শ্রীপুরে বেড়েই চলছে শিশুশ্রম

প্রকাশঃ এপ্রিল ৩০, ২০১৮

এস.এইচ.সানি, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: 

গাজীপুরের শ্রীপুরে মাওনা চৌরাস্তা বাস টার্মিনাল। এ টার্মিনালে প্রায় তিন বছর পূর্বে হেলপার হিসেবে লেগুনাতে কাজ করতো নুরু মিয়া নামের সাত বছরের এক শিশু। নুরু মিয়া শ্রীপুরের এম সি বাজার এলাকায় মা ও বোনের সাথে বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করতো। প্রতিদিন  ভোর সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো তাকে। সারা দিন পরিশ্রমের বিনিময়ে পাইতো মাত্র ১০০টাকা মাত্র। আর প্রতিদিনই  এই ঝঁকিপূর্ণ যানবাহনের কাজে কেউ না কেউ যুক্ত হচ্ছে।

শ্রীপুরে নুরুর মত হাজারও শিশু ঝঁকিপূর্ণ কাজে প্রতিনিয়ত নিয়োজিত হচ্ছে । শ্রীপুর বাসস্টেন্ড থেকে রেল স্টেশন পর্যন্ত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে ঝঁকিপূর্ণ কাজ সম্পাদন হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের দিয়ে। শুধু এখানেই শেষ নয় ,শ্রীপুর উপজেলায় সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় ১০ হাজার শিশু শ্রমিক রয়েছে  যাদের মধ্যে বেশির ভাগ শিশুই শারিরীক শ্রমে নিয়োজিত ।যারা নিয়োজিত তাদের বেশির ভাগই ঝঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত । শ্রীপুরে সরকারী ভাবে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা জানা না গেলেও বেসরকারিভাবে ধারনা করা হচ্ছে দশ হাজারের বেশি ।

শ্রম আইন অনুযায়ী শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো সম্পূর্ণ নিষেধ হলেও আইন অমান্য করে ছোট বড় প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা । সরকারের গেজেট সূত্রে জানা যায় প্রায় ৩৮ রকমের কাজ শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও দিন দিন এ সকল কাজে শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখাযায়, শ্রীপুরে ব্যাস্ততম ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের শ্রীপুর অংশে বাঘের বাজার এলাকা, গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ী, ২নং সি এন্ড বি , মাওনা চৌরাস্তা, এম সি বাজার ,নয়নপুর বাজার, জৈনা বাজার সহ শ্রীপুর শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন সংযোগ সড়ক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত রয়েছে কয়েক হাজার শিশু শ্রমিক। প্রায় সময় দেখা যায় যাত্রিবাহী যানবাহনের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালণ করতে।

অন্য দিকে শ্রীপুর উপজেলার বড় ছোট সব রকমের হোটেল ও চায়ের দোকান পরিচালনা করা হয়ে থাকে শিশুদের দিয়ে।একই ভাবে বিভিন্ন কলকারখানায় সকাল-সন্ধ্যা কাজ করছে বহু শিশু। এদের মধ্যে বেশিরভাগ কারখানায় গভীর রাত কোথাও কোথাও সারা রাত পযর্ন্ত বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ন কাজে নিয়োজিত থাকে শিশুরা।

নাম হাফিজুল। বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। হাফিজুল শ্রীপুরের টেপিরবাড়ী  এলাকার আবুল হাসেমের ছেলে। বাবা অসুস্থ্য থাকায় সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাকে। তাই হাফিজুল কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছে রিক্স্রা চালানো। শিশুরা পবিত্র,নিষ্পাপ। শিশুদের মন স্বর্গীয় ফুলের মতোই সুন্দর। শিশুরা মাটির মতোই সুন্দর, এদের যে পাত্রে রাখা যাবে তারা তেমন রূপই ধারণ করবে। তাই উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত সমাজের শ্রেণির পরিবারগুলো তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে সন্তানদের আগলে রাখতে বা অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে।

এদিকে দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের চিত্র উল্টো আবার যাদের পিতা-মাতা এই পৃথিবীতে নেই তাদের জন্ম যেন হয় আজন্ম পাপ। দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের সুবিধাবঞ্চিত প্রায় শিশুরাই নিতান্ত পেটের দায়ে ঝুঁকির্পূণ কাজগুলোকে তাদের নিত্য-নৈমিত্তিক পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসের শিকার সবচেয়ে বেশি এক শ্রেণির শিশুরা।

শিশুদের কলকারখানায় নিয়োগ করে একশ্রেণির স্বার্থানেশী মহল অধিক মুনাফা অর্জন করে চলছে। আইন এবং ফাইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মহাজনরা তাদের কাজ হাসিল করে চলছে, তা থামানোর মতো যেন কেউ নেই আমাদের দেশে। সমাজ ব্যবস্থায় তাদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। তারা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য মৌলিক অধিকারগুলো থেকেও বঞ্চিত।

আজ তারা এমন করুণ অবস্থায় অবস্থান করছে যে, তাদের এক ঘণ্টার কার্যলাপ কোনো লেখক-লেখিকা লিখে শেষ করতে পারবেন না। তবে এইটুকু সহজেই বলা যায় আজ যারা পথশিশু বা শিশু শ্রমিক তাদের যেন প্রকৃতি নেই, পরিবেশ নেই, অবুঝ শৈশব নেই, ভবিষ্যৎ চিন্তা নেই, পরিবারের অর্থ জোগান এবং নিজেদের ক্ষুধা নিবারণ করতে যেন তারা ব্যস্ত। আজ এমন ভাবে বেড়ে উঠছে তারা যা ভবিষ্যৎ জাতির জন্য ভয় বা বিপদ। যা আমাদের দেশ ও জাতির কাম্য নয়। শিশুদের শ্রমিক বৃত্তিতে নিয়োগ ও নৃশংসতা শিশু শ্রমিক বৃত্তি নিয়োগ প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে।

বর্তমানে সভ্যদেশ সমূহে মানুষ যেখানে বিবেক শক্তি ও স্বাধীনতা বোধের বড়াই করে, সেখানেও কেন থাকবে শিশু শ্রমিক লজ্জাজনক এই উদাহরণ। সারাদিন চৌদ্দ থেকে ষোলো ঘণ্টা কাজ করে ওই শিশু শ্রমিকটি যা আয় করে, তাতে তার নিজের আহারের সংস্থানও হয় না। অদক্ষ শ্রমিক বলে নেই তাদের কোনো নির্দিষ্ট মজুরি। সামান্যতম অমনোযোগের অভিযোগে লাথি ও বেত্রাঘাত সহ্য করতে হয় তাদের।

হয়তো এসব শিশুশ্রমিকের চোখের জলের হিসাব হয়তো পৃথিবীর সভ্য সমাজের কাছে রাখার সময় নেই। এই হাজার হাজার শিশু শ্রমিকের চোখের জল আজকের পৃথিবীকে ভাবিয়ে তুলছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

অনেকেই বলছেন, এর প্রধান কারণ দারিদ্র্য। আর এই দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা নিজের শ্রম বিক্রি করে জীবণ ধারণ করছে। দেশ ও জাতিকে তারা অভিশাপ দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলছে তীব্র গতিতে। যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। আজ তারা তাদের প্রাপ্য অধিকার টুকু পাচ্ছে না। আমরা জানি, মানুষের মৌলিক অধিকার পাঁচটি। আমরা যদি ওদের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমরা জাতি যা চাই তা পাওয়াটা বোধ করি খুব কঠিন হবে না।

শিশু শ্রমের কারনে একদিকে যেমন এসব শিশু খেলা ধূলা ,পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ও বিঘ্নিত হচ্ছে ।স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া এবং  শ্রমে নিয়োজিত হওয়ার অণ্যতম কারন হলো পরিবারের দারিদ্রতা, বাব-মার কাছ থেকে সেবা বা যত্নের অভাব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশুরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়া, সংসারে অর্থের যোগান দিতে শ্রমে নিয়োজিত হয়ে পড়ে শিশুরা এমনটা। বর্তমান সময়ে আমরা দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করছি।

শ্রীপুরে হাজী ছোট কলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন আব্দুল হান্নান সজল বলেন, স্বল্প বেতনে শ্রম পাওয়া যায় এই লোভে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের শিল্পপতিরা  নানা রকমের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের কাজের দিকে ঝুকাচ্ছে।

বিধি অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কোন শ্রমিক কে নিয়োগ দেওয়া নিষেধ থাকলেও তা মানছেন না কারখার মালিক পক্ষ। শিশুশ্রম বন্ধ করা বর্তমানে সময়ের দাবি।

কমেন্টস