প্রতিটি ঢেউয়ের সাথে ক্ষয়ে যায় স্বপ্ন, নৌকায় জন্ম-নৌকায় মৃত্যুর ‘মানতা জনগোষ্ঠী’র

প্রকাশঃ নভেম্বর ১৭, ২০১৭

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধি-

নৌকায় জন্ম, নৌকায় বসবাস, নৌকাতেই মৃত্যু। নেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ ন্যূনযুতম মৌলিক অধিকার। ছোট নৌকায় নদ-নদীতে মাছ ধরে চলে জীবন-জীবিকা। সারাদিনের রোজগারে সন্ধ্যায় উনুন জলে নৌকার ছাউনিতে। সর্বহারা কিংবা নি:স্ব বলে সমাজে পরিচিত হলেও, সমাজ ও সভ্যতা থেকে ছিটকে পড়া এ মানুষগুলোই নাম মানতা।

জন্ম নিবন্ধন, ঠিকানাবিহীন আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন পাঁচ শতাধিক মানতা জনগোষ্ঠী প্রায় শত বছর ধরে বসবাস করছে পটুয়াখালীর রাংগাবালী, গলাচিপা ও বাউফলের নদ-নদীসহ সাগর মোহনায়। সাগরের নোনা জল যেমন জীবন বাঁচায়, তেমনি সাগরের এক-একটি ঢেউয়ের সাথে ক্ষয়ে যায় তাদের ছোট-ছোট স্বপ্ন।

একখণ্ড জমির মালিকানা না থাকায় নদীতে বসবাসকারী এ সম্প্রাদায়কে প্রতিনিয়িত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নানা প্রতিকূলতার সাথে করতে হচ্ছে লড়াই। যেসব নদীর পানিতে জোয়ার-ভাটার টান খুব ধীর তাদের নৌকার বহর নোঙ্গর করে সেখানেই।

দিনের বেলা নদীর তীরে থাকলেও চোর-ডাকাতের ভয়ে রাতে মাঝ নদীতেই অবস্থান নেয়। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ সম্প্রদায় বেঁচে থাকার জন্য জীবিকা নির্বাহ করে মাছ ধরে। মাছ পেলে তা বিক্রি করে জোটে খাবার। না পেলে উপোস। নৌকার ছাউনিতেই জন্ম হয় শিশুদের। পানি পড়ে যাওয়ার ভয়ে কোমড়ে দড়ি বেঁধে বেড়া ওঠা এ নৌকাতেই। শিক্ষাসহ সব অধিকার বঞ্চিত থেকে একটু বাড়ন্ত হলেই বাবা-মার সাথে নেমে যায় জীবনযুদ্ধে। আর একখণ্ড জমির মালিকানা না থাকায় অনেক সময় মৃতের দেহ ভাসিয়ে দিতে হয় নদীর জলে। কিছু সদস্যের রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। তবে নির্দিষ্ট কোনো বসতি না থাকায় এতে যে স্থায়ী ঠিকানা লেখা রয়েছে তা মানতে নারাজ অনেক ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা।

স্থায়ী আবাস না থাকায় তাদের কাছ থেকে ট্যাক্সও গ্রহণ করে না স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী এ জনগোষ্ঠীর কপালে কখনই জোটে না সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তা।

মানতাদের সাথে আলাপচারিতায় জানা যায়, নদী বা সাগর মোহনায় বসবাস করায় দক্ষিণাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন, সিডরের তাণ্ডবে এদের অর্ধশতাধিক নৌকা ডুবে যায়। সেসময় জীবন বাঁচাতে পারলেও মাছ ধরার জাল এবং বড়শি হারিয়ে অনেকে হয়ে পড়ে নিঃস্ব। সিডর পরবর্তী সময়ে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সহায়তা, ঘর নির্মাণসহ নানা সুবিধা প্রদান করা হলেও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এরা। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো দূরের কথা, নেই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন কিংবা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। শিক্ষা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, সমাজ-সভ্যতার আচারের ছোঁয়া লাগেনা এদের গায়ে। রোগ-বালাই সারতে দৌড়ে যায় স্থানীয় কবিরাজ, বৈদ্যের কাছে।

তিন সন্তানের জননী রোকেয়া বেগম (৩৫) জানান, জেলার বাউফলের কালাইয়ার আদিবাসী ছিলেন। নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে শত বছর আগে তার পূর্বপুরুষরা চরমোন্তাজ ইউনিয়নের বুড়াগৌরঙ্গ নদীর কিনারে ঘাটি বাঁধেন। তখন থেকেই এ নদী তীরেই তাদের বসবাস। বাবা সালাম সরদার ও মা রাহিমা অনেক আগেই মারা গেছেন। স্বামী আলতাফ সরদারকে ছেলে শাকিব, আখিদুল ও নাজিম মাছ ধরতে সহায়তা করে। এতেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তারা।

ছয় সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটি নৌকার ছাউনিতে পারুজান বিবির (৪০) বসবাস। তিনি জানান, অন্যদের মত জাল না থাকায় বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন। তাই আয়-রোজগার কম। ফলে সংসার চলে টেনেটুনে।

প্রায় শত বছর ধরে নদী এবং সাগর মোহনায় বসবাসকারী এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখন ফিরতে চায় স্বাভাবিক জীবনের মূলস্রোতে। তবে এ পুনর্বাসনে তারা চান সরকারি সহায়তা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে ইয়াসমিন করিমী বলেন, বিভিন্ন এলাকার নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ এ জনগোষ্ঠীর স্থলভাগে ঠিকানা না থাকায় শিশুরা শিক্ষা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

জেলা প্রশাসক ড. মাসুমুর রহমান বলেন, মৎস্য পেশায় নিয়োজিত এ জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক জীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে পারলে সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যাবে।

কমেন্টস