তিনি যোদ্ধা, তিনি জননী; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের

প্রকাশঃ মে ৩, ২০১৮

জাহানারা ইমাম

মেরিনা মিতু।। 

তিনি যোদ্ধা। তিনি সাহসী। তিনি জননী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের। একাধারে তিনি একজন লেখিকা, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রীও। জাহানারা ইমাম। ডাকনাম জুড়ু। তবে শহীদ জননী হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত।

আজ এই মহীয়সীর জন্মদিন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত নিরলস লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই সাহসিকা ১৯২৯ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন। ৮৯তম জন্মবাষির্কীতে বিডিমর্নিং পরিবারের পক্ষ থেকে শুভ জন্মদিন শহীদ জননী।

তার লেখা সেই বিখ্যাত গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নিজের বড় ছেলে শফি ইমাম রুমী বীরত্বের কথা। বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে নির্মম নির্যাতনে শহীদ হন রুমী।

স্বাধীনতা অর্জনের পর রুমীর বন্ধুরা জাহানারা ইমামকে সব মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন। সেই থেকে তিনি শহীদ জননী। মৃত্যুর পরও অমর তিনি। তরুণ প্রজন্মের মনেও আজও শ্রদ্ধা অম্লান ভালোবাসায় সমুজ্জ্বল তার স্মৃতি।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্ম হয় এই মহীয়সীর। ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান পরিবার বলতে যা বোঝায়, সে রকম একটি পরিবারেই তিনি জন্মে ছিলেন। জাহানারা ইমামের বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম সুগৃহিণী ছিলেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে উঠা আন্দোলনের ফসল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করছেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের কথা স্মরণ করে তিনি বিডিমর্নিংকে বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে নিরলস লড়াইটির বাস্তব রুপ যিনি দিয়েছেন সেই আমাদের জননী একজন ব্যক্তিত্ব, একজন প্রতিষ্ঠান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতবাদের সাহসিকতায় একজন দৃষ্টান্ত তিনি।“

তার ব্যক্তিগত  জীবনের চিত্র এক নজরে-

১৯৪২ সালে জাহানারা ইমাম মাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বিএ পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

শিক্ষক হিসাবে তাঁর কর্মময় জীবনের প্রথম সময় কাটে ময়মনসিংহ শহরে। সেখানে বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (১৯৫২-১৯৬০), বুলবুল একাডেমি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক (১৯৬২-১৯৬৬)এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক (১৯৬৬-১৯৬৮) হিসাবে তাঁর কর্মজীবন অতিবাহিত হয়। তিনি কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন।

সাড়া জাগানো সেই আন্দোলন-

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির মূলহোতা গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করে। সেদিন থেকেই শুরু হয় জনবিক্ষোভের। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়।

জাহানারা ইমামকে করা হয় এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়।

এই কমিটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধকেই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য উল্লেখ করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

তবে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার জাহানারা ইমামসহ গণআদালতের সঙ্গে যুক্ত ২৪ জন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে।

ইতিহাস কখনো হারায় না। তরুন প্রজন্মের মধ্যে শিহরণ জাগানো স্মৃতিগুলো যুগ যুগ ধরে জ্বলবে। সেই স্মৃতিতে জাহানারা ইমামকে শহীদ জননী হিসেবে ভালোবাসা অম্লান থাকবেই।

কমেন্টস