ভয়ঙ্কর সেই রিমোট বোমা: বীভৎস দৃশ্য! তাজা রক্তে লাল সবুজ ঘাসের মাঠ

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ৬, ২০১৭

মির্জা মেহেদী তমাল-

খোলা মঞ্চ। বক্তৃৃতা চলছে। লোকে লোকারণ্য পল্টন ময়দান। তিল ধারণের কোনো জায়গা নেই। মাইকের সামনে এলেন নতুন বক্তা। বক্তৃতা শুরু করবেন। ঠিক তখনই বিস্ফোরণ! আগুনের ঝলকা! কুণ্ডলী পাকানো কালো ঘন ধোঁয়া। মূল মঞ্চের সামনে বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা স্থানটিতেই মাটি কামড়ানো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলো বোমা। ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বক্তৃতা বন্ধ। সুনসান নীরবতা।

এর পরই মানুষের আর্তনাদ। মাথায় লালফিতা বাঁধা মানুষেরা বাঁচার জন্য দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছেন। ধোঁয়া কমে আসে। বীভৎস দৃশ্য! তাজা রক্তে লাল সবুজ ঘাসের মাঠ। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষের দেহের অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। রক্তাক্ত মানুষগুলো কাতরাচ্ছেন। হাত নেই। কারও নেই পা। শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। রক্তাক্ত দেহের ওপর পড়ে আছে রক্ত মাখা আরেক দেহ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকা মানুষেরা বিড় বিড় করে কথা বলার চেষ্টা করছেন। তাদের ঘিরে আছে হতবিহ্বল সাধারণ মানুষ। শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। রেশ কাটতে না কাটতেই পল্টন মাঠের বাইরে পর পর আরও দুটি বোমা। ক্ষতবিক্ষত সেখানে আরও মানুষ। অজানা আতঙ্ক তখন চারদিকে। কোথাও যেন নিরাপদ নেই মানুষ। তারা ছুটছিল দিগ্বিদিক।

ষোলো বছর আগে মানুষের রক্তে ভেসেছিল পল্টনের মাঠ। লণ্ডভণ্ড হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশ। জনসভায় যোগ দিতে এসে বোমায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে লাশ হয়েছিল সেদিন সাতটি তাজা প্রাণ।

তদন্তে গোয়েন্দারা জানতে পারে, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি বিকালে পল্টন ময়দানের ভয়াবহ এই বোমা বিস্ফোরণটি ঘটে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে। আর এই বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। রিমোট কন্ট্রোলের বোমা বিস্ফোরণের এই ঘটনাটি ছিল জঙ্গিদের প্রথম। প্রথম হামলাতেই তারা সাতটি মানুষকে লাশে পরিণত করতে সমর্থ হয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশে যতগুলো নৃশংসতম, জঘন্যতম ও বর্বরতম হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। এরপরেও ভয়ঙ্কর এই বোমা হামলার ঘটনাটি তদন্ত করতে যেয়ে নানা নাটকীয় ঘটনার জন্ম দেয়। তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে সাতবার। বারবার চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলাটি ফাইনাল রিপোর্টও দেওয়া হয়েছিল একবার। অবশেষে দীর্ঘ দশ বছর পর তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়। বেরিয়ে আসে সব অজানা তথ্য। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত জঙ্গি নেতাদের নাম বেরিয়ে আসতে থাকে। আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। বিচার কার্য শুরু হয় ঘটনার ১৪ বছর পর। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, যে কোনো ঘটনা যেভাবেই ধামাচাপা দেওয়া হোক না কেন, তা এক সময় বেরিয়ে আসবেই। সিপিবির বোমা হামলার ঘটনাটি সেটাই প্রমাণ করে।

বোমা হামলায় নিহতরা হলেন, খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মণ্ডল, খুলনার রূপসা উপজেলার দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির সিপিবি নেতা আবদুল মজিদ, ঢাকার ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের সিপিবি নেতা আবুল হোসেন হাশেম, খুলনার বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিপ্রদাশ ও মাদারীপুরের মোক্তার হোসেন বাদল। এ ছাড়া ওই দিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউর পশ্চিম পাশের করিডরে হকারদের মালামাল রাখার স্থানে  বোমা বিস্ফোরণে মারা যান হকার মহসিন ও মশিউর রহমান।

এ দুটি ঘটনায় তৎকালীন মতিঝিল থানায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ২০০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিআইডির তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোমিন হোসেন সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা ঘটনায় আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেন। তিনি আদালতকে বলেন, তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্য মামলাটিরও দায়সারা চার্জশিট দেওয়া হয়। ওয়ান-ইলেভেনের পর মামলা দুটি পুনঃতদন্ত শুরু হয়।

রহস্যের জট উন্মোচন : ঘটনার দশ বছর পর বোমা হামলার জট খুলতে শুরু করে। হামলার পরিকল্পনা ও কীভাবে হামলা চালানো হয়েছিল তা বিস্তারিত জানিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি মঈনউদ্দিন খাজা ওরফে আবু জান্দাল। মামলার সপ্তম তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি ইন্সপেক্টর মৃণাল কান্তি সাহার তদন্ত প্রক্রিয়ায় এই রহস্যের জট খুলতে থাকে।

তদন্ত সূত্র জানায়, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি হামলার আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি মাদ্রাসায় এর পরিকল্পনা করা হয়। এ হামলাই ছিল রাজধানীতে জঙ্গিদের টেস্ট কেস। হামলায় ব্যবহূত বোমাগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছিল। হামলার জন্য পাঁচ জঙ্গি (দুই জঙ্গির বাড়ি খুলনায়) বোমা নিয়ে সমাবেশস্থলে ঢোকে। সুযোগমতো তারা দুটি রিমোট কন্ট্রোল বোমা রেখে নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়। এরপরই তারা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমা দুটি বিস্ফোরিত হওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে পল্টন মাঠের বাইরে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর পশ্চিম পাশে আরও একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। ওই বোমাটিও ছিল জঙ্গিদের।

সূত্র জানায়, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান, মাওলানা আবদুস সালামসহ শীর্ষ অনেক জঙ্গি নেতা হামলার বিষয়ে জানতেন। তাদের নির্দেশেই সিপিবির সমাবেশে হামলা করা হয়। হামলায় সশরীরে অংশ নেয় পাঁচ জঙ্গি।

অভিযোগপত্র ও বিচার : ঘটনার ১৩ বছর পর ২০১৩ সালের নভেম্বরে বোমাহামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। এতে বিস্ফোরক ব্যবহার করে হত্যার অভিযোগে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর নেতা (হুজি) মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। মামলার ১৩ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে পাঁচজন কারাগারে রয়েছেন।

এরা হলেন— মাইনুদ্দিন শেখ, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা সাব্বির, শওকত ওসমান ও মসিউর রহমান। মুফতি হান্নানের ইতিমধ্যে অন্য মামলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়। পলাতক আসামিরা হলেন— আবদুল হাই, শফিকুর রহমান, নুর ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, মুহিবুল্লাহ মুত্তাকীন, আনিসুল ইসলাম মোরসালীন, রফিকুল ইসলাম মিরাজ। কারাবন্দী মাইনুদ্দিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ ছাড়া অন্য একটি মামলার আসামি মশিউর রহমানও জবানবন্দি দিয়েছেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বহুল আলোচিত এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সূত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন

কমেন্টস