অর্ধশতক মানবসেবায় ব্রত ৪০ টাকার ডাক্তার তারা দু ভাই!

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৮

বিডিমনিং ডেস্ক-

১ টাকায় রোগি দেখা শুরু করেছিলেন ৫০ বছর আগে। বসন্ত কুমার রায় এখন রোগী দেখেন মাত্র ৪০ টাকায়। প্রতিদিন তার চিকিৎসা নিতে ভীড় জামান রোগিরা। অনেকে সেবা পান বিনা পয়সায়। তাঁর পথই অনুসরণ করেছেন ছোট ভাই তরুণ কুমার রায়। তিনিও ডাক্তার হয়ে ফিরে এসেছেন দিনাজপুরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেও নিজ শহরে দিনাজপুরে ফিরে এসেছিলেন বসন্ত কুমার রায় ও তার ভাই তরুণ কুমার রায়। 

দিনাজপুর শহরের কালিতলা এলাকায় স্থানীয় প্রেসক্লাব। সেখান থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে চলে যাওয়া গলি ধরে ৫০ গজ এগোতেই হাতের বাঁয়ে চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ড। লোহার ফটকের পাশে বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো সে বোর্ডে লেখা পাঁচজন চিকিৎসকের নাম—বসন্ত কুমার রায়, তরুণ কুমার রায়, সুস্মিতা রায়, সুদীপ্তা রায় ও উদয় শংকর রায়।

বসন্ত কুমার রোগী দেখা শুরু করেছিলেন ১ টাকায়। এখন দেখছেন ৪০ টাকা ভিজিটে। ‘তবু তা নির্ধারিত নয়’—বললেন, বসন্ত কুমার রায়। মানবসেবার ব্রত নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলা এই ডাক্তার আগামী ১১ মার্চ পূর্ণ করবেন তাঁর চিকিৎসাসেবার ৫১ বছর।

বসন্ত কুমার রায়ের পথ অনুসরণ করেছেন তাঁর ছোট ভাই তরুণ কুমার রায়। তিনিও ৪০ টাকা ফি নিয়ে রোগী দেখেন। ২০ ফেব্রুয়ারি এমন অনেক কিছুই জানা হলো বসন্ত কুমার রায়ের কাছ থেকে। যেমন জানা গেল, সাইনবোর্ডে লেখা বাকিদের পরিচয়—তরুণ কুমার রায় তাঁর ছোট ভাই। সুস্মিতা রায় ও সুদীপ্তা রায় বসন্ত কুমার রায়ের দুই মেয়ে। উদয় শংকর জামাতা, সুস্মিতার স্বামী। সুস্মিতা ও উদয় ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করেন। সুদীপ্তা রায় আছেন রাজশাহী শহরের একটি হাসপাতালে।

তাঁদের দুই ভাইয়ের খুব স্বল্প ফিতে রোগী দেখার বিষয়টি দিনাজপুরের সবাই জানেন। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন দুই ভাই।

১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার (বর্তমান পঞ্চগড়) দেবীগঞ্জের সুন্দরদীঘি গ্রামে জন্ম বসন্ত কুমার রায়ের। বাবা মধুসূদন রায় ও মা অহল্লা বালা রায়ের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় তিনি।

বসন্ত দেবীগঞ্জের এনএনএইচ উচ্চবিদ্যালয় ও রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। ১৯৬৫ সালে সেখান থেকেই এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই দিনাজপুরে রামকৃষ্ণ মিশনে যাতায়াত ছিল তাঁর। এমবিবিএস পাসের পর সেটা আরও বেড়ে গেল। তিনি বললেন, ‘সে সময় রামকৃষ্ণ মিশনের দায়িত্বে ছিলেন মহারাজ অমৃত্ত নন্দ। মূলত তাঁর সংস্পর্শে এসেই স্বামী বিবেকানন্দের ভক্ত হয়ে পড়ি।’ ভক্ত বসন্ত কুমার রায় শুরু করেন স্বামী বিবেকানন্দের জীবনচর্চা। নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন মানবসেবায়।

