লিফটচাপায় আলভিরার মৃত্যুঃ বাবা-মায়ের শরীরে ঝরছে মেয়ের রক্ত

প্রকাশঃ মার্চ ৩০, ২০১৮

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

রাজধানীর শান্তিনগরে আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের গ্রিন পিস অ্যাপার্টমেন্টের (৪১ চামেলীবাগ, পপুলার ডায়গোনিস্টের বিপরীতে) লিফটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে শিশু আলভিরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ মার্চ) রাতে আলভিরার মা রুনির জন্মদিনে মেয়ে আলভিরার মৃত্যুর সাক্ষি হল পুরো পরিবার।

আলিবাবা ডোরের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী শিশুটির দাদা। তার বাবার নাম শিপলু চৌধুরী আর মা রুনী বেগম।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২৯ মার্চ বৃহস্পতিবার ছিল আলভিরার মা রুনির জন্মদিন। এজন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রাতে বাইরে ডিনার করতে যাচ্ছিল পরিবারের সবাই। রুনির কোলে ছিল ছয় মাস বয়সী শিশুসন্তান। আর আলভিরা বাবার হাত ধরে ছিল। কিন্তু বাসার লিফটের দরজায় চাপা পড়ে বাবা-মায়ের সামনেই প্রাণ দিতে হয়েছে নিষ্পাপ আলভিরাকে।

এদিকে মারা যাবার আগেও বাবা শিপলুর হাত পরম স্নেহে ধরে রেখেছিল আলভিরা।

পরিবারের অভিযোগ, লিফটের সেন্সর ঠিকমতো কাজ না করায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

শিশুটির আত্মীয় সুজন মাহমুদ জানান, লিফটের সেন্সর কাজ না করুক, তাড়াতাড়ি দরজাটা খুললে মেয়েটি হয়ত আহত হত বা কিছুটা ব্যথাই পেত। তবুও তো সাতরাজার ধন বাবা-মায়ের বুকে বেঁচে থাকত। কিন্তু কিছুতেই কিছু করা গেল না। স্কয়ার হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে অনেক চেষ্টা করেও আলভিরাকে ফেরানো গেল না।

শিপলু চৌধুরীর ভাই পিয়াল জানান, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (২৯ মার্চ) আলভিরার মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে সবাই রাতে বাইরে যাচ্ছিল ডিনার করতে। রুনির কোলে ছিল ছয় মাস বয়সী শিশুসন্তান। আর আলভিরা তার বাবার হাত ধরে ছিল। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় শিপলু যথারীতি ড্রাইভার বাদশাকে ফোন দেয় গাড়ি রেডি করতে। তখন লিফটটা ১৫ তলায় এসে থামল। কিন্তু লিফটি উপরের দিকে যাচ্ছিল। কিছু একটা কনফিউশন থেকে উঠবে কি উঠবে না এমন পরিস্থিতি কিছুটা সময়ক্ষেপণ হয়।

‘কিন্তু হঠাৎ কী ভেবে আলভিরা লিফটে ঢুকে পড়ে। তখনও আলভিরা বাবার হাত ধরা ছিল। আর লিফটের দরজাটি তখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। শিপলু তখনও পেছনের দিকে টান দিলে আলভিরা হয়ত বেরিয়ে আসতে পারত। কিন্তু আদরের মেয়েকে পেছন থেকে টান দিলে ব্যথা পেতে পারে তাই সে টান দেয়নি, আর তখনও আলভিরার বডির বেশিরভাগ অংশ লিফটে ঢুকে যাচ্ছিল।’

তিনি বলেন, শিপলু ভেবেছিল আলভিরা উঠে যাক নামার সময় সবাই একসঙ্গে নামবে। এমনতো হর-হামেশাই আমাদের জীবনে ঘটছে। কিন্তু আশ্চার্যজনকভাবে ঠিক ওইসময় লিফটের সেন্সর ঠিকভাবে কাজ করল না। আলভিরার হাত বা পায়ের একটি অংশ লিফটে আটকে গেল। লিফটের সেন্সর কাজ করলে ১৫ এবং ১৬ তলার মাঝখানে। কিন্তু দরজাতে আলভিরার পা আটকে আছে। লিফটের ছাঁদের চাপে মেয়েটার মাথা ফেটে গেল। এরপর ওর শরীরের গরম রক্ত ফিনকি দিয়ে এসে লাগল জন্মদাতা বাবা-মায়ের গায়ে। মেয়েটা এভাবে ১৫-২০ মিনিট আটকে থেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ল। পরিবারের পক্ষ থেকে অ্যাপার্টমেন্টের অফিসে ফোন করলেও কেউ রিসিভ করেনি। ১৫ থেকে ২০ মিনিট শিশুটি আটকে ছিল আহত অবস্থায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরেছে বাবা-মায়ের শরীরে। এর চেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য আর কি হতে পারে।’

তিনি বলেন, মায়ের জন্মদিনই যে মেয়ের মৃত্যু দিবস হবে তা কে জানত? রুনি যতদিন বেঁচে থাকবে, সেকি আর জন্মদিন পালন করতে পারবে? যে লিফটে তার চোখের সামনে মেয়ের করুণ মৃত্যুর পর শিপলুই কী পারবে ওই লিফট বা অন্যকোনো লিফটে সহজে উঠতে? স্মৃতিজাড়ানো ওই বাসায় থাকতে?

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত আলভিরার প্রথম জানাজা শুক্রবার ওই অ্যাপার্টমেন্টের নিচে অনুষ্ঠিত হয়। পরে বাদজুমা উত্তরার ১৩নং সেক্টরের লেক মসজিদে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে ১২ নং সেক্টরের কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পল্টন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল করিম বলেন, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে খবর পেয়ে শান্তিনগরে আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের গ্রিন পিস অ্যাপার্টমেন্টের ওই বাসায় ছুটে যাই। পরে তাকে উদ্ধার করে স্কয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কমেন্টস