সবুজ ঢেউয়ে বদলে যাবে শেরপুর

প্রকাশঃ মে ৩, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির এই তালিকায় যুক্ত হলো শেরপুর জেলার নাম। বন্য হাতির আক্রমণে ফসল ও প্রাণ হারানোর বিশেষ পরিচিতি আছে এ জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার। সেই পাহাড়ি জনপদ এখন নতুন সৌন্দর্যে সাজবে। চায়ের জেলা হিসেবে নতুন পরিচয় পাবে। ক্ষেত্র তৈরি হলো নতুন সম্ভাবনারও। সবুজের ঢেউ খেলানো মনোরম দৃশ্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। গত ২৯ এপ্রিল  স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কৃষকসহ ওই এলাকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে শুরু হলো সেই যাত্রা।

শেরপুরে এই চা চাষের উদ্যোক্তা ‘গারো হিলস টি কম্পানি’। তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকজনকে এর মধ্যেই চা চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা গেছে চাঞ্চল্য। বাণিজ্যিকভাবে  চা চাষের লক্ষ্যে এরই মধ্যে  স্থানীয় ২৭ জন কৃষকের মাঝে ২৭ হাজার উন্নত জাতের চা চারা বিতরণ করা হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে চা চারার রোপণ। প্রাথমিক লক্ষ্য ছোট আকারের চা বাগান গড়ে তোলা।

গারো হিলস টি কম্পানির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসাইন ফনিক্সের প্রত্যাশা, এখন গারো পাহাড়ের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়বে চা চাষ। এর মাধ্যমে পাহাড়ি জনপদে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের অনন্য সুযোগ তৈরি হবে। আর উৎপাদিত চা শেরপুর জেলা তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি বলেন, সরকার পুরোপুরি সহযোগিতা করলে এ পাহাড়ে চা আবাদ করে বিপ্লব ঘটানো যাবে। ২৯ এপ্রিল বিকেলে ঝিনাইগাতীর বনরানী রিসোর্টে চাষিদের মাঝে চা গাছের চারা বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে আমজাদ হোসাইন এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

উদ্যোক্তারা জানান, ২০০৪ সালে বাংলাদেশ চা  গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে। ওই সময় তারা ঝিনাইগাতী উপজেলায় এক হাজার ৮৫৬ একর, নালিতাবাড়ী উপজেলায় দুই হাজার ৫০০ একর ও শ্রীবরদী উপজেলায় এক হাজার ১৫১ একর জমি রয়েছে যাতে চা চাষ করা সম্ভব বলে মতামত দেয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, উদ্যোক্তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা গড়ে ওঠেনি। প্রায় ১৪ বছর পর এবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে চা চাষ শুরু করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, চা চাষের উদ্যোক্তা ও স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, চা চাষের মাধ্যমে পাহাড়ি জনপদে বন্য হাতির তাণ্ডব কমবে এবং এ অঞ্চলে পর্যটনের বিকাশ ঘটবে।

চা চাষি মো. আব্দুল মোত্তালেব বলেন, ‘গত বৈশাখ মাসে ফনিক্স সাহেব (কম্পানির চেয়ারম্যান) আইসে আমগর পঞ্চগড় নিয়ে গেছিল। ওইখানে গিয়ে তেঁতুলিয়া, জিরো পয়েন্ট বেড়াইয়ে দেখলাম চা চাষ করে ওই দেশটা (পঞ্চগড়) খুব উন্নত হয়ছে। আর আমরা যে ফসলগুলা আবাদ করি তা হাতি খাইয়ে যা গা। এতে আমরা লাভবান হই না। শুনছি চা গাছটা হাতি খায় না। তাই আমরা এবার চা চাষ করে অনেক লাভবান হব।’

গারো নেতা অরুণ ম্রং বলেন, ‘গারো পাহাড়ে বন্য হাতির আক্রমণে ফসলাদি যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত। এ জন্য এ এলাকার চাষি ভাইয়েরা ফসল ঘরে তুলতে পারে না। যেহেতু এ এলাকা চা চাষে উপযোগী, তাই চা চাষ করতে চাষিরা ব্যাপক আগ্রহী হয়েছে।’

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) সাবেক কর্মকর্তা এম এ খালেক বলেন, ‘শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চা চাষাবাদের জন্য মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার সময় আমি বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে ছিলাম। এখানকার মাটি, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও অন্যান্য পরিবেশগত অবস্থা চা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানে চা উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।’

গারো হিলস টি কম্পানির উদ্যোক্তা আমজাদ হোসাইন ফনিক্স বলেন, পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে চা চাষের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগানো হবে। এরই মধ্যে কয়েক দফা স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে ক্রস ভিজিট করা হয়েছে। তিনি বলেন, বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্তর্গত শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলা; নেত্রকোনার দুর্গাপুর; ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এবং জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি জনপদের মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়া চা চাষাবাদের অত্যন্ত উপযোগী। তিনি বলেন, ‘চা চাষ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রচুর মুনাফা অর্জন সম্ভব। তাই স্থানীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে গারো পাহাড় অঞ্চলে চা চাষের সূচনা করা হয়েছে। আশা করি, অচিরেই এর সুফল মিলবে।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রাশেদুল হাসান বেসরকারি উদ্যোগে চা চাষ শুরু হওয়ায় উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ জানান। তিনি বলেন, এখানে চা বাগান গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটনেও আকৃষ্ট হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা করা হবে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাদশা বলেন, ‘পাহাড়ি জনপদে কর্মসংস্থানের খুব অভাব। এমন অবস্থায় এগিয়ে এসেছে গারো হিলস টি কম্পানি। আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই। আশা করি, এর মধ্য দিয়ে পাহাড়ি জনপদে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।’

কমেন্টস