চাকরি হারাচ্ছে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তরা

প্রকাশঃ জুলাই ১৭, ২০১৭

সংগৃহীত

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

নানান শ্রেণি-পেশার কোটি কোটি মানুষের নগরী রাজধানী ঢাকা। এখানে চিকুনগুনিয়া নামক ভয়াবহ বিপর্যয়ে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন বস্তিবাসীরা। রাজধানীর এমন কোনো পরিবার নেই, যেখানে মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত অন্তত একজনের সন্ধান পাওয়া যাবে না। প্রত্যেক দিনই ভয়াবহ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়ছে।

রাজধানীর গুলশান-বনানীর গা-ঘেঁষে প্রায় ১৭০ একর এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে কড়াইল বস্তি। এই বস্তিতে অন্তত সাড়ে ৭ লাখ মানুষ বাস করে।

 বস্তির প্রায় প্রতিটি ঘরের বাসিন্দারা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। শয্যাশায়ী ও চলাফেরায় সমস্যার কারণে কেউ কেউ কাজেও যেতে পারছেন না। রোগা শরীরের ওপর কর্ম হারিয়ে আরেক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কড়াইল বস্তির নিম্নআয়ের অনেক মানুষ। বাসাবাড়িতে কাজ করা অনেকেই দীর্ঘদিন যেতে না পেরে হারাচ্ছেন কাজ।

মা নূর নাহারের সঙ্গে কড়াইল বস্তিতে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন নুরুল আমিন (২৮)। বস্তিতেই কেটেছে তার শৈশবের সুন্দর দিনগুলো। বস্তিতেই স্ত্রী তানিয়ার সঙ্গে পেতেছেন সংসার। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক। বৃদ্ধ মা এখনো মানুষের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন।

নুরুল আমিন জানান, এক মাস আগে হঠাৎ করেই জ্বর আসে তার মা নূর নাহারের। একদিন দু’দিন পার হলে জ্বর না থামায় বস্তির সাধারণ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তারা। তিনি প্যারাসিটামল দিয়ে পাঠিয়ে দেন।

তিনি জানান, ঈদের আগে হঠাৎ করেই তার মা নূর নাহারের খুব জ্বর আসে। রাত ৯টায় মহাখালীর একটি হাসপাতালে নেন তারা। সেখানে চিকিৎসক দেখানোর পর জানতে পারেন তার মায়ের চিকুনগুনিয়া রোগ। দু’তিনদিন পর জ্বর কমলেও এক মাস বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না তিনি। এরই মধ্যে একই রোগে আক্রান্ত হন নুরুল আমিন নিজে এবং তার স্ত্রী।

কাজ হারালেন বৃদ্ধা- নুরুল আমিনের মা অসুস্থতার কারণে আগে যে বাড়িতে কাজ করতেন, সেখানে গিয়ে দেখলেন অন্য একজন কাজ শুরু করেছেন। বাড়ির মালিক তার অনুপস্থিতিতে আরেকজনকে নিয়েছেন। তিনি কর্মহীন হয়ে পড়লেন। এখন তার ছেলে ও বউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে তারাও কারখানায় কাজে যেতে পারছেন না। ছেলে সুস্থ হলেও শরীরে ব্যথা থাকার কারণে হাঁটা-চলা করতে পারেন না। একটু হাঁটলেই হাঁপাতে থাকেন। ছেলে নুরুল আমিন ও বউ তানিয়ার এই অবস্থায় কারখানায় গিয়ে কাজ করাটাও সম্ভব নয়। তারপরও নুরুল আমিন অফিসে গিয়েছিলেন কাজ করার জন্য। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ।

নুরুল আমিন জানান, এক সপ্তাহ আগ থেকেই চিকুনগুনিয়া জ্বরে ভুগছেন। জ্বর সেরে গেলেও শরীরের অন্যান্য উপশমগুলো ভাল হচ্ছে না। যেমন শরীর ব্যথা, হাঁটা-চলা করতে না পারা, মাথা ঘুরানো, শরীর ঝিমঝিম করা এগুলো ছাড়ছেই না। তারা সুস্থ হলেও দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে ওই কারখানায় নতুন লোক নেওয়া হবে বলে তারা আভাস পেয়েছেন। চিকুনগুনিয়ার পর এখন তারা চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছেন।

এদিকে অসুস্থতার কারণে শ্রমজীবিদের অনেকেই চাকরি হারিয়ে বেকার দিন যাপন করছেন। আর যারা দিনমজুর, তারা জ্বর সেরে সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসলেও শরীরের নানান অংশে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছেন না। কারো কারো শরীরে চুলকানি, পেট ব্যথা, ফুলে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। তবে শরীরের গিরায় গিরায় অসহ্য ব্যথা থাকার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই স্থানীয় ফার্মেসি থেকে এন্টিবায়োটিকের মতো ঔষধ সেবন করে যাচ্ছেন নিয়মিত। এ রকম কয়েকজন জানান, ভাল না হলে কাজে যাব কিভাবে? দ্রুত সুস্থ হতে পারলে চাকরিটা অন্তত বাঁচবে। তাই তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই হাই-এন্টিবায়োটিক সেবন করে যাচ্ছেন।

কড়াই বস্তি ঘুরে দেখা যায়, একই পরিবারের অনেকেই চিকুনগুনিয়ায় ভুগছেন। ৩ থেকে ৭ দিন জ্বর থেকে সেরে উঠেও শারীরিক প্রচণ্ড ব্যথার যন্ত্রণায় ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না। আবার অনেকেই অসুস্থ শরীর নিয়েই চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য যাচ্ছেন অফিসে। এতো কষ্টের মাঝেও পরিবারের কাজ সামলাচ্ছেন তারা।

কমেন্টস