প্রশ্নপত্র ফাঁস, গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও ফাঁস রোধে ‘এসিএসডিইএম’ মডেল!

প্রকাশঃ জানুয়ারি ২৭, ২০১৮

ফাখরুল ইসলাম হিমেল।।

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে  শিক্ষামন্ত্রণালয়কে বিকল্প প্রস্তব দেন ‘এসিএসডিইএম’ মডেলে ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ। মডেলটি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইনে প্রকাশিত হবার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে। অনেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ‘এসিএসডিইএম’ মডেলের পক্ষে বিপক্ষে নিজেদের মতামত দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষা-গবেষক ফাখরুল ইসলাম হিমেল এর মতামতটি বিডিমর্নিং এর পাঠকদের জন্যে হুবহু তুলে ধলা হলো।

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পিএসসি, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসি, চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াও এমন কোনো পরীক্ষা নেই, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে না। কোন ভাবেই এ ফাঁস রোধ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের তাবদ হুঙ্কার, আশ্বাস, ভবিষ্যদ্বাণী সবটাই যেন অকার্যকর মনে হচ্ছে।

ফলে পরীক্ষার ফলাফলের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে ‘প্রশ্ন ফাঁস’৷

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই অবস্থা অব্যহত থাকলে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে অচিরেই৷ বর্তমান সরকারের সাফল্য দেশবাসীর কাছে বেশ স্পষ্ট হলেও পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তাদের সে সফলতাকেই অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে। প্রায় সব পরীক্ষাতেই এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহল খুবই চিন্তিত। এ নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি থামছে না। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কানে  পানি ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে।  যদি তা হতো, তাহলে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটত না।

মজার বিষয় হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু কোন কমিটির তদন্ত আজও আলোর মুখ দেখেনি। কারা এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তাও অজানা থেকে যায়। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে নানা রকম পদ্ধতি গ্রহণ করা হলেও ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না কারণ এর সাথে জড়িতরা বিভিন্ন ভাবে সাপোর্ট পাচ্ছে। এটা রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে একটি নীতিবিবর্জিত প্রজন্ম উপহার দেয়ার মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেই আমি মনে করি।

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ লক্ষ্যে অনেকেই বিকল্প প্রস্তাবনা দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। অনেকগুলো প্রস্তাবনার মধ্যে ‘এসিএসডিইএম’ মডেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। অনেকগুলো অনলাইন মিডিয়া ও দৈনিক পত্রিকা এ মডেলকে ফলাও করে প্রকাশ করেছে। এই মডেলে ছাপাখানায় প্রশ্ন না ছাপিয়ে শতভাগ শুদ্ধভাবে যে কোন পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব বলে প্রস্তাবনা দিয়েছেন। প্রস্তাবকের আশা, মডেলটি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের শিক্ষাখাত হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অত্যাধুনিক একটি পরিক্রমা। কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এ মডেল কতুটুকু সফলতা আনতে পারে সেটাই এখন প্রশ্ন?

‘এসিএসডিইএম’ মডেলে এর পূর্ণরূপ হলো আরিফ চৌধুরী শুভ ডিজিটাল এক্সাম মডেল। ‘এসিএসডিইএম’ মডেলে রয়েছে ৬টি গুরুত্বর্পূণ ধাপ। ধাপগুলো হলো চাহিদা কমিশন, পরীক্ষা কমিশন, ফল কমিশন, নিয়োগ কমিশন, অভিযোগ কমিশন এবং তদারকি ও একশান কমিশন। এই ৬টি ধাপ নিয়ে গঠিত হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল শিক্ষা কমিশন বা ডিইসি। এই কমিশনই বাস্তবায়ন করবে এই ধাপগুলোর কাজ।

সংক্ষেপে এই মডেলটিতে মোট ৬টি ধাপে কাজ করবে। যার, সারসংক্ষেপ হল, ডিজিটাল পরীক্ষা কক্ষের ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষার কথা সমাধান হিসেবে দেখিয়েছেন প্রস্তাবক। পরীক্ষা কেন্দ্রে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বসানো হবে অস্থায়ী বড় আকারের ডিজিটাল কোর্ডযুক্ত বিশেষ মনিটর। এই মনিটরগুলো পরিচালিত হবে একটি বিশেষ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। মূলত এই মনিটরগুলোই হবে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল প্রশ্নপত্র। এটা এখন পর্যন্ত আমাদের গতানুগতিক শিক্ষাখাতের জন্যে একটা ইউনিক ধারণা মনে হচ্ছে আমার কাছে।

পরীক্ষার্থী যেন সুবিধামতো পরীক্ষা দিতে পারে, সেভাবে ডিজিটাল মনিটর বসানো হবে পরীক্ষা কক্ষে এবং প্রশ্ন ডেলিভারি দেওয়া হবে শুধুমাত্র কন্ট্রোল টাওয়ারের একটি নেটওয়ার্ক থেকে। সময় শেষ হওয়া মাত্রই মনিটর থেকে প্রশ্ন মুছে যাবে। এরপর উত্তরপত্র সংগ্রহের কাজ করবে পরীক্ষক। বিষয়টি আপাতত দৃষ্টিতে একটু জটিল ও আইটিবেইজড মনে হলেও বাস্তবায়ন করাটা বেশ জটিল হবে না যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে প্রাথমিকভাবে খরচ একটু বেশিই হবে। কিন্তু বার বার এ খরচ করতে হবে না।

