রাজধানীতে বাসে তরুণীদের জামা কাটার রহস্য ফাঁস! (ভিডিও)

প্রকাশঃ নভেম্বর ৮, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

সোমবার রাতে রাজধানীতে একটি চলতি বাসে তরুণীর জামা কাটার সময় ধরা পড়লেন এক ব্যাক্তি। ঐ ব্যাক্তিকে হাতেনাতে ধরেছেন জামা কাটার শিকার ঐ তরুণী। এরপর লোকটিকে মিরপুর থেকে কলাবাগানে নিয়ে গিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কিছু ছবিসহ একটি পোস্টে বিস্তারিত জানিয়েছেন তরুণী। তিনি লিখেছেন, বাস- বিহঙ্গ গ্রিন। এতদিন দেখছি ফেসবুকে পোস্ট, আজ আমার সাথে ঘটল। কিছুদিন একই সময় (রাত সাড়ে ৮টা) মিরপুর থেকে ধানমণ্ডি আসছিলাম এই লোক আমার পাশে বসে। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম উনি আমার জামার সাইডটা ধরে টানছে। ৩-৪ বার দেখার পর উনাকে বললাম যে আপনি আমার নানার বয়সী।

চিল্লানোর পর উনি বাস থেকে নেমে গিয়েছিল।তিনি আরও লিখেছেন, আজকে যখন বাসে উঠলাম এবং উনাকে দেখেই চিনে ফেললাম। আমি ঠিক তার আগের সিটে বসলাম। গাড়ি ছাড়ল, এরপর মনে হলো কিছু একটা হচ্ছে। পেছন থেকে কে যেন জামা টানতেছে। সব ঠিক করে বসলাম। কিন্তু ঠিক নাই, উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে হাত দিয়ে দেখলাম আমার জামা পুরো কাটা। আমি যেই পেছনে তাকালাম, উনি দৌঁড় দিতে আমি শার্টের কলার ধরে ফেলে চিল্লালাম।

তরুণী হাতেনাতে ধরে ফেলার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, প্রথমে কেউ তাকে ধরে নাই কারণ উনি বৃদ্ধ একটা লোক কিন্তু পরে যখন সবাইকে দেখালাম সব ঘটনা, এরপর অনেকেই এগিয়ে এলো। এরপর তাকে ধরে মিরপুর থেকে কলাবাগান আনলাম।

এর মধ্যে আসাদগেট থেকে আমার স্বামীকে ফোন দেওয়ায় সে বাসে এসে ওঠে। পরে দিয়ে দিলাম পুলিশের কাছে। কিছু বলার নাই ভাষা হারিয়ে ফেলছি আমি। তরুণী ওই ব্যক্তিকে পুলিশে হস্তান্তরের কথা বললেও কলাবাগান থানা ও শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাবনীর এই ঘটনাটি ভাইরাল হয়েছে। রাজধানীতে প্রতিনিয়ত নারীরা এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। হয়রানির ভয়ে কেউ মামলা করছেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ বিষয়টি প্রকাশ করে প্রতিবাদ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণী জানান, একদিন সন্ধ্যায় নিউ মার্কেট থেকে বাসায় ফিরতে ঠিকানা বাসে করে দুই বান্ধবী শনির আখড়ায় নামেন। বাস থেকে নেমে দেখতে পান তার বান্ধবীর জামা সেমিজসহ বক্স করে কাটা। এ সময় তার বান্ধবী ওড়না দিয়ে কাটা অংশ ঢেকে ফেলেন। এরপর যখন তিনি তার বান্ধবীর সামনে দিয়ে হাঁটা শুরু করেন তখন দেখা যায় তার নিজের জামাও একইভাবে কাটা।

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর জামা ও পাজামা দুটোই কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণী লিখেছেন, ভার্সিটি থেকে বাসায় আসার সময় রামপুরা থেকে বাসে উঠি আমি আর আমার বন্ধু। আমার দুই সিটে আমি একা। বাসের সিটটা একটু নড়াচড়া করছিল। ব্রেক করলে সিটটা সামনে চলে যাচ্ছিল। হতেই পারে পাবলিক বাস। পিঠের সিট আর বসার সিটের জয়েন্ট দুইয়ের মাঝে ফাঁক হয়ে যাচ্ছিল বারবার। হঠাৎ মনে হলো ওই ফাঁক দিয়ে পেছনের লোকটা হাত দেয়ার চেষ্টা করছে। বুঝতে পেরে আমি পিছনে লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বয়স ৪৫ এর বেশি হবে। আমার তাকানো দেখে সে কিছুই বুঝলো না ভাব। আমি সরে পাশের সিটে গিয়ে বসলাম। বাস থেকে নামার পর আমার ফ্রেন্ড জানতে চায় আমার জামা ছিঁড়লো কেমনে? তখন দেখি এ অবস্থা! আমি তো থ! তখন বুঝলাম ঘটনাটি ঘটেছে ওই সময়ই তাহলে! ভেবে পাইনা কি পাইলো এটা করে, কেন করলো? তারপর ভাবলাম পায়জামাটা দেখি তো, তখন হাত দিয়ে দেখি পায়জামাও কাটা। এত কিছু কখন কেমনে করলো, আমি কিচ্ছু টের পেলাম না। হাত পা কাঁপা শুরু হয়ে গেছে।

এক নারী সাংবাদিক সামাজিক মাধ্যমে এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, একদিন বসুন্ধরার গেটে বাস থেকে নামলাম, দেখি আমার সামনে এক মেয়ে খুব বিব্রত হয়ে রিকশা খুঁজছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি তার সাদা জামা ব্লেড কিংবা এন্টিকাটার জাতীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে অনেক জায়গায় কেটে দেয়া। সেজন্য মেয়েটি এত বিব্রতবোধ করছে। ঠিক তার পাঁচদিন পরে আমি অফিস থেকে ফিরছি, পরনে ছিল শাড়ি। পেছনের সিট থেকে কেউ আমার কোমরে হালকা স্পর্শ করছিল। আমি কয়েকবার হাত দিয়ে সরিয়ে দিলাম। ভেবেছিলাম পেছনের ভদ্রলোক পা তুলে বসেছে তাই তার পায়ের নখ সিটের ফাঁক দিয়ে আমার কোমরে লাগছে। কিন্তু না, বাসায় ফিরে দেখি আমার শাড়ির ১০ থেকে ১২ জায়গায় ব্লেড দিয়ে কেটে দেয়া।

সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, নারীদের এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে রক্ষা করার জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, গণপরিবহনে মেয়েদের চলাফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে সেখানে একেক সময় একেক কারণ লক্ষ্য করা করা যায়। আমাদের দেশে পাবলিকলি চলাফেরা করার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যে সমঝোতা থাকা দরকার কিংবা একজন আরেকজনকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার যে মানসিকতা সেখানে সামাজিক শিক্ষার যে ঘাটতি রয়েছে তা স্পষ্ট।

প্রযুক্তির অপব্যবহারকে দায়ী করে এই অপরাধবিজ্ঞানী বলেন, যুবক সমাজের মধ্যে বিকৃত যৌন লালসার চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে সমাজজীবনে নারীদের যৌন লালসা মেটানোর মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের কারণে পর্নগ্রাফি ব্যক্তির হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। এগুলো উপভোগ করার কারণে তার মধ্যে বিকৃত যৌন মানসিকতা তৈরি হয়। এগুলো তারই বহিঃপ্রকাশ। আইন করে নারী সমাজকে এই ধরনের ঘটনা থেকে মুক্তি দেয়ার সুযোগ সীমিত বলে মনে করেন এই সমাজবিজ্ঞানী।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট ও ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, এধরনের ঘটনা শুধু শারীরিক হয়রানি না, এটা স্পষ্টভাবে যৌন হয়রানি। এসব ঘটনা বন্ধে বাস মালিকদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ বাসের ড্রাইভার ও হেল্পারদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন, ঘটনাটি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেনেছেন। কিন্তু পুলিশের কাছে এখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ করেননি। লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় রিকশা আরোহী এক তরুণীর জামা কাটার উদ্দেশ্যে তাকে পেছন থেকে ব্লেড দিয়ে আক্রমণ করে দুর্বৃত্তরা। এতে ওই তরুণীর শরীরের একটি বড় অংশ কেটে যায়। তাকে হাসপাতালে গিয়ে সেলাই নিতে হয়। এই ঘটনার দুইদিন পর একই স্থানে অপর এক তরুণী একইভাবে আক্রান্ত হন। তবে সেখানকার পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

ভিডিও-

কমেন্টস