‘বাংলাদেশে যাও, জান্নাতে দেখা হবে’: ২৫ বছর বয়সী গর্ভবতী রোহিঙ্গা নারীকে তার স্বামী

প্রকাশঃ আগস্ট ৩০, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

২৫ বছর বয়সী আয়েশা বেগমকে গর্ভবতী অবস্থায় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। এখানে তার ঠিকানা হয়েছে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে। সন্তান জন্মদানের সময় স্বামী কাছে থাকবে না বলে কোনো দুঃখ নেই তার। কেননা তার স্বামী মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। অত্যাচার-নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পেতে আয়েশার স্বামীর মতো অনেকেই এখন বিদ্রোহে নামছে।

নাফ নদীর এক পাড়ে প্রাণের স্পন্দন থাকলেও অপর পাশে চলছে মানুষ হত্যার মাতম। একদিকে অস্ত্রের ঝলকানী। অন্যদিকে জীবন রক্ষার্থে বেঁচে আসা রোহিঙ্গাদের আর্তনাদে ভারী হচ্ছে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পাড়ি জমাচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদেরই একজন এই আয়েশা বেগম। তিনি জানান, ‘আমার স্বামী আমাদের সীমান্ত পার করিয়ে দিয়েছেন। যাওয়ার সময় বলেছেন, ‘বেঁচে থাকলে শিগগিরই স্বাধীন আরাকানে (রোহিঙ্গা রাজ্য) আর মারা গেলে জান্নাতে আমাদের দেখা হবে।’

রাখাইন সম্প্রদায়ের আরসা নেতা শাহ আলম বলেন, রাখাইনের তিনটি গ্রাম থেকে প্রায় ৩০ জন আরসা গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন। তাদের জীবনের অন্য কোনো চাওয়া নেই। হয় লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, নয়তো মরতে হবে।’

21268312_1573102949439498_837526670_o

এদিকে গত সোমবার সকালের দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাল্যামিয়া নামের এক পিতার মেয়েকে ধরে নিয়ে যায় দেশটির সেনাবাহিনীর একটি দল। এরপর ৩৫ বছর বয়সী ঐ নারীকে পানিতে ডুবিয়ে মারতে চায় সেনাবাহিনীর ঐ দলটি। তখন খবর পেয়ে ঐ নারীকে বাঁচাতে এগিয়ে যায় আরকান সলভেনশন আর্মি ‘আরসা’র (রোহিঙ্গাদের একটি সংঘটন) ১০ জনের একটি দল।

এসময় তারা দা, ছুরিসহ দেশিয় অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর। এসময় সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় ‘আরসা’ (রোহিঙ্গাদের একটি সংঘটন) দলের ২ জন সদস্য। আর হাত হারিয়েছে ২০ বছরের যুবক আব্দুল্লাহ। এদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ ২ জনকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে আব্দুল্লাহ।

21268126_1573094836106976_2076835667_o

‘আরসা’ দলের বাকি আট জন কোথায় আছে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ তাদের সঠিক অবস্থান বলতে পারেননি। তিনি জানান, বাকি আটজন এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছে।

দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ জানান, সুস্থ হয়ে তিনি আবার তার কওম(রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী) ভাই বোনদের বাঁচাতে মিয়ানমার ফিরে যাবেন।

‘আরসা’দের শক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে আসছে বলে জানান হাত হারানো রোহিঙ্গা যুবক আব্দুল্লাহ। তাদের সংঘটনের যুবকরা এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছে বলেও জানান তিনি।

আব্দুল্লাহর মায়ের নাম দিলবাহার ও তার বাবার নাম জাহিদ আলম। বাবা মায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ জানান, তার বাবা মা তাদেরকে কওম(রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী) ভাই বোনদের রক্ষার জন্য প্রাণ দিতে বলেছেন।

21222566_1573100339439759_1111963118_o

এদিকে গত কয়েকদিন ধরে চলা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর তাণ্ডব থামছে না।হেলিকপ্টার থেকে ফেলা হচ্ছে বোমা-মর্টালশেল। প্রতিদিনই নিপীড়ন চলছে একের পর এক গ্রামে। পাখির মতোই গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে সাধারণ রোহিঙ্গাদের। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে ঘর-বাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

আর এ কারণে নিরীহ রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে বংলাদেশের দিকে ছুটছেন। কিন্তু সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় তারা সহজেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছেন না। তারপরও বিভিন্ন কৌশলে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছেন রোহিঙ্গার।

21222771_1573099142773212_1673740465_o

এছাড়া টেকনাফ পৌর এলাকার ট্রানজিট জেটি থেকে রাখাইনের বিভিন্ন গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। এদিকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া ছবি দেখে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে। সংস্থাটি এহেন নির্যাতন বন্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

