বন্যা কবলিত খামারীদের আতঙ্কের আরেক কারণ ভারতীয় গরু

প্রকাশঃ আগস্ট ১৮, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

সরকারি হিসেবেই গরু মোটাতাজাকরণের জন্য বিখ্যাত উত্তরাঞ্চলের ২১ জেলা চলমান বন্যায় কবলিত। বন্যায় এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩২ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে চার লাখ ১১ হাজার মানুষকে। ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ২১৭ হেক্টর। এমন ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে সপ্তাহখানেক পরেই শুরু হচ্ছে কোরবানির পশুর হাট। সামান্য লাভের আশায় সারা বছর যারা নিজে না খেয়ে পোষা গরুকে খাইয়েছেন বিক্রির এই একমাত্র মওসুমে উপযুক্ত দাম পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।

বন্যাকবলিত অঞ্চলের একাধিক গরু মোটাতাজাকারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, অন্যান্য বছর কোরবানির ঈদের ২০ থেকে ২৫ দিন আগে থেকেই তারা গরু বিক্রির উদ্যোগ নেন। রাজধানীসহ দেশের বড় বাজারগুলোয় নেয়ার জন্য গরু কিনতে বেপারীরা এ সময় কৃষকের বাড়ি বাড়ি যান। ঈদের ১০ থেকে ১৫ দিন আগে তারা নিজেদের পোষা গরু বিক্রি করে দেন। পরিশোধ করেন ঋণের টাকা ও গরুর খাবারের দোকানের বাকি। উদ্যোগ নেন পরের বছরের জন্য উপযুক্ত বাছুর কেনার। কিন্তু এবার বন্যার কারণে সবকিছু পাল্টে গেছে। বন্যার পানিতে বাড়িঘর ডুবে গেছে। বিক্রি তো দূরের কথা, গরু-বাছুর রাখার জন্য শুকনা জায়গা খুঁজে পাওয়াই দায় হয়ে পড়েছে।

মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার বীণাডিঙ্গি গ্রামের গরুচাষি সুরত খাঁ জানান, কোরবানির সময় বিক্রির জন্য প্রায় এক বছর আগে দু’টি বাছুর কিনেছিলেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে ছয় কেজি করে ভুসি, দুই কেজি করে খৈল এবং অন্যান্য খাবার কিনতে গিয়ে দুই গরুর পেছনে তার খরচ পড়েছে অন্তত এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। নিজে ভ্যান চালিয়ে যে টাকা আয় করেছেন তার অধিকাংশই ব্যয় করেছেন গরুর খাবারের পেছনে। এমন অনেক দিন গেছে, স্ত্রী-সন্তানের জন্য চাল কিনতে পারেননি কিন্তু গরুর জন্য খাবার ঠিকই কিনেছেন। নিজের ঘরে মশারি না থাকলেও গরু দুটিকে তিনি মশারির নিচে রেখেছেন। জ্বর-সর্দি কিংবা সাধারণ রোগে নিজে ওষুধ কিনে খেতে না পারলেও গরুর ওষুধ তিনি ঠিকই কিনেছেন। এমন যত্নে লালন-পালন করা গরুর উপযুক্ত দাম পাওয়া নিয়ে এখন মারাত্মক সংশয়ে রয়েছেন বলে জানান সুরত খাঁ।

কৃষকের এই দুরবস্থার সুযোগ নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে ফড়িয়ারা। নামমাত্র মূল্যে গরু কিনতে মাঠে নেমেছে মধ্যস্বত্বভোগী এ শ্রেণী। কৃষকদের তারা বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে গরু আসায় এ বছর গরুর দাম অত্যন্ত কম হবে। তা ছাড়া বন্যার কারণে অনেক কৃষক নিজের লালন-পালন করা গরু বাজারে তুলতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় কৃষক যদি গরুর উপযুক্ত দাম না পান তবে সামনের দিনগুলোতে গরু মোটাতাজাকরণে তাদের অগ্রহ কমে যাবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘোষিত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গরু পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের তীব্র প্রতিরোধের মধ্যেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বৈধভাবে গরু এসেছে তিন লাখ ৭৪ হাজার ৯৭৫টি। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৭৭ হাজার ৪৪১টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৯ হাজার ২৭৫টি, মার্চ মাসে ৫০ হাজার ৭০০টি, এপ্রিল মাসে ২৯ হাজার ৩৫৬টি, মে মাসে ৫১ হাজার ২২৬টি এবং জুন মাসে ৯৬ হাজার ৯৭৭টি গরু এসেছে। বেসরকারি হিসেবে অবৈধ পথে গরু এসেছে বৈধ পথের অন্তত ১০ গুণ। সূত্র মতে, কেবল জুলাই মাসেই গরু এসেছে বছরের প্রথম ছয় মাসের সমান। আর কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চলতি আগস্ট মাসে আরো বেশি সংখ্যক গরু আসবে বলে অনুমান সংশ্লিষ্টদের। অবশ্য বন্যার কারণে গরু পরিবহন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও সূত্র জানায়।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন কোরবানির ঈদে গরু-ছাগলের দাম কেমন হবে তা নির্ভর করছে ভারত থেকে কী পরিমাণ গরু আসছে তার ওপর। যদিও বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, দেশে যে পরিমাণ গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া রয়েছে তাতে কোরবানির চাহিদা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব। তাই ভারত থেকে চোরাই কিংবা বৈধ পথে গরু আনা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গত ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেস কাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানায় সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৬ সালে পশু কোরবানি হয় এক কোটি চার লাখ দুই হাজার। এর মধ্যে গরু-মহিষ ছিল ৪৮ লাখ ২০ হাজার এবং ছাগল-ভেড়া ছিল ৫৫ লাখ ৮২ হাজার। বর্তমানে চাষিদের কাছে এক কোটি ১৫ লাখ ৫৫ হাজার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে জানিয়ে বলা হয়, এর মধ্যে গরু-মহিষ আছে ৪০ লাখ আর ছাগল-ভেড়া আছে ৭৫ লাখ ৫৫ হাজার, যা দেশের মোট চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ করতে সক্ষম। এ অবস্থায় যদি পশু আমদানি ও চোরাইপথে পশু আসা বন্ধ না করা যায়, তাহলে দেশীয় গরু লালন-পালনকারীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, যা ভবিষ্যতে দেশের গোশত শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে।

কমেন্টস