বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে গ্রেফতার হওয়া সেই ২২জন আজও অবহেলিত!

প্রকাশঃ আগস্ট ১৫, ২০১৭

রাজীবুল হাসান, ভৈরব প্রতিনিধিঃ  

আজ ১৫ আগস্ট। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৪২ তম মৃত্যুবার্ষিকী। জাতি শ্রদ্ধা ভরে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকী পালন করবে। সরকারি দল দেশের সব স্থানেই জাতির জনকের শাহাদাত বার্ষিকী পালনের আয়োজন করেছে। কিন্ত বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে কয়েক বছর সামরিক সরকারের ভয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দসহ দেশের মানুষ শেখ মুজিবের নামটি উচ্চারণ করতে ভয় পেত। স্বাধীনতা বিরোধীরা তখন দেশে উল্লাস করত। 

সেই দুঃসময়ে ভৈরবে কয়েকজন সাহসী সৈনিক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন করে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। সেদিন গ্রেফতারকৃতদেরকে অমানসিক নির্যাতন করে ভৈরব থানা পুলিশ বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠায়। তাদের অপরাধ ছিল বঙ্গবন্ধুর নামে তারা মিলাদ ও কোরআন খতমের আয়োজন করেছে। 

ঘটনার দীর্ঘ ৪১ বছর পার হয়ে গেলেও আজও তাদের কেউ স্মরণ করে না। ভৈরবের আওয়ামী লীগ নেতারাও তাদের কথা ভুলে গেছে। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে এসব কথা বললেন সেদিনের বীর সাহসীরা। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে সেদিনের কথাটি বলতে চান। সাংবাদিকদের কাছে তাদের কয়েকজন এ দাবি জানান। 

ঘটনার বিবরণে তারা জানান, সেদিন ছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৬ সাল। বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিন। দেশে তখন সামরিক শাসন চলছে। তৎকালীন ভৈরব থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আলম আক্কাছ বেশ কয়েকজনকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মার মাগফেরাত কামনা করতে মিলাদ ও কোরআন খতমের আয়োজন করে। এদিন কয়েকজন মৌলভীকেও আনা হয়। স্থান নির্ধারণ করা হয় ভৈরব হাজি আসমত কলেজের নিউ হোস্টেল ( বর্তমান শৈবাল হোটেল, ভৈরব বাজার হুলুদ পট্রি)। কলেজের কয়েকজন ছাত্রসহ স্থানীয় যুবলীগ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে এই আয়োজন করা হয়। আয়োজনটি বড় করার ইচ্ছা থাকলেও সামরিক সরকারের ভয়ে অনেকেই সেদিন মিলাদে অংশগ্রহণ করেনি।  

এদিন বিকাল ৪ টা বাজলে ফখরুল আলম আক্কাছসহ একে একে ২২ জন নেতাকর্মী কলেজ হোস্টেলে উপস্থিত হয়। স্থানীয় মাওলানা ইসরাইল ছুরি ও মোছা হুজুরসহ প্রায় ১০ জন মৌলভী উপস্থিত হয়ে কোরআন খতম করতে থাকে। একটু পরেই মিলাদ ও দোয়া হবে। এরই মধ্য কিছুক্ষণ পর হোস্টেলটির চারিদিক ৩০/৪০ জন পুলিশ ঘেরাও করে ফেলে। ঘেরাওয়ের পর পুলিশ হোস্টেলের দুতলায় উঠে বলতে থাকে কোরআন খতম বন্ধ কর তারা। আরও বলতে থাকে তোরা কিসের, কার জন্য মিলাদের আয়োজন করেছিস। এসময় পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে গালিগালাজ করতে থাকে। শুধু তাই নয় উপস্থিত সবাইকে পেটাতে থাকে পুলিশ। এক পর্যায়ে মিলাদের আয়োজন ব্যর্থ করে দিয়ে আয়োজক ২২ জনকে আটক করে তাদের ভৈরব থানায় নিয়ে যায়। 

আটককৃতরা হল ফখরুল আলম আক্কাছ (বর্তমানে ভৈরব পৌরসভা মেয়র এবং আওয়ামী লীগ নেতা), আসাদুজ্জামান ফারুক (বর্তমানে সাংবাদিক), রুহুল আমীন, মাহাবুর রহমান (বর্তমানে মৃত), মতিউর রহমান, মফিজুর রহমান, মোশারফ হোসেন জজ মিয়া (বর্তমানে মৃত), জিল্লুর রহমান জিল্লু (বর্তমানে মৃত), আসাদ মিয়া (বর্তমানে মৃত), আতাউর রহমান, আসাদুল হক শিশু, দ্বিলীপ চন্দ্র সাহা, দীজেন্দ্র সাহা, ফজলুর রহমান (বর্তমানে মৃত), আবদুল হামিদ, মোঃ ইদ্রিস মিয়া, মোঃ শাহজালাল, ফিরুজ মিয়া, সুবল চন্দ্র কর (বর্তমানে মৃত) আফজাল ভূইয়া, রসরাজ সাহা ও মাহবুব আলম।  

পরে তাদেরকে থানায় নিয়ে পুলিশ অমানসিকভাবে নির্যাতন করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দেয়া হয় এদের বিরুদ্ধে। এদিন মিলাদে অংশগ্রহণকারী মৌলভীদেরকে পুলিশ মুচলেকা রেখে ছেড়ে দেয়। ঘটনার দিন সারারাত ভৈরব হাজতে তাদের আটক রেখে পরদিন সবাইকে কিশোরগঞ্জ তৎকালীন মহকুমা আদালতে চালান করে। আদালত তাদেরকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। পরে তারা দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জেল থেকে ছাড়া পায়। এই ঘটনার ৪১ বছর পার হলো। কিন্ত সেই ২২ মুজিব ভক্তের কথা আজও কেউ স্মরণ করে না। গ্রেফতারকৃতদের দাবি সেদিন দেশে কোথাও বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার সাহস করেনি। 

সেদিনের অনুষ্ঠানের নেতৃত্বকারী যুবলীগ নেতা ও বর্তমান ভৈরব পৌরসভার মেয়র এড,ফখরুল আলম আক্কাছ বলেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুই যেখানে তুচ্ছ ছিল আমাদের কারাবরণ তো অতি স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। আমার দুঃখ একটাই যারা বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে চুপ করে ঘরে বসেছিল না সাহসী সন্তানরা। 

সেদিনে গ্রেফতারকৃত সর্ব কনিষ্ঠ ছাত্রলীগকর্মী এবং বর্তমানে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘আমি তখন কলেজে পড়তাম। বাবা আঃ খালেক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীনের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করলে আমার কিশোর মনে দারুণ ভাবে আঘাত লাগল। তাই প্রতিবাদী হয়ে তার মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজনসহ মিলাদে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্ত নিষ্ঠুর পুলিশ সেদিন মিলাদ পড়াতে দেয়নি। পুলিশের দৃষ্টিতে সেদিন বড় অপরাধ করেছিলাম। তাই ৬ মাস কারাগারে ছিলাম।’  

এক প্রশ্নের জবাবে হেসে বলেন, ‘বর্তমানে স্বাধীনতার নেতৃত্বকারী আওয়ামী লীগ দল ক্ষমতায় আছে। এখন অনেক সুবিধাবাদীরা নানাভাবে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিতসহ অনেক সুবিধাই ভোগ করছে। কিন্ত আমরা আজও অবহেলিত হয়ে আছি।’

আরেক গ্রেফতারকৃত রসরাজ সাহা বলেন, ‘অনেক দুঃখ কষ্টে জীবন – যাপন করছি কিন্ত কেউ আমাদেরকে দেখার নেই। সেদিনের গ্রেফতারকৃত কয়েকজন অর্থনৈতিক অভাব ও চিকিৎসা করতে না পেরে মারা গেছে।’ 

তাদের মধ্য মরহুম সুবল চন্দ্র কর, মরহুম জজ মিয়া ও ফিরোজ মিয়ার পরিবারের সদস্যরা অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে বলে তিনি জানান।

কমেন্টস