এছাড়া সীমান্তের একাধিক পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের আকাশে কিছুক্ষণ পরপর একটি হেলিকপ্টার চক্কর দিয়ে পুনরায় মংডু শহরের দিকে চলে যাচ্ছে। রাখাইনে সহিংসতার পর থেকেই এভাবে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখা যায়। মঙ্গলবার দুপুরে একটি হেলিকপ্টার চক্কর দেয়ার পরপরই সীমান্তের কাছাকাছি রাখাইনের বিভিন্ন জায়গায় আগুনের ধোঁয়া দেখা যায়। শোনা যায় বিকট শব্দের গুলি ও মর্টারশেলের আওয়াজ।

এদিকে নিজ দেশে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্টেও নিষ্পেষিত হচ্ছেন। তাদের গরু-ছাগলসহ নগদ টাকা-পয়সা দুর্বৃত্তরা লুট করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

21222771_1573099142773212_1673740465_o

বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার (ভারপ্রাপ্ত) লে. কর্নেল আনোয়ারুল আজিম বলেন, ‘মঙ্গলবার রাখাইনের আকাশে একটি হেলিকপ্টার দেখা গেছে। এটি অবস্থান করে চলে যাওয়ার পর তাণ্ডবের বেশ কিছু আওয়াজ সীমান্তের এপারে এসেছে। এসব কারণে রোহিঙ্গারা সীমান্তের দিকে আসছেনই।’

এদের ৪৬৮ জনকে মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই কড়াকড়ির কারণে সীমান্তের ‘জিরো পয়েন্টে’ রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়ছেই। অনাহারী-অর্ধাহারী ওই মানুষগুলো খোলা আকাশের নিচে এখন মানবেতর জীবন পার করছেন। মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়া ও বান্দরবানের বিভিন্ন জায়গা দিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি জ্বলছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া ছবিতে তার সত্যতা মিলেছে। মঙ্গলবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায় নিউইয়র্কভিত্তিক এ সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউর বিবৃতিতে বলা হয়, স্যাটেলাইটে ধরা পড়া ছবি থেকে রাখাইনের অন্তত ১০টি জায়গায় অগ্নিসংযোগ করার প্রমাণ মিলেছে। যেসব জায়গায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে তা প্রায় ১০০ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত, এটা গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের চেয়েও পাঁচগুণ বড়। ওই সময় স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে দেড় হাজার বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, ২৫ আগস্ট দুপুরে রাতেডং টাউনশিপের জেইডি পিন এবং কোয়ে তান কাউক গ্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর ২৮ আগস্ট সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মংডু শহর এবং মংডু টাউনশিপের আটটি গ্রামে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

রাখাইনের আরও বহু জায়গায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলেও স্যাটেলাইটে তার দৃশ্য ধরা পড়েনি।

page

এ পরিস্থিতিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ এবং মানবাধিকার হরণের অভিযোগ যাচাই করতে অবরুদ্ধ রাখাইনে প্রবেশাধিকার দিতে মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, ‘নতুন স্যাটেলাইট তথ্যের আলোকে দাতা ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর উদ্বিগ্ন হওয়া এবং মিয়ানমার সরকার যেন রাখাইন রাজ্যে চলমান ধ্বংসের মাত্রা প্রকাশ করে তার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’

এদিকে রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে মিয়ানমার সেনা সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করলেও আতঙ্কের মধ্যে আছে সেখানে বসবাসকারী বৌদ্ধরাও।

এবিসি নিউজ জানায়, রাখাইনে উত্তেজনার মধ্যে বৌদ্ধরাও বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। রাখাইনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা থেকে পালিয়ে তারা রাজ্যের রাজধানী সিত্তের দিকে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় আহত জিউ পিয়ো অং নামে একজন বলেন, ‘আমি নিজেকে নিয়ে শঙ্কিত নই। তবে আমি আমার পরিবার নিয়ে বেশ শঙ্কিত।’ ৭০ বছর বয়সী সান খিনে পিউ আরও বলেন, ‘এ সংঘাতে আমার পুলিশ কর্মকর্তা ছেলেকে হারিয়েছি। আমি বৌদ্ধ হওয়ায় এর জন্য কাকে দোষারোপ করব?’

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন থেকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা মুসলমানদের পরিকল্পিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে জাতিগতভাবে নির্মূল করে আসছে যা গণতন্ত্রপন্থী ও শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সাং সুচি অব্যাহত রেখেছেন। এর ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী পুরুষকে হত্যার পর তাদের অনেকে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭ টি দেশে। এদিকে বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে যে ১০ লাখ রোহিঙ্গা আছে তাদের অধিকাংশ ঘর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম রোহিঙ্গা শূণ্য করে তা দখলে নিচ্ছে বৌদ্ধরা। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে চাষাবাস করে জীবন যাপন করে আসছিল।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ভোররাতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি রাখাইনের কয়েকটি পুলিশ চৌকিতে হামলা চালায় এবং ওই হামলায় ১১ পুলিশ সদস্য নিহত হয় বলে দাবি করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এর পরপরই দেশটির সেনাবাহিনী পশ্চিম অঞ্চলের মংডু, বুতিডং এবং রাতেডং জেলাকে ঘিরে ফেলে কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এতে কয়েক হাজার ’ নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে বলে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সংগঠন দাবি করেছে।

কমেন্টস