শীতে ধোয়া উঠা ঐতিহ্যের ভাপাপিঠা; ঝালকাঠিতে ভোজন বিলাসীদের ভিড়

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৪, ২০১৭

খাইরুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ

কুয়াশা মোড়ানো শীতের হিমেল হাওয়ায় ধোয়া উঠা ‘ভাপা’ পিঠার স্বাদ না নিলে যেন বাঙালির অতৃপ্তি কাটেই না। আর শীত এলেই যেন হরেক পদের সুস্বাদু পিঠার বাহারী আয়োজন।

নিজেদের আদি ঐতিহ্য অব্যাহত রাখতে ঝালকাঠি সদর উপজেলাসহ গ্রামের ঘরে ঘরে চলছে পিঠা তৈরী ও খাওয়ার ধুম। এছাড়াও ক্রেতাদের চাহিদার কারণেই বিভিন্ন জনবহুল স্থানে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা ভাপা পিঠার পাশাপাশি চিতই পিঠা, তেল পিঠার দোকান নিয়ে বসেছেন। শীতের সকাল কিংবা সন্ধ্যায় হাওয়ায় ভাসছে এসব পিঠার ঘ্রাণ।

নতুন খেঁজুরের গুড় আর নতুন চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় এসব পিঠা। গরম পানির ভাপে এ পিঠা তৈরি হয় বলে এর নাম হয়েছে ভাপা পিঠা। পিঠাকে মুখরোচক করতে গুড় আর নারিকেলের সাথে সামান্য পরিমাণ লবন মেশানো হয়। এতে স্বাদ বাড়ে বলে জানিয়েছেন দোকানীরা। ভাপা পিঠা তৈরিতে সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করা হয় মাটির হাঁড়ি ও মাঝ বরাবর বড় ছিদ্র করা মাটির ঢাকনা। হাঁড়িতে ছিদ্র করা ঢাকনা লাগিয়ে আটা গুলিয়ে ঢাকনার চারপাশ ভালোভাবে মুড়ে দিতে হয়, যাতে করে হাঁড়ির ভেতরে থাকা গরম পানির ভাপ বের না হতে পারে।

এমন সময় গ্রামের প্রায় বাড়িতে মেয়ে-জামাতা, বিয়াই-বিয়াইনসহ বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন এবং দূর দূরান্তে অবস্থান করা পরিবারের সদস্যদের মাঝে এক অঘোষিত পিঠার নিমন্ত্রণের রব পড়ে যায়।

উপজেলার শ্রীমন্তকাঠী গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ কাজলী বেগম বলেন, শীতের পিঠা খাওয়াতে তিন মেয়ে ও জামাতাদের দাওয়াত করে এনেছি। একমাত্র ছেলে চাকরি সূত্রে সপরিবারে থাকে গাজীপুরে। তাদেরকেও ফোন করে বাড়িতে এনেছি। সবাই মিলে একসাথে পিঠা না খেতে পারলে মনটা আনচান করে।

শহরের বাসস্ট্যান্ডের অস্থায়ী পিঠা বিক্রেতা নুরজাহান বেগম জানান, ছোট গোল বাটির পাত্রে চালের গুঁড়া খানিকটা দিয়ে তারপর খেঁজুর অথবা আখের গুড় দিয়ে আবার কিছু চালের গুঁড়া দিয়ে বাটিটি পাতলা কাপড়ে পেঁচিয়ে ঢাকনার ছিদ্রের মাঝখানে বসিয়ে দেয়া হয়। ২/৩ মিনিট ভাপে রেখে সিদ্ধ হয়ে তৈরি হয় মজাদার ভাপা পিঠা। প্রতিটি ভাপা পিঠা বিক্রি হয় ৫ দলে আবার স্পেশাল ভাবে কেউ কেউ গুড় নারকেল একটু বেশী দিয়ে চায় তাই এটা ১০ টাকায় দরে বিক্রী করি।

অনুরূপভাবে চালের গুড়ার আটা গুলিয়ে তাওয়ায় বসিয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় মজাদার চিতই পিঠা। সরিষা বাটা, ধনে, কাঁচা মরিচ ও গুঁড় দিয়ে দোকানীরা পরিবেশন করেন বলে জানালেন বাসস্ট্যান্ডের অপর পিঠা বিক্রেতারা।শহরের বড় বাজার, কালীবাড়ি রোড, থানার মোড়, বায়তুল মোকাররম চৌমাথা, ফায়ারসার্ভিস মোড়, পূর্ব চাঁদকাঠি চৌমাথা, কলেজ মোড়, ব্র্যাক মোড়, গাবখান ব্রিজের টোলঘরসহ অর্ধশতাধিক এলাকার রাস্তার পাশে বিক্রি হচ্ছে শীতের পিঠা। শীতের বাহারি পিঠাপুলির পসরা সাজিয়ে বসেছেন মৌসুমী অনেক দোকানি। বিকেল ৪টার পর থেকে পিঠা বিক্রি শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে।

আবার স্বাভিকের চেয়ে একটু বড় প্রতিটি পিঠা বিক্রি হয় ৫, ১০ ও ২০ টাকায়। নতুন চালের গুঁড়া পানিতে গুলিয়ে তেলে ভেজে নিয়ে তৈরি করা হয় তেলপিঠা, যা বিক্রি হয় ৫ টাকায়। কম পুঁজিতে যে কোন স্থানে সহজে বাজারজাত করা যায় বলে অনেক ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা এসব পিঠার দোকান করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

এই পিঠা বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতদিন প্রকৃতিতে শীত থাকবে ততদিন দেখা মিলবে ভাপা, চিতই আর তেলপিঠার।

কমেন্টস