কোটাযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য!

প্রকাশঃ এপ্রিল ২, ২০১৮

কোটার জন্ম ও বাংলাদেশের জন্ম একটি জায়গায় মিল আছে। পাকিস্থান আমলে ঠিক ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়তো বাঙালিরা। মেধা যোগ্যতা সব থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত বাঙালিরাই প্রতিবাদী হয়ে উঠল। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে সেই যুদ্ধে রাজপথ দখল করেছে মেধাবীরা। পার্থক্য পরাধীনতা শক্তি আর স্বাধীনতা শক্তির। আমরা দেখছি আর আলোচনা সমালোচনা করছি ও দিচ্ছি সমর্থন। কিন্তু কেন?

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা প্রথা সংস্কারের জন্যে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন দানা বেধেছে বহুবার কিন্তু কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে এবারই। টনক যে নড়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই স্পষ্ট। জনসম্মুখে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন কোটা থাকবে। কারণ যাদের জন্যে এই কোটা, তারা না থাকলে এই দেশ আমরা পেতাম না। জানি না প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীরা কিভাবে নিবেন। তবে আমরা ব্যথিত হয়েছি।

সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী কোটা এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটাসহ মোট ৫৬ ভাগই কোটাধারীদের জন্যে বরাদ্দ। মোট জনসংখ্যার তুলনায় কোটাধারী জনসংখ্যা অনেকটা হাতেগোনার মত হলেও এই সুবিধা তারা পান। ১ দশমিক ১০ শতাংশ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ১ শতাংশ, ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা পোষ্যদের জন্য ৩০ শতাংশ এবং নারীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটার কারণে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এছাড়াও জেলা কোটায় ১০ শতাংশ নিয়োগ এ অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়ি দেয়। হতাশার রাজ্যে নিমিজ্জিত এই তারুণ্যকে নিয়ে ভাববার সময কি আমাদের আজও হয়নি। আজ মেধা আর কোটা বৈষম্য বাড়তে বাড়েতে ৫৬ শতাংশ কোটা মেধাকে পেছনে ফেলছে বিদ্যুতের গতিতে। এর লাগাম টেনে ধরবে কে? প্রধানমন্ত্রী কি পারেন না?

রাষ্ট্র বনাম কোটা আন্দোলন আজকের এই পরিসংখ্যানের সর্বশেষ হিসাব। কিন্তু আমাদের আশা ছিল রাষ্ট্র কখনো মেধার বিপরীতে যাবে না। অথচ ২১ মার্চ চট্টগ্রামের পটিয়ায় কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য আমাদের আশাকে হতাশায় পরিণত করলো এবং দীর্ঘদিনের কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের হতাশ ফেলেছে। তাদের বক্তব্য যার অনুগ্রহের দিকে তাকিয়ে আমাদের এই আন্দোলন তিনি এ কি বললেন?

২৬ ফেব্রুয়ারিতে ‘মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস’ এর পক্ষে আমরা মুক্তিযোদ্ধা ৫, নারী ২, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ২ ও প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ কোটা রাখার একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। অনেকেই একমত প্রকাশ করেছেন।

কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্য হলো এমন, “কোটা ব্যবস্থা রাখতেই হবে, কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তাদের (মুক্তিযোদ্ধা) আমাদের সম্মান দিতেই হবে। তাদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, পুতি পর্যন্ত যেন চাকরি পায়, তার জন্য কোটার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আর যদি কোটায় না পায়, তাহলে ইউনিভার্সিটির যারা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী তাদের দেয়া যাবে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমাদের এ বিশেষ ব্যবস্থা করতেই হবে। আমাদের দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তাদের বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছি। এ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এ কথা ভুললে চলবে না।”

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার প্রশংসা করছি আমরা। এই সরকারের আমলেই মুক্তিযোদ্ধারা সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম ছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশের বৃহৎ গোষ্ঠীর জন্যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি অনেকটা চ্যালেঞ্জেবলই মনে হলো আমাদের কাছে। ভবিষ্যতের জন্যে এই বক্তব্য বৈষম্যের মাত্রাকে যোজন যোজন বাড়িয়ে দিবে।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাংলার বেশির ভাগ মানুষই প্রস্তুত ছিল। বিরুদ্ধে ছিল শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় রাজাকার, আল-বদর, আল সামস ও পাকিস্তানী কতক প্রেতাত্মা। কয়েক লাখ মানুষ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও সবাই এপারে ওপারে থেকেও দেশ স্বাধীনের পক্ষে ছিলেন। কেউ তথ্য দিয়ে, কেউ খাবার দিয়ে, কেউ আশ্রয় দিয়ে, কেউ সমর্থন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছেন। স্বাধীনতার জন্যে সবার ত্যাগ ও সমর্থনই স্বাধীনতার অর্জন। সে অর্থে শুধুমাত্র পাকিস্তানপন্থীরা ছাড়া সবাই মুক্তিযোদ্ধা।

কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন তারাও ব্যক্তি স্বার্থের জন্যে যুদ্ধে যাননি। দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধের জায়গা থেকে দেশ স্বাধীনের জন্যে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান এটা সবচেয়ে বড় সত্য। তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা প্রজন্মান্তরে আমাদের দিতেই হবে। আমরা দিচ্ছিও আজ। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কিন্তু সরাসরি যদ্ধের হাতিয়ার ধরতে পারেননি এমন মানুষদের পিছিয়ে ফেলার যুক্তি কি? মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র ধরা আর অস্ত্র না ধরাই যদি মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে পার্থক্য হয়, তাহলে যে বিদেশী যোদ্ধাদের আমরা সম্মাননা দিচ্ছি তারা কি অস্ত্র হাতে আমাদের দেশে যুদ্ধ করেছেন? ভাবতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিয়ে। সরাসরি অস্ত্রহাতে যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে কিন্তু এতটা কেন? ৫৬ শতাংশ চাকরি যদি রাষ্ট্রীয় কোটায় চলে যায়, তবে মেধাবীদের জন্যে আর থাকলো কি? তাই কোটার সমর্থনে প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য আমরা আশা করিনি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী মোট ২০ লাখ ৯৭ হাজার ১৮২ শিক্ষার্থী রয়েছে। ৩৮টি সরকারি ও ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি ১০৪টি মেডিকেলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় অর্ধকোটি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। কিন্তু আমাদের অর্ধকোটি চাকুরির বাজার কি এখনো তৈরি হয়েছে?

বেকারত্বে বাংলাদেশের চিত্রটা কি আমাদের জানা আছে? ২০ মার্চ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ১১ দশমিক ২ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষা আছে এমন লোকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ক্রমবর্ধমান।

বিপরীতে সরকারি চাকরিতে প্রবেশসীমা সর্বোচ্চ ৩২ বছর হওয়ার কারণে বেকারত্ব আরো বেড়ে চলছে দিনকে দিন। তাই এবার চাকুরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবিতেও আন্দোলন করতে হচ্ছে চাকরিপ্রার্থীদের। কিন্তু কোটা সংস্কারের আন্দোলন, চাকরিতে প্রবেশের আন্দোলনে সরকারের কি আদৌ কোন ভ্রুক্ষেপ আছে? যদি থাকতো তাহলে প্রধানমন্ত্রী কোটার সমর্থনে এভাবে বক্তব্য দিতেন না। একই রাষ্ট্রে মেধাবীরা আন্দোলন করবে কোটা কমাতে, বয়স বাড়াতে কিন্তু কোটা ধারীরা বিনা পরিশ্রমে মামার বাড়ির আমের মতো চাকরি পেয়ে যাবেন মেধাবীদের ডিঙ্গিয়ে! এটা স্বাধীন রাষ্ট্রে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অতিরিক্ত কোটা-ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে মারাত্মক গোলযোগের সৃষ্টি করছে অনেক অযোগ্যরা। যোগ্যপ্রার্থীর অভাবে বছরের পর বছর বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ যেমন খালি থাকছে, তেমনি অযোগ্য কিন্তু কোটাধারী হলেই দখল করে নিচ্ছে চেয়ার। এটা মেধার যুদ্ধের জন্যে অত্যন্ত বেদনার, কষ্টের। ৪৭ বছর স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীনতার সমর্থনের পক্ষের জন্যে সবচেয়ে বড় পরিতাপের বিষয়।

শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের সংবিধানেরও পরিপন্থী এই কোটা পদ্ধতি। সংবিধানের ২৯(১) ধারায় সরকারি নিয়োগ লাভের সুযোগের সমতায় লেখা আছে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে। কিন্তু ৫৬ শতাংশ কোটাকে সমর্থন দিয়ে প্রধামন্ত্রী কি সংবিধানকে অবহেলা করেছেন? নাকি কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়েন? এমন পরিস্থিতিতে দুটো জিনিস আমাদের সামনে আছে। এক. হয় সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে, দুই. না হয় কোটা পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে। জানি না, প্রধানমন্ত্রী কোনটা করবেন। আশা করি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানকেই অক্ষুণœ রাখবেন।

এই সিদ্ধান্ত নিতে যদি আমরা আজ কালক্ষেপন করি তাহলে বিশ্বায়নের এই বুদ্ধিভিত্তিক কর্মতৎপরতায় মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে সুযোগ কম পাবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে মন্থর গতিতে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়তে চৌকস, দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। সেই দক্ষ ও চৌকস জনশক্তি তৈরি করতে কোটা সংস্কারের প্রয়োজন সময়েরই দাবি। কেবল প্রধানমন্ত্রীই পরেন এই দাবি পূরণ করতে।

ফারুক আহমাদ আরিফ, আরিফ চৌধুরী শুভ, মেসবাউল হাসান, এনায়েতুল্লাহ কৗশিক, রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী, খাইরুল ইসলাম বাশার, এস এম সুজাউদ্দীন, আরিফুল ইসলাম, নাসিম শুভ।।

লেখকবৃন্দ ‘মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস’ সদস্যবৃন্দ।

কমেন্টস