হার না মানা এক রোহিঙ্গা যুবকের গল্প

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২, ২০১৭

তামিরুল ইসলাম মিল্লাত, কক্সবাজার

বুধবার দুপুর, আকাশে তখন আগুন বৃষ্টি ঝরানো সূর্য। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর অত্যাচার এবং গণহত্যার ফলে জীবন ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো একদল গৃহহারা রোহিঙ্গা, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির রেজু আমতলী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ করেই শুরু হল ঝুম বৃষ্টি। যে যার মত করে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে শুরু করলো। পিছনে পড়ে রইলো একজন যুবক। দূর থেকে লক্ষ করা গেল, পিছিয়ে পরা যুবকটি ছুটে চলা অন্যান্য রোহিঙ্গাদের সাথে একত্রে চলতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

শেষমেশ বহু কষ্টে লোকটি যখন সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের ঘুনধুম সীমান্তে এসে পৌঁছল তখন দেখা গেল তিনি আসলে একা নন। পিঠে তার মাকে বহন করে চলছিলেন তিনি। ৯০ বছরের বৃদ্ধ মা ভেজা, দুর্গম পাহাড়ী পথে হাটতে পারছিলেন না। খালি পায়ে, ছিন্ন বস্ত্রে জীবন নিয়ে অচেনা পথে পালিয়ে আসা মা-ছেলের চোখে তখন ভয়। ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীরে ছিল কাদার চিহ্ন।

দুর্গম পথ বেয়ে যেখানে একা ছুটে চলাই দায় সেখানে মাকে পিঠে নিয়ে আর মাথায় গুলি খাওয়ার ভয় নিয়ে ছুটে চলা যুবকই হয়ত পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। কিছু বিস্কুট খেতে দিলে, বয়স্ক মাকে সাবধানে পিঠ থেকে নামিয়ে দিয়ে হাতে বিস্কুট গ্রহণ করলেন। প্রশ্ন করে জানা গেল জীবন সংগ্রামী হতভাগ্য এই যুবকের নাম কাদের হোসেন (৩০)।

বিস্কুট খেতে খেতে কাদের বললেন, ‘সারাদিনে এই প্রথম কিছু খেলাম। রাখাইনে ভয়ংকর অত্যাচার চলার কারণে আমরা এখানে আশ্রয়ের জন্য এসেছি। আমি দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে হাটছিলাম। কারণ আমার মা এতই অসুস্থ যে, তিনি তিনি হাটতে পারছেন না।’

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শুক্রবার রাতে মংডুর ফকিরবাজারে তার গ্রাম লেম্পসিপাড়া আক্রমণ করেছে। সৈন্যরা যাকে পাচ্ছে হত্যা করছে, লাঠিপেটা করছে এবং ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে লোকজনকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করছে জানালেন এই যুবক।

রাত ৯টার দিকে তাঁর মা, স্ত্রী, শিশু, দুই ভাই ও এক বোনসহ তাঁর পরিবারের সব সদস্যই খালি হাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে পাহাড়ের আশেপাশে আশ্রয় নেয়। সেখানে কোনমতে রাত কাটানোর পর আরো প্রায় ১০০০ রোহিঙ্গার সাথে মিলে বাংলাদেশে আসার জন্য যাত্রা শুরু করে তাঁরা।

তাঁরা সহজে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য পাঁচটি ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়েছিল। কিন্তু পথের মধ্যে কাদের হঠাৎ করেই তার মা শাহরা খাতুনকে হারিয়ে ফেলেন। কাদের বলেন, ‘আমি মাকে হারিয়ে ফেলি এবং বর্ডার ক্রস করার পূর্বে মাকে বার বার খুঁজেতে থাকি। সোমবার কেউ একজন আমাকে জানালো সে আসার সময় পিছনের জঙ্গলের মধ্যে একজন বৃদ্ধ মহিলাকে পড়ে থাকতে দেখেছেন। আমি তখন আমার স্ত্রী, সন্তানকে কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেই এবং আমি মাকে খুঁজতে বের হই।’

‘কয়েক ঘণ্টা হাটার পর আমি যখন ওয়ালডের পাহাড়ের পাটহলাছড়ার কাছে মাকে খুঁজে পাই, তখন মায়ের হাটার মত কোন শক্তি ছিল না। আমি তাঁকে পানি খাইয়ে আমার পিঠে নিয়ে বাংলাদেশের দিকে আবার হাটতে শুরু করি। মাকে পিঠে নিয়ে প্রতিকূল পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে আসতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। বহু কষ্টের পরে বাংলাদেশে আসতে পেরে আমি খুশি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতার কাল্পনিক বীরপুরুষ তিনি নন। তিনি যেন সত্যিকারের বীরপুরুষ। যিনি শত বিপদের দিনেও ৯০ বছরের মাকে ফেলে আসেননি। মায়ের জন্য, মানুষের জন্য যাদের এত ভালবাসা মাতৃভূমির জন্যও তাদের হৃদয় কতই না কাঁদে। কিন্তু নিজ ঘর থেকে বিতারিত এ অসহায় মানুষগুলোর জীবন যে লোহার তৈরি একটি বুলেটের মূল্যের চেয়েও কম!

ভাগ্যকে মেনে নিয়ে জীবন সংগ্রামী বীরপুরুষ কাদের স্ত্রী, সন্তান আর পরিবারের খোঁজে আবার মাকে কাধে নিয়ে কুতুপালং ক্যাম্পের উদ্ধেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। আর যাওয়ার পূর্বে তিনি বলে গেলেন, ‘আমাদের জীবন নিয়ে আমরা খুবিই চিন্তিত। আমরা জানি না আমাদের ভাগ্যে কি অবশিষ্ট আছে।’

Advertisement

কমেন্টস