পদে পদে প্রতারণার শিকার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে থাকা রোহিঙ্গারা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

রাখাইনে গতকাল রাত থেকে এখনও জ্বলছে রোহিঙ্গা নিধনের আগুন। গতকাল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকার গর্জনদিয়া, সারাপাড়া, বড়ডেইল ও খোনকারপাড়া গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। একই সঙ্গে হেলিকপ্টার থেকে দাহ্য পদার্থ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য ওই পারে অঝরধারায় বৃষ্টি নামায় আগুন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মিয়ানমার বাহিনী যখন আগুন দেয় তখন বসতবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে নির্বাকদৃষ্টিতে নিজেদের বাড়িঘর পোড়ার দৃশ্য দেখেন। এ সময় অনেকেরই চোখে পানি আসতে দেখা যায়।

মিয়ানমার থেকে কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে যখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন, তখন এখানেও দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকেই। হুমকি-ধমকি ও পদে পদে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা। নো ম্যানস ল্যান্ড ও মিয়ানমারের ওপার থেকে এখনো প্রায় চার লাখ লোক ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে।

গত ছয় দিন তিনি মিয়ানমারের শেষ প্রান্তের নাইক্যান দ্বীপে আটকে ছিলেন মধ্যবয়সী এক রোহিঙ্গা নারী জোলেখা বেগম। তিনি জানান, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে রাছিদংয়ের রাজার বিল পাড়ি দিয়ে স্বামী আবদুস শুক্কুর পরিবাবের আট সদস্যকে নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে আসেন। প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের ওই দ্বীপে আসতে সক্ষম হন তিনি। তাদের বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বীপে কোনোমতে আসতে পারলেও অনুপ্রবেশ করতে পারছিলেন না বাংলাদেশে। কারণ তার হাতে নগদ কোনো টাকা ছিল না। শেষ পর্যন্ত জোলেখার শেষ সম্বল সোনার কানের দুলের বিনিময়ে গতকাল শাহপরীর দ্বীপে আনতে রাজি হন সালাম মাঝি।

শুধু জোলেখা বেগমই নন, তার মতো হাজার হাজার নারী-পুরুষ অর্থাভাবে নাইক্যান দ্বীপে আটকে রয়েছেন। পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা পারাপার করছেন নাফ নদের মাঝিরা। তাদের হাতে এখন জিম্মি রোহিঙ্গারা। এর বাইরেও রোহিঙ্গাদের ঘাটে ঘাটে প্রতারিত হতে হয়। প্রাণ নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আসা সর্বশেষ সম্বলটুকুও লুট করে নিয়ে যায় দালালরা।

দ্বীপ থেকে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, আরও অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নাইক্যান দ্বীপে খোলা আকাশের নিচে আটকে রয়েছেন বাংলাদেশে প্রবেশের আশায়। সেখানে তারা খুবই দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে তাদের।

এদিকে শাহপরীর দ্বীপের ঠিক উল্টোপাশে গর্জনদিয়া নামের একটি পাড়ার বাসিন্দা সালিমুল ইসলাম গতকাল দেখছিলেন নিজের এবং স্বজনদের বাড়িঘর পোড়ার দৃশ্য। মংডুর গর্জনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা করিমুদ্দিন ও আবদুল খালেকের মধ্যে দেখা হয় শাহপরীর দ্বীপের জেটিতে। নিজের বাড়ি পোড়ানোর দৃশ্য দেখছিলেন তারা।

কান্নাজড়িত কন্ঠে তারা জানান, মুহূর্তেই তাদের সবকিছু শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এখন তারা একেবারেই নিঃস্ব।

জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ থেকে নাইক্যান দ্বীপে রাতে ও দিনে অনেক বাংলাদেশি মাঝি ছোট ছোট ইঞ্জিন নৌকা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের আনার জন্য। কিন্তু আবদুস শুক্কুরদের মতো অনেক রোহিঙ্গা নিঃস্ব হয়ে এপারে আসার অপেক্ষায় থাকলেও আসতে পারছে না কেউই। কারণ প্রতিজন রোহিঙ্গাকে শাহপরীর দ্বীপে নিয়ে আসতে নৌকার মাঝিরা নিয়ে নিচ্ছে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ ধরনের অভিযোগ আসার পর টাকার অঙ্ক কিছুটা কমে গেছে। এমন নির্মম অভিযোগে বেশ কয়েকজন মাঝির নৌকাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। শুধু জোলেখার পরিবার নয়, তাদের মতো মিয়ানমারের নলবনিয়ার নোয়াপাড়ার ৬০ বছরের রমিজা খাতুন, কুইন্যাপাড়ার করিম উল্লাহ (৬৫), মেরুল্যা পুবপাড়ার নূর ছালামসহ (৬০) অসংখ্য অসহায় রোহিঙ্গা এভাবে প্রতারিত হয়েছেন।

শাহপরীর দ্বীপের হারিয়েখালী ঘাটে কথা হয় বৃদ্ধা রমিজা খাতুনের সঙ্গে। তার ডান হাত তখন কাপড়ে মোড়ানো ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বাঁধা। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে কাদামাখা দীর্ঘ পথ ধরে তবু হাঁটতে হচ্ছে তাকে।

হাতে কী হয়েছে—জানতে চাইলে ছলছল চোখে বলেন, ‘সোমবার তাদের বাড়িঘরে মিয়ানমারের মিলিটারিরা আগুন লাগিয়ে দিলে ঘর থেকে পালিয়ে বেরোনোর সময় এক মিলিটারির লাঠির আঘাতে তার ডান হাতের কনুই ভেঙে দেয়। ’

এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে গতকাল এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তার নাম মোস্তাক আহমদ (৩৬)। এ সময় তার স্ত্রী নূর আয়েশাও আহত হন। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জামছড়ি গর্জনতলী এলাকার মোস্তাক আহমদ সীমান্তের ওপারে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে গরু কিনতে গিয়েছিলেন। এর আগে সোমবার উখিয়া উপজেলার চাকবৈঠা এলাকার গুরা মিয়াও (৩৭) মাইন বিস্ফোরণে নিহত হন। নাইক্ষ্যংছড়ি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আনোয়ারুল আজিম ও ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

কমেন্টস