করেছে। জানাগেছে, গত ২২ জুন বিকেলে কালীগঞ্জ উপজেলার দাস বাইসা গ্রামের রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আজিজুল লস্কারের মেয়ে মর্জিনার সাথে পারভেজ কথা বলছিল। কথা বলার অপরাধে আসামিরা তাকে ব্যাপক মারপিট করে। পরে তাকে ধরে নিয়ে গোপন স্থানে রেখে দেয়। মারপিটের সময় পারভেজের সাথে থাকা নাজমুল নামের অপর কিশোর দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে বাড়িতে খবর দেয়। পরিবারের লোকজন এসে আজিজুল লস্কারের কাছে তার ছেলেকে ফেরত চায় পারভেজে মা পারভিনা বেগম। তখন আজিজুল লস্কারসহ তার ভাইরা বলেন আমরা তাকে মারপিট করে ছেড়ে দিয়েছি।

কিন্তু পারভেজের নানা লিটন চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, তাকে রাতে একটি পাট ক্ষেত ও এলাকার একটি গোডাউনের মধ্যে আটকে রেখে পুরুষাঙ্গে পেরেক ঢুকিয়ে এবং বুকে উপর পাড়িয়ে এবং পিটিয়ে নির্যাতন করে। নির্যাতনের ফলে সে রক্তাক্ত জখম হয় ও মলমূত্র ত্যাগ করে ফেলে। তারপরও তারা তাকে ছাড়েনি। তার নির্যাতনের চিৎকার পার্শ্ববর্তী বাড়ির লোকজনও শুনতে পেয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

নির্যাতিত পারভেজের মা পারভীনা বেগম জানান, পরের দিন ২৩ জুন দুপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সাগর বিশ্বাস ফোনে জানায়, তোমাদের ছেলেকে পাওয়া গেছে, এসে নিয়ে যাও। এরপর পরিবারের লোকজন গিয়ে দেখে ছেলে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন কোলা ক্যাম্পের আইসি (ক্যাম্প ইনচার্জ) এসআই মিজানুর রহমান। তিনি জানান, তারা আমাদের জোর করে একটি ভ্যান ডেকে তুলে পাঠিয়ে দেয়। ছেলের অবস্থা খারাপ দেখে ওইদিন দুপুর ২টার দিকে প্রথমে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করি।

পারভেজের অবস্থার অবনতি হলে ডাক্তাররা তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। সেখানে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সেদিন রাতেই ডাক্তাররা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। আমরা পরের দিন (ঈদের আগের দিন) ঢাকায় নিয়ে যায়। সেখানে তার মাথায় অপারেশন করা হয়েছে।  পারভেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০০নং ওয়াডের ইউনিট-২ এর বি-৪০ নং বেডে চিকিৎসাধীন ছিল। সোমবার রাতে তাকে কালীগঞ্জে আনা হয়েছে। আজ ১৩ দিন পার হয়ে গেলেও এখনো তার জ্ঞান ফেরেনি। স্থানীয় কোলা ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বর জাফর হোসেন জানান, কারা কিভাবে নির্যাতন করেছে এটা আমি বলতে পারবো না। তবে পারভেজের চিকিৎসার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে ১২ হাজার টাকা এবং গ্রাম থেকে প্রায় লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে। তবে রোগীর ধরন দেখে মনে হচ্ছে তাকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে।

পারভেজ মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার পিয়াপুর গ্রামের শিমুল মোল্ল্যা ছেলে। তার বয়স যখন ৪ বছর বছর তখন পিতা-মাতার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর সে কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর গ্রামে নানা জিল্লুর রহমানের বাড়িতে থাকতো। সম্প্রতি সে রাজমিস্ত্রির সহকারি হিসেবে কাজ করতো।

কালীগঞ্জ থানার অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক। তবে চিকিৎসার জন্য তারা থানায় মামলা করতে আসতে পারেনি। পরে তারা মাগুরা জেলার শালিখাা থানায় মামলা করতে গিয়েছিল। সেখান থেকে পরামর্শ পেয়ে সোমবার তারা কালীগঞ্জ থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ২ জনকে আসামি করে মামলা দিয়েছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছাদেকুর রহমান জানান, খবর পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে তিনি ওই শিশুকে দেখতে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। টিনের ঘরের প্রচন্ড গরমের মধ্যে তাকে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা খুবই খারাপ। তার চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের কাছে ৫ হাজার টাকা এবং কালীগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েছেন।

কমেন্টস