কিশোরীকে গণধর্ষণের পর ১৫ হাজার টাকা জরিমানা

প্রকাশঃ অক্টোবর ১১, ২০১৭

প্রতীকী

জাকির হোসেন বাদশা, মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি- 

চাঁদপুরের মতলব উত্তরের বদরপুর গ্রামে সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি ও মামলা না করতে ধর্ষক এবং স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ কয়েকজন ধর্ষিতার পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।

ঘটনার ২৪ দিন পর গত রবিবার (৮ অক্টোবর) চাঁদপুর বিজ্ঞ নারী ও শিশু নিযাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(৩)/৩০ ও দন্ড বিধির ৩৮৬ ও ৩৪ ধারায় বদরপুর গ্রামের আবুল বেপারীর ছেলে রিয়াদ (২০), হাপানিয়া গ্রামের চাঁন মিয়ার ছেলে শাকিল (২২) ও আওলা গ্রামের রুবেল (২০), বদরপুরের ডেঙ্গু সিকদারের ছেলে ইউপি সদস্য শিবলু শিকদার ও খোরশেদ আলমের ছেলে নাছিরকে আসামি করে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন কিশোরীর মা নার্গিস বেগম (৪৫)।

মামলার এজাহার ও ধর্ষিতার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ধর্ষকরা বিগত দিন থেকে ছাত্রীকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসতো। তাতে রাজি না হওযায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় ওই কিশোরী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাহিরে গেলে তাকে মুখে চাপা দিয়ে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে খালি জায়গায় নিয়ে তিন বন্ধু মিলে প্রায় এক ঘণ্টা ধর্ষণ করে।

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মোর্শেদা বেগম নামে এক নারীর লাইটের আলো দেখে ধর্ষক শাকিল, রিয়াদ, রুবেল টের পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পালানোর সময় ধর্ষকদের চিনে ফেলেন মোর্শেদা বেগম। এরপর অজ্ঞান অবস্থায় ধর্ষিতাকে উদ্ধার করে বাড়িতে এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঘটনার রাত থেকেই ধর্ষিতার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। এমনকি বিচার শালিশ করে সমাধান করে দিবেন বলে জোড়পূর্বক ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ধর্ষিতার পিতা-মাতার স্বাক্ষর নেন ইউপি সদস্য শিবলু শিকদার ও নাছিরসহ কয়েকজন।

মামলার বাদী নার্গিস বেগম বলেন, ‘আমার মেয়েকে জোর করে তারা ইজ্জত নষ্ট করেছে। মামলা না করতে শিবলু মেম্বার ও নাছিরসহ কয়েকজন বাড়িতে এসে আমাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিয়েছে। ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে এলাকা ছাড়া করে দিবেও বলেছে। এই ভয়ে ঘটনার পর মামলা করতে সাহস পাইনি। শিবলু মেম্বার, নাছির ও কয়েকজন শালিশ বৈঠকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। জরিমানার টাকা ফেরত দেওয়াতে জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়েছে।’

ধর্ষিতার পিতা বদরপুর গ্রামের আলমাছ বেপারী বলেন, ‘আমরা গরীব অসহায় মানুষ। অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করি। এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিবে এ ভয়ে এতোদিন থানায় মামলা করিনি। সবশেষে আমার এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় কোর্টে গিয়ে মামলা করেছি। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই আদালতের কাছে।’

প্রত্যক্ষদর্শী মোর্শেদা বেগম বলেন, ‘আমি লেংটার মাজার থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে লাইট মারি। লাইটের আলো দেখে তারা দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। এগিয়ে গিয়ে দেখি মেয়েটি অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে।’

এ ব্যাপারে কথা বলতে আসামিদের বাড়িতে গিয়ে জানা যায় তারা পলাতক রয়েছেন। ইউপি সদস্য শিবলু শিকদার বলেন, ‘আমরা কাউকে হুমকি-ধামকি দেইনি। ধর্ষণের ঘটনা স্থানীয়ভাবে সমাধান করার চেষ্টা করেছি। তারা (ধর্ষিতার পরিবার) বিচার মানেনি। স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।’

বদরপুর আকবর আলী খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘মেয়েটি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের এ পর্যন্ত অনুপস্থিত রয়েছে। প্রথমে শুনেছিলাম তার বিয়ে হয়ে গেছে। পরে ধর্ষণের ঘটনাটি লোকমুখে শুনেছি। এটি অত্যান্ত দুঃখজনক ঘটনা। তার অভিভাবক আমাদের কাছে আসেনি। তবে আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

এ ব্যাপারে মতলব উত্তর থানার ওসি মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘আমি এ ঘটনা জানি না। তারা আমাদের কাছে কোন অভিযোগ নিয়ে আসেনি।’

Advertisement

কমেন্টস