রাখাইনে বর্বরতা: রোহিঙ্গা নারীদের ইচ্ছামতো ধর্ষণ করে স্তন কেটে ছেড়ে দেওয়া হয়

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও তাদের লোকজনের হাতে চরম বর্বরতার শিকার হচ্ছে উঠতি বয়সি মেয়ে ও নারীরা। ধর্ষণের পর নারীদের গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। এমনকি নারীদের স্তন কেটে সবার সামনে ছেড়ে দিয়ে উম্মাদ খেলায় মাতে সেনাবাহিনী ও তাদের লোকজন। এমনটাই অভিযোগ জানাচ্ছিলেন রোহিঙ্গা নারী মদিনা খাতুন।

দুদিন আগে রাখাইন থেকে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আসা মদিনা খাতুন। বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে। মিয়ানমারে মদিনা খাতুনের গ্রামের নাম রাসিদং। ঈদের পরই তার স্বামী হাবিব উল্লাহকে গুলি করে হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনারা। তার পাচ ছেলে ও এক মেয়ে। এর মধ্যে দুই ছেলে নিখোঁজ। আসার সময়ও কোন খোঁজ পাননি তাদের। তাদেরকে ফিরে পাওয়ার আশাও এখন আর মদিনা খাতুনের নেই। দুই ছেলের বউকে নিয়ে এপারে এসেছেন তিনি।

মেয়েদের জন্য ওই এলাকা মোটেও নিরাপদ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, মেয়েদের ছাড়ে না ওরা। উঠতি বয়সের মেয়ে। ঘরের বউ যার আছে, সে শেষ। মেয়েদের তো ধর্ষণ করেই। এর পরেও ক্ষমা নেই। ওখানে মেয়েদের জীবন নেই, বাবা।’

স্বামী কোথায় প্রশ্ন করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘বাবা, ওরা মেরে ফেলেছে ওকে। গুলি করে মেরে ফেলেছে’।

মিয়ানমারের সেনারা কী ধরনের নির্যাতন করে— জানতে চাইলে মদিনা বলেন, ‘মেয়েদের ওপর ওদের চোখ পড়ে বেশি। মেয়েদের ইচ্ছামতো ধর্ষণ করে। বড় বীভৎস সে দৃশ্য। সবার সামনে মেয়েদের ইজ্জত-সম্মান নিয়ে খেলা করে।’

মদিনা বলেন, যেসব ঘরে মেয়ে আছে, সেসব ঘরের মানুষ খুব কমই মেয়ে নিয়ে বাংলাদেশে আসতে পেরেছে। প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ মারা গেছে সেনাদের গুলিতে।

মদিনা জানান, নারীদের ধর্ষণ করার পর গলা কেটে হত্যা করে সেনা ও তাদের লোকজন। শুধু তাই নয়, নারীদের স্তন কেটে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পর দেখে ওই নারী কী করে। তীব্র মৃত্যুযন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ করে এক পর্যায়ে মেরে ফেলে।

মদিনা জানান, তার এক প্রতিবেশী নারী শিশুকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিল। সেনারা ওই নারীর দুই স্তন কেটে দেয়। পরে ওই শিশুকে ঠেলে দেয় নারীর বুকে। এসব বীভৎস দৃশ্য তাদের খুব ভালো লাগে। এমনও দৃশ্য মদিনা দেখেছেন, যেখানে নারীকে ধর্ষণ করে শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেয়। তার পর ওর পুড়ে মারা যাওয়া দেখে।

এদিকে গত কয়েক দশক ধরে ঠান্ডা মাথায় মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার ও সুচি সরকারের সুপরিকল্পিতভাবে নীরব ‘ জেনোসাইডের’ অন্তরালে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত হয়েছে, পালিয়ে বাঁচার সময় সাগরে ডুবে মারা গেছে। সুচি সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের রাষ্ট্রবিহীন জাতিতে পরিণত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা জানান, তাদের স্বজনদের কেউ মিয়ানমারের সেনাদের হাতে,কেউ নৌকা ডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার কেউ কেউ জঙ্গল ও পাহাড়ে হারিয়ে গেছেন। কারও কারও লাশ মিলেছে, কারও মেলেনি।

এদিকে গণতন্ত্রের অবিসংবাদিত নেত্রী সুচির এই গণহত্যায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রমাণ না পেলেও সারাবিশ্বের মুক্তবুদ্ধির মানুষ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো একে গণহত্যা বলেই তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) শুক্রবার সর্বশেষ জানিয়েছে, নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা বেড়ে তিন লাখের উপরে যাবে। অর্থাৎ গত ১১ মাসে সাড়ে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এরই মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। এই সময়ে মিয়ানমারে সহিংসতায় মারা গেছেন প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট ভোররাত থেকে রাখাইনে সীমান্তরক্ষী পুলিশের সঙ্গে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্যদের সংঘাত শুরু হয়। এতে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হন। এর মধ্যে ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বাকিরা আনসার সদস্য ছিল। এ ঘটনার পর মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী বিতাড়ন অভিযান শুরু করে। তারা রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে হানা দিয়ে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করছে এবং ২৬শ বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে।

অভিযানকালে অন্তত ৪০০ রোহিঙ্গা নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই সাধারণ নিরস্ত্র রোহিঙ্গা। এদিকে অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

Advertisement

কমেন্টস