ভোজ্যতেল খাচ্ছেন, ৬৮% পর্যন্ত ভেজাল!

প্রকাশঃ জুন ১২, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

ভোজ্যতেল খাওয়ার জন্য ব্যবহার করি। সরিষার তেল শরীরেও ব্যবহার করে থাকি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি ভোজ্যতেলই (সরিষা, সয়াবিন, পামতেল) ভেজালে ভরপুর। প্রতি বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য নিয়ে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে থাকে। সেখানে অধিকাংশ ভোজ্যতেলে ভেজাল খুঁজে পেয়েছেন তারা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভোজ্যতেল নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাদের কাছেও অধিকাংশ ভোজ্যতেলে ভেজালের সন্ধান মিলেছে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি ডিপার্টমেন্টের ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নমুনা ভিত্তিক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, বোতলজাত বিভিন্ন ব্রান্ডের সরিষার ৩৪২টি তেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে ৩০.৭ শতাংশ ভেজাল রয়েছে। একইভাবে পামতেলে ৪ শতাংশ ভেজাল খুঁজে পেয়েছে। এসব তেলে এসিডিটির পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। আর এসিডিটি তখনই বেশি হয়, যখন তেলে কোনো না কোনোভাবে ভেজাল ঢুকে পড়ে।

তবে সবচেয়ে বেশি ভোজাল দেখা গেছে সয়াবিন তেলে। সেখানে ৬৮ শতাংশ ভেজাল রয়েছে বলে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলে দেখা গেছে।

পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরির পাবিলক এনালিস্ট মাজেদা বেগম বলেন, ‘আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেম্পল বা ডাটাগুলো সংগ্রহ করে দেয়। পরবর্তীতে আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে থাকি।’

কী ধরনের ভেজাল মেশানো হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সারা বছর এ ধরনের পরীক্ষা করে থাকি। বিভিন্ন ধরনের প্যারামিটারে এগুলো পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। ভোজ্যতেলে যে ধরনের উপদান থাকার কথা, না থাকলে ভেজালের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভোজ্যতেলে সাধারণত এসিডিটির পরিমাণ বেশি থাকে।’

ভোজ্যতেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. নীলুফার নাহার। তার সঙ্গে তেলে ভেজাল মেশানোর বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি জানান, বাজারে বেশ কিছু বোতলজাত ব্র্যান্ডের তেলে ভেজাল আছে। এটা আমি গবেষণায় পেয়েছি। সয়াবিনে বেশি পরিমাণে ভেজাল মিশানো হচ্ছে।

সরিষার তেলে কি ধরনের ভেজাল থাকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরিষার তেলে ভেজাল হিসেবে পামওয়েল বা চর্বি জাতীয় তেল দিচ্ছে। কারণ আপনি নিজেও পরীক্ষা করতে চাইলে ফ্রিজে বা ঠান্ডা জায়গায় রেখে দিবেন, দেখবেন সরিষার তেল জমে যাচ্ছে। এটা কেন হবে? সরিষার তেলে তো চর্বি জাতীয় কোনো উপদান নেই। এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে তারা চর্বি জাতীয় তেলের মিশ্রণ দিচ্ছে।’

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. এবিএম হামিদুল হক ও তার অন্য এক সহকর্মীর অধীনে এক শিক্ষার্থী ভোজ্যতেলের উপর গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণাও ভোজ্যতেলে অধিক পরিমাণে ভেজালের প্রমাণ মিলেছে।

গবেষণায় তেলে কী পরিমাণ ভেজালের অনুসন্ধান পেয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বোতলজাত ব্র্যান্ডের সরিষার তেলে যে সমস্ত উপদান তেলের বোতলে লেখা থাকে, আমরা কোনোটাতেই তার সবগুলো পাইনি। প্রতিটি তেলেই ভেজাল পেয়েছি।’

ঘাঁনিতে ভাঙানো সরিষার তেল আর বোতলজাত তেলের দাম একই!

দেশের বাণিজ্যিক শহর চট্রগ্রামে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে চট্টগ্রামের আছাদগঞ্জ পাইকারী বাজারে লাল সরিষা কেজি প্রতি ৬০ টাকা দরে মণ ২৪০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর সাদা সরিষা কেজি প্রতি ৮০ টাকা দরে মণ ৩২০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি লাল সরিষা ৮০ টাকা এবং সাদা সরিষা ১২০ টাকা।

চট্টগ্রামে ঘাঁনিতে ভাঙানো সরিষার তেল বিক্রিয়কারী প্রতিষ্ঠান রেখা সরিষার তেল’র ম্যানেজার বলেন, ‘তিন কেজি সরিষা থেকে এক লিটার তেল হয়। আর এক লিটার তেল এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা করে।’

ঘাঁনিতে ভাঙানো সরিষার তেল যেখানে ২০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে, সেখানে রাজধানীর বাজারে বোতলজাত ব্র্যান্ডের কোম্পানির তেলগুলো বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২৩০ টাকার মধ্যে।

অবশ্য চট্রগ্রামে ২০০ টাকা করে ঘাঁনিতে ভাঙানো তেল বিক্রি হলেও সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, বরিশালে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ১৫০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে সরিষার তেল।

এব্যাপারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরীজীবী মো. হারুন বলেন, ‘যেখানে আপনি ঘাঁনি থেকে এক নম্বর সরিষার তেল ১৮০ বা ২০০ টাকা করে কিনছেন, সেখানে যারা ব্রন্ডের বোতলজাত তেল ১৮০ টাকা ২০০ টাকায় বিক্রি করছে। একইদাম রেখে কিভাবে তারা এক নম্বর খাঁটি সরিষার তেল দিচ্ছে। এটা নিয়ে তো প্রশ্ন থেকেই যায়।’

‘তাদেরতো বিজ্ঞাপন খরচ ও পণ্যের গুণাগুণসহ আরো কিছু কাজ করে উৎপাদন করে কোম্পানিগুলা। তাহলে তাদের সরিষার তেলের মান নিয়ে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে। আদৌও তারা মানসম্মত সরিষার তেল দিচ্ছি কিনা?’ যোগ করেন তিনি।

একই বিষয়ে প্রফেসর ড. এবিএম হামিদুল হক বলেন, ‘সরিষার তেলের দাম বেশি বলে কোম্পানিগুলো পামওয়েল বা ভেজিট্যাবল ওয়েল মিশাচ্ছে। কম খরচে সরিষার তেল বিক্রি করতে পারছে। এর দ্বারা তেল কোম্পানিগুলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা করছে।’

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) এর সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক বলেন, ‘আমরা ভেজাল রোধে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। ভেজাল পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করছি।’

কমেন্টস