১৯৬৬ সাল, তখনো তাঁর ইন্টার্নি চলছিল রাজশাহী মেডিকেলে। তখন ঠাকুরগাঁওয়ের কল্পনা রানীকে বিয়ে করেন। এরপর ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে দিনাজপুরের ক্ষেত্রিপাড়ায় আবাস গড়েন। শুরু করেন চিকিৎসাসেবা।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। বসন্ত কুমার রায় চলে গেলেন ভারতে। চিকিৎসাসেবা দিতে যোগ দিলেন করতোয়া ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পটি শিলিগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের মাঝামাঝি একটি জায়গায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত তিনি এই করতোয়া ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ইনচার্জের দায়িত্ব নিয়ে চলে যান জলপাইগুড়ির বলরাম ক্যাম্পে। সেখানে তাঁর নেতৃত্বে পঞ্চগড়ের আবদুর রাজ্জাক এবং নীলফামারীর বিনোদ সাহা নামের দুজন চিকিৎসকসহ ২৪ জন স্বাস্থ্য সহকারী ছিলেন। সবাই মিলে গড়ে তোলেন একটি অস্থায়ী হাসপাতাল।

চিকিৎসাসেবা দেন শরণার্থীদের। বসন্ত কুমার রায় ফিরে গেলেন সেই দিনগুলোতে, ‘ওই ক্যাম্পে ৪০ হাজার শরণার্থী ছিলেন। বেশির ভাগ মানুষই এসেছিলেন আমাদের চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চল থেকে। নভেম্বর মাসের দিকে এই ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি।’ এই ক্যাম্পে থাকতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

বসন্ত কুমার রায় ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ফিরে আসেন দিনাজপুরে। ক্যাম্পের ইনচার্জ থাকলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি তিনি। বসন্ত কুমার রায় নিজেও একাধিকবার জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ জানিয়েছেন। কিছুটা আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘কোনো অজানা কারণে আমাকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি।’

বড় ভাই বসন্ত কুমার রায়ের দেখানো পথকে আদর্শ হিসেবে নিয়েছেন তরুণ কুমার রায়। তিনিও এমবিবিএস পাস করে সাধারণ রোগীদের জন্য স্বল্প ফিতে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।

তরুণ কুমার রায় নীলফামারী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে এসএসসি ও রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৮৬ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। সরকারি চাকরি হয়েছিল, কিন্তু যোগ দেননি। কারণ, নিজের এলাকায় কাজ করবেন।

তরুণ দিনাজপুরে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ১৯৮৮ সাল থেকে। ১৯৮৯ সালে রংপুরের বুড়ির হাটের অঞ্জলি রায়কে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে উৎস রায় এবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

১১ বছরের ছেলে আবু সাঈদকে নিয়ে এসেছিলেন ফুলবাড়ী উপজেলার বড়পুকুরিয়া এলাকার আমেনা খাতুন। তিনি বললেন, ‘অন্য ডাক্তারের যত ফি। হামার তো সামর্থ্য নাই।’

বসন্ত কুমার রায়ের বাড়িতে ঢোকার গলির পাশেই আইনজীবী মিজানুর রহমানের বাড়ি। এখানেই রোগী দেখেন তরুণ কুমার রায়। তাঁর চেম্বারেও একই দৃশ্য। অনেকে এসেছেন দূর-দূরান্ত থেকে। এই দুই ভাইয়ের চেম্বারে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো বিক্রয় প্রতিনিধির তৎপরতা দেখা গেল না।

এই দুই চিকিৎসক ভাই সম্পর্কে দিনাজপুরের সিভিল সার্জন মওলা বক্স চৌধুরী বললেন, ‘তাঁরা দুই ভাই অভিজ্ঞ ও স্বনামধন্য চিকিৎসক। চিকিৎসাসেবায় দুজনই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমাজের অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবার শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে তাঁদের সেবা।’

তাঁদের সম্পর্কে দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি চিত্ত ঘোষ বলেন, ‘বর্তমান সমাজে স্রোতের বিপরীতে দুই ভাই মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। আগামী প্রজন্ম এই দুই ভাইয়ের আদর্শ অনুসরণ করবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।’

কমেন্টস