আমরা এই মডেলের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করলে এর প্রায়োগিক বিষয় ও চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে পারবো।

চাহিদা কমিশনে আলোচ্য প্রস্তাব প্রতিযোগিতামূলক চাকরীর ক্ষেত্রেই বেশি উপযুক্ত। এবং এটা এখন এভাবে বাস্তবায়ন সময়েরই একটা দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগে সাত ব্যাংকের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র হরিলুটের ঘটনা আমাদের মস্তিষ্ক থেকে এখনো মুছে যায়নি। আন্দোলনের  তোপে সেই পরীক্ষা বাতিলও করা হয়েছে।

তবে একাডেমিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই কমিশনে আরো চিন্তার অবকাশ রয়েছে বৈকি, কেননা একাডেমিক পরীক্ষাগুলো সব বছরের একটি নির্ধারিত সময়ে নেয়া যাবে না।  তবে, আলোচনা করে আরো কিছু বিষয় যোগ করলে সেটিও সম্ভব হবে মনে করি।

অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এর নানাবিদ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে সময় ও অর্থ কিংবা হয়রানি অনেকাংশে কমে আসবে বলেও আমি মনে করি। মডেলটি বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এপ্ল্যাই করে দেখা যেতে পারে। ‍ বোধ করি, এই মডেলের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল পরীক্ষা কমিশন। এখানে, পুরো দেশের সব পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোকে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। এককালীন হিসেবে অর্থ ও বাস্তবায়ন অনেকটা কষ্টসাধ্য হবে, তবে অসম্ভব নয়। সব কেন্দ্রে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য যে ইন্টারনেট সংযোগ দরকার, তাতে সরকার ও মোবাইল অপারেটরগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। সব কেন্দ্রে নিরবিছিন্ন সংযোগ এই ধাপের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্যে দক্ষ ও সৎ জনবলের অধিক প্রয়োজন।

ফল কমিশনের কাজ প্রচলিত ধারায় মূল্যায়নের মত তবে পরিবর্তন আনা হয়েছে মূল্যায়ন স্থান ও সময়ের। যেহেতু মডেলটি প্রশ্ন ফাঁস রোধের জন্যই অনেকাংশে প্রস্থাবিত। সেহেতু ফাঁস রোধ করা সম্ভব হরে অন্য ধাপগুলোতে সফলতা আসবেই।

নিয়োগ কমিশনও শুধুমাত্র প্রতিযোগিতামূলক চাকরির জন্যই। তবে, এক্ষেত্রে প্রচলিত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রশমিত হবে এটা নিশ্চিত। বাংলাদেশ ব্যাংক পরীক্ষায় সাড়ে ৩ লাখ পরীক্ষার্থীর প্রায় দেড় লাখ পরীক্ষার্থী শুধু না জানার অভাবে আবেদন করা সত্ত্বেও পরীক্ষা দিতে পারেননি। অন্তত এমন কিছু ঘটবে না বলে আমার মনে হচ্ছে।

অভিযোগ ও এ্যাকশন কমিশন দুটি একসাথে কাজ করলেই বেশি সুবিধা হয়। কেননা, প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সুবিধা হবে এবং সময়ও কম লাগবে।

উল্লেখ্য যে, প্রতিটি কমিশন স্বাধীন হলেও, তাদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ খুবই জরুরি। আমি জানি না এ মডেলের পরবর্তী কোন ধাপে সেটি উল্লেখ আছে কি না? না থাকলে এটা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার মনে করছি।

প্রস্তাবটি প্রশংসনীয় ও বাস্তবিক মনে করছি সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। কারণ আমাদের গতানুগতিক সিস্টেম এখন আর কাজ করছে না। তবে এই মডেলের কিছু দুর্বলতাও আছে।

প্রথমত, মডেলের প্রস্তাবিত ডিজিটাল পরীক্ষা কেন্দ্র বাস্তবায়ন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দুরূহ বটে।

দ্বিতীয়ত, এই মডেলে প্রশ্ন প্রণয়নের সময় ফের প্রশ্ন ফাঁস হবার আশঙ্কা আছে। যদিও এ মডেলে শেষ পর্যায়ের প্রশ্নকর্তাদের নজরদারির কথা বলা হয়েছে।

পরিশেষে, সরকারকে আরও দায়িত্ববান ও যত্নবান হতে হবে। কারিগরি উৎকর্ষতার এই যুগে প্রযুক্তিকে অন্তরায় না ভেবে সরকারকে উচিৎ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই তার সমধান খোঁজা। আরিফ চৌধুরী শুভ এর ‘এসিএসডিএম’ মডেল ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশ্নফাঁস রোধে একটি যুগান্তকারী সমাধান হতে পারে। আপাতত দৃষ্টিতে আমি এমনটি মনে করছি।

কথায় আছে, লোহাই লোহা কাটতে পারে। শিক্ষা ও মেরুদণ্ডের মাঝে টিউমার হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘প্রশ্ন ফাঁস শব্দটি। এই টিউমারের (প্রশ্ন ফাঁস) আশু অপারেশন (সমাধান) না করা গেলে ‘শিক্ষাই যে জাতির মেরুদণ্ড’ কথাটি শুধু পুস্তুকিই থেকে যাবে। আমরা ফাঁসের স্রোতে  শিক্ষায় অমেরুদণ্ডী দোপেয় প্রাণী ও মেধাহীন হয়ে পড়বো।

লেখক:  শিক্ষা-গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।

কমেন্টস