পথশিশুদের পাশে আরিয়ান আরিফ, তার পাশে কে?

প্রকাশঃ জানুয়ারি ৬, ২০১৮

আরিফ চৌধুরী শুভ.

ব্যস্ততম রাজধানী ঢাকা শহর। চলতে গেলে পথের পাশে চোখে পড়ে বহু পথশিশু। এরা অনেক সময় আমাদের কাছে হাত বাড়ান সাহায্যের জন্যে।অনেকে আবার বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করতে এগিয়ে আসেন। আমরা কখনো হই বিরক্ত, আবার কখনো দমক দিয়ে তাড়িয়ে দিই তাদের।আমাদের চোখে তাদের মূল্যায়নই বা কতটুক? কেনই আমরা পথের শিশুদের নিয়ে ভাববো?

এই প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক।কিন্তু এ্ই শিশুদের নিয়ে এখন পর্যন্ত যারা ভেবেছেন নি:স্বার্থ ভাবে, তাদের মধ্যে আরিয়ান আরিফ একজন। এখন তার আরেক নাম পথশিশুদের বন্ধু আরিয়ান আরিফ। নিজ নামের চেয়ে এ্ই নামেই আরিফ এখন বেশি পরিচিত।

আলোচিত এই তরুণকে এখন অনেকেই চেনেন। কারণ তিনি জেলে গিয়েছেন এই পথশিশুদের জন্যে। তবুও পিছু হাঁটেননি তাঁর ‘মজার ইশকুল’ ও পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানো একঝাঁক উদ্যোমী তরুণ। তারা সব সময় স্বপ্ন দেখে একদিন এই বাংলাদেশের কোথাও কোন পথ শিশু থাকবে না।

অনেকটা ঠিক এমনই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। হ্যাঁ আরিফ তা্ করেছেন। নিজের খেয়ে ভেবেছেন রাস্তার পাশে আমাকে আপনাকে বিরক্ত করা এই সকল পথেরশিশুদের নিয়ে। আরিফের ভাষায় আমিওতো তাদের মতো একজন শিশু ছিলাম। আমার মতো তাদের স্বপ্ন আছে। আমাকে কেউ না কেউ স্বপ্ন দেখিয়েছে কিন্তু তাদের স্বপ্ন দেখানোর জন্যেতো কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু কে আগে আসবে? কে হবে সবার কাছে সেই পাগল মানুষ? আমি এখনো বিশ্বাস করি আমাদের সদ্চ্ছিাই পথশিশু মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারে।

পথশিশুদের জন্যে আরিফের মজার ইশকুলটি শুরু হয়েছে আরো ৫ বছর আগে তারই  একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে।২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথম ফেসবুকে পথশিশুদের জন্য একটি ইশকুলের কথা বলে আরিফ স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। স্ট্যাটাসের ভাষা ছিল, ‘শাহবাগে শিক্ষাবঞ্চিত অনেক পথশিশু ভিক্ষা কিংবা ফুল বিক্রি করে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ বিকেলে অবসর থাকি,  পথশিশুদের বিকেলে পড়াতে পারি। স্কুলের নাম ‘মজার ইশকুল’ হতে পারে। তার এই  পোস্টে লাইক পড়েছে মাত্র ৪৯ জন।

দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী তাদের পড়াতে এগিয়ে এল। মজার স্কুলটির প্রথম যাত্রা ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি। স্থানটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো দিকে রমনা কালী মন্দিরের পাশে। শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১৩জন। ধীরে ধীরে আরিফের সাথে যোগ দেয় আরো অনেকে।ততদিনে আরিফ আর একা নন, তার স্বপ্নের সারথী হয়ে উঠে আরো অনেক আরিফ। হার না মানা এই তরুণদের অদম্য চেষ্টায় ২০১৪ সালের ২৮ জানুয়ারি ‘অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ গড়ে উঠে। এই ফাউণ্ডেশন থেকে সব কার্যক্রম এখন পরিচালিত হয় মজার স্কুলের। শুধু পড়াই নয়, বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম সাংস্কৃতিক উৎসব থেকেও বঞ্চিত নন মজার স্কুলের পথশিশুরা। বরং বহুলাংশে সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের চেয়েও মজার স্কুলের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আছে বেশি।

ঢাকার আগারগাঁও ও মানিকনগরে দুটি স্থায়ী ‘মজার ইশকুলে’ ১২০ জন সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু নিয়মিত  ঢাকার সদরঘাট, কমলাপুর ও শাহবাগের রয়েছে অস্থায়ী মজার স্কুল।পড়ছেন।সব মিলিয়ে নিয়মিত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা শ’পাঁচেক। এখানে প্রাথমিক জ্ঞান থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয় শিশুদের। তবে পরবর্তীতে এসএসসি পর্যন্ত উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান আরিয়ান আরিফ। এর সবই চলছে সেচ্চাসেবকদের মাধ্যমে।৫০ জন নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষক এর পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৫৭ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন মজার স্কুলের জন্যে । এরাও সবাই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। এছাড়াও ২৯ জন কর্মকর্তা আছেন যারা সার্বক্ষণিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকেন টিমকে।

এ স্কুলের স্থায়ী শিক্ষার্থীদের  ইউনিফর্ম  লাল সবুজ। এ যেন লাল সবুজ বাংলাদেশের গৌরব তারা শিশু বয়সেই শরীরে বহন করে চলেছেন।

মজার স্কুলের মজার মুহুর্তটা তখনই আসে যখন শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে মুখরোচক টিফিন খেতে দেওয়া হয়। আগারগাঁওয়ের ইশকুলে ‘বাটা চিল্ড্রেন প্রগ্রাম’ সাহায্য করে। অদম্য বাংলাদেশের ‘স্পন্সর অ্যা চাইল্ড’ কার্যক্রমে অংশ নিয়েও অনেকে শিশুদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দেন।

মজার স্কুলের জন্যে আরিয়ান আরিফের উদ্যোগ আমাদের জন্যে সত্যি একটি খুশির সংবাদ, তবে আরিয়ান আরিফ আমাদের জানালেন আরো বড় একটি খুশির সংবাদ।

আরিফ বলেন, ‘মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় ‘অদম্য বাংলাদেশ চিল্ড্রেন ভিলেজ’ নামে পথশিশুদের জন্য ৩৭ শতাংশ জমির ওপর স্থায়ী শেল্টার হোম তৈরির প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষ করেছি। পাঁচ একর জমিতে এই হোম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চলছে। তাতে অন্তত এক হাজার সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু থাকতে পারবে’।

পথশিশুরা রাস্তায় থাকবে না এটা আমাদের অনেকেরই উদ্যোগ। এই উদ্যোগের শুরুটা করেছে আরিয়ান আরিফ। তাই তার কিণ্ঠে আমরা সুর মিলিয়ে শপথ করি ‘জন্মের পর আমি যে বাংলাদেশ দেখিয়াছি, মৃত্যুর সময় তাহার চাইতে উন্নত দেশ রাখিয়া মরিতে চাই’।

কমেন্টস