স্কুল ছাত্রী বৈশাখীর কান্না: একজন নুর উদ্দিন মুরাদ ও তৃণমূল সাংবাদিকতা

প্রকাশঃ নভেম্বর ৮, ২০১৭

এ.এস.এম.নাসিম, নোয়াখালী প্রতিনিধি-

‘নারী জাগরণ একটি চেতনার নাম। এর বাহ্যিকরূপ একমাত্রিক নয়। আমরা যদি নারী-পুরুষের বিদ্যমান সম্পর্কের মেরুকরণ উল্টিয়ে একে নারী জাগরণ বলি, সেটা যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয় না’। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিক নুর উদ্দিন মুরাদ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিডিমর্নিংকে এমনটিই জানান তিনি।

নুর উদ্দিন মুরাদ নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সাংবাদিকতায় খুব অল্প বয়সেই সাহসিকতা ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন সবার মাঝে। কোন অসত্যের কাছে যিনি কখনো হার মানতে শিখেননি, শিখেছেন মানুষকে ভালোবাসতে আর তরুণদের দেখিয়েছেন কিভাবে সত্য ও সাহসিকতার মধ্য দিয়ে সমাজের অসংগতি দূর করতে হয়।

৭ নভেম্বর ২০১৭, কোম্পানীগঞ্জের ইতিহাসে দিনটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে হাজারো মানুষের কাছে। স্থানীয় সাংবাদিক নুর উদ্দিন মুরাদের সাহসিকতায় ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কদমতোলা এসসি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী বৈশাখী বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পায়।

৭ম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী বৈশাখী, চরহাজারী ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ডেম্বু রাণী বাড়ীর মৃত লিটন মজুমদারের কন্যা। বৈশাখী নিজ প্রতিবাদেই আজ ৭ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। সহপাঠীরা যেখানে গণিত, ইংরেজি প্রাইভেট পড়ে সেখানে বৈশাখী অর্থাভাব দেখে প্রাইভেট পড়তে পারেনি, নিজেই চেষ্টা করে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। পিতা মারা যাওয়ার পর বৈশাখীর মা বিবাহ সংসার পেতেছেন অন্যত্র, তবুও শত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও বৈশাখী পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে নিজেকে অনড় রাখে।

হঠাৎ করে বৈশাখীর জীবনে আবারো আঁধার নেমে আসে। কয়েকদিন আগে ৭ম শ্রেণির স্কুলছাত্রী বৈশাখীর অভিভাবকরা তার বিয়ে ঠিক করেছে চরহাজারী ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের মতিলাল চকিদার বাড়ীর সিভাষ মজুমদারের সাথে। বিয়ের সময় যত দ্রুত ঘনিয়ে আসছে তত বৈশীখির স্বপ্ন ভঙ্গুরের দিকেই যেন সে চলে যাচ্ছে।

এদিকে কোন উপায় না দেখে বৈশাখী ৭ নভেম্বর, মঙ্গলবার ভোরে স্কুলে ক্লাস না থাকার পরও স্কুলে এসে শিক্ষক-সহপাঠীদের সামনেই হাউমাউ করে কান্না কাটি করে বলতে লাগলো, আমি ভিক্ষা করে হলেও পড়ালেখা করতে চাই। বিয়ে আমি করতে চাই না।

এদিকে বৈশাখীর দাদি-চাচারা বৈশাখীকে স্কুল থেকে জোর নেয়ার জন্য কয়েকবার এসেছে কিন্তু বৈশাখী যায় নাই।তারমতে তাকে তারা অন্যত্র নিয়ে হলেও বিয়ে দিয়ে দেবে জোর করে।

স্কুলের এক শিক্ষকের কাছেই মোবাইলের মাধ্যমে ঘটনাটি জানতে পারেন স্থানীয় সাংবাদিক নুর উদ্দিন মুরাদ। খবরটি পেয়েই তিনি ছুটে যান বৈশাখীর স্কুলে।

কথা বলেন বৈশাখীর সাথে। তৎক্ষণাৎ তিনি চিন্তা করলেন যেকোন মূল্যে বেশাখীকে বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা করতেই হবে। বৈশাখীকে তার লালিত স্বপ্ন পূরণ করার সুয়োগ করে দিতে হবে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে মোবাইলে নুর উদ্দিন মুরাদ বৈশাখীর বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বলেন,অর্থাভাবে যারা পড়ালেখা করতে পারে না সে ধরনের অনেককেই আমি নিজ খরচে পড়ালেখা করাচ্ছি। প্রয়োজনে এখানেও স্বর্বাত্মক সহায়তা থাকবে। আর বৈশাখীর বিয়েটি বন্ধের ক্ষেত্রে আমি দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এদিকে নুর উদ্দিন মুরাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘কোম্পানীগঞ্জে ৭ম শ্রেণির বৈশাখীর জোরপূর্বক বাল্যবিবাহের আয়োজন, স্কুলে এসে বৈশাখীর হাউমাউ কান্না!’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস দিলে মুহূর্তেই তা সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় নারীনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী নাজমা শিপা বিষয়টি নুর উদ্দিন মুরাদের মাধ্যমে জেনে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় ইউএনওকে অবহিত করেন।

চরহাজারী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল হুদা, চরপার্বতী ইউপি মোজাম্মেল হোসেন কামরুলসহ স্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা নুর উদ্দিন মুরাদের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই বিষয়টি অবগত হন এবং বৈশাখীর বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও বৈশাখীকে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন।

খবরটি সবার মাঝে দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ায় বৈশাখীর স্কুলে ছুটে যান স্থানীয় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম সর্দার ও উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের সহায়তায় এ যাত্রায় বাল্যবিয়ে থেকে বেঁচে যায় ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী বৈশাখী। ১৮ বছর পূর্ণ হবার আগে বৈশাখীকে কোন বিয়ে দেওয়া হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান বৈশাখীর অভিভাবকরা। বৈশাখীর শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে যাবতীয় সহায়তার আশ্বাস দেন উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল।

এদিকে তৃণমূল সাংবাদিক নুর উদ্দিন মুরাদের এ সাহসিকতায় বৈশাখী বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা পাওয়ায় কোম্পানীগঞ্জের সর্বত্রই ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন থেকে মোবাইলে নুর উদ্দিন মুরাদকে অভিনন্দন জানিয়েছেন অনেকেই।
একজন তৃণমূল সাংবাদিক হয়েও নুর উদ্দিন মুরাদ মেধা ও সাহসিকতার যে প্রমাণ দেখিয়েছেন তা নতুনদের পথচলার পাথেয় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন নুর উদ্দিন মুরাদের সহকর্মীরা।

কমেন্টস