ইমামের উসকানিতে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা বন্ধ!

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৭, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

নামাজ না পড়ানোর হুমকি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বৈশাখী মেলা বন্ধ করেছেন এক ইমাম। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কয়েক দশক ধরে বৈশাখী মেলা বসে এসেছে।  আশপাশের গ্রামসহ দূর-দূরান্ত থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এতে অংশ নেয়। গত বছর সাত দিনব্যাপী ওই মেলা বসেছিল। এবার মেলা বসতে দেননি পাশের মসজিদের ইমাম হাফেজ জয়নাল আবেদীন। জানা যায়, সাত মাস আগে ভাটরা জামে মসজিদের ইমাম হিসেবে যোগ দেন জয়নাল আবেদীন। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে।

নিজেকে মুফতি দাবি করে ইমাম জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমি মানুষকে মসজিদে বুঝিয়েছি। আমার এ চেষ্টা ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে ধরেছে। অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের সতর্ক করেছেন, এ জন্যই হয়তো মেলাটি হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় আইন শরিয়াহর বিরোধী হলে তাও মানা হবে না। লাল সালু পরে হিন্দুরা বাংলা বর্ষ পালন করবে, সেখানে মুসলমানদের কী?’ জানা যায়, ইমাম সাহেবের বক্তব্যের পর মেলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কিছু অতি উৎসাহী মুসল্লি মারমুখী হয়ে ওঠে এবং মেলার আয়োজন পণ্ড হয়ে যায়।

ভাটরা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘মসজিদের মধ্যে ইমাম সাহেব মুসল্লিদের ভুল বুঝিয়েছেন। মেলার আয়োজনের বিষয়ে তাত্ক্ষণিক তারা সংক্ষুব্ধ হয়। এ সময় তিনি বিদ্যালয় মাঠে মেলা করা হলে নামাজ না পড়ানোর হুমকি দেন।’

ভাটরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জামাল মুকবুল বলেন, ‘ইমাম সাহেব মসজিদে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মেলা রুখে দিয়েছেন। আমরা ছোটবেলা থেকে এ বিদ্যালয়ের মাঠে মেলা দেখে আসছি। গত বছরগুলোতে আমাদের যেসব দলীয় নেতাকর্মী এটি পরিচালনা করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ইমামের উসকানির জন্যই মেলা হয়নি।’

ভাটরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শনিবার তিনি যাননি। তবে ওই দিন মাঠে মেলা হয়নি। কী কারণে মেলা হয়নি তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি আরো জানান, আবার মেলা হবে। এর প্রস্তুতি চলছে।

মেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ভাটরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন মিঠু বলেন, ‘আমি অসুস্থ, ঢাকায় আছি। অন্য বছরগুলোতে ভালোভাবে মেলা করা হলেও এবার তা করা হয়নি। তবে আমরা ওই মাঠে শিগগির মেলা করব। এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

জানতে চাইলে রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তোতা মিয়া বলেন, ‘এ বিষয়টি কেউ আমাকে জানায়নি। তবে খোঁজখবর নেওয়া হবে।’

রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু ইউছুফ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে অনুমোদন ছাড়া কোথাও যেন কেউ মেলা করতে না পারে, সে জন্য থানার ওসিকে আমি একটি চিঠি পাঠিয়েছে।’

ভাটরা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, ‘ঘটনাটি কেউ আমাকে জানায়নি। বর্ষবরণ ও মেলা বাঙালির ঐতিহ্য। এটি আমাদের প্রাণের উৎসব। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গ্রামীণ মেলা বন্ধ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মাইন উদ্দিন পাঠান বলেন, সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে মানবিক মানুষ ও সমাজ গঠনে মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীন চিন্তার প্রসারেও এর ভূমিকা অসীম। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাম্প্রতিককালে মতলববাজরা ধর্মকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা গড়ে তুলেছে। এদের প্রতিরোধ করতে সচেতন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসককে (ডিসি) মোবাইল ফোনে কল করলেও সাড়া মেলেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পহেলা বৈশাখের দিন সকালে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক ব্যবসায়ী এলেও দুপুর নাগাদ তারা ফিরে যায়। আশপাশের গ্রামের যারা জানত না তারাও এসে দেখে এবার মেলা হচ্ছে না।

কমেন্টস