৭০ জন বাবার মুখে হাসি ফুটাল সমাজ

প্রকাশঃ জুন ১৯, ২০১৭

রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি-

চট্টগ্রামে অবহেলিত অনাথ বৃদ্ধ বাবাদের নিয়ে প্রথম বারের মতো “বাবা উৎসব’ ১৭ ” উদযাপন করল সম্মিলিত মানবিক জাগরণ (সমাজ) নামের একটি সংগঠন। বাবা দিবসে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে সংগঠনটি।

রবিবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নগরীর প্রাকৃতিক স্বর্গখ্যাত সিআরবি এলাকার তাসফিয়া গার্ডেন রেস্টুরেন্টে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের মুখে সত্যিই হাসি ফোটাতে সক্ষম হয়েছে সংগঠনটি।

বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই একটি সুন্দর তোরণ সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় নানা রং এর ফুল এবং শৈল্পিক কারুকার্য দিয়ে সেজে আছে পুরো অনুষ্ঠানস্থল। বিভিন্ন জায়গায় “বাবা” লেখা শব্দটি ঝুলছে। এরই মধ্যে একটি মিনি বাস এসে রেস্টুরেন্টের সামনে এসে হাজির। দরজা খুলতেই একে একে নেমে আসে বয়স্ক বাবারা। স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের বাত ধরে নেমে রেস্টুরেন্টের ভিতরে নিয়ে যাচ্ছেন। ভিতরে মিলনায়তনে রজনীগন্ধ্যা ও গোলাপ ফুলের স্টিকে বাবাদের সংবর্ধনা করছেন। একে একে দেওয়া হয় ফ্রি চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ। সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়ানো হয়েছে ইফতার। তারপর সবার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ঈদের নতুন কাপড় আর আর্থিক সহায়তা। এরপর প্যাকেট করে দেওয়া হয় রাতের খাবার।

চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন জায়গা হতে বাবা উৎসবে আসা অংশগ্রহণকারীদের কারও সন্তান থাকলেও যেন নেই, কেউ বা আবার এই বয়সেও মাঠে নেমেছেন কাঠফাটা রোদ কিংবা ঝুম বৃষ্টিতে। তাদের নেই কোনো অবসর। জীবন জীবিকার তাগিদে কেউ ভিক্ষা করেন, কেউ রিক্সা চালান, কেউ দিন মজুরি করেল, আবার কারও দিন যায় ইট ভেঙে কিংবা বনাজী ওষুধ ফেরি করে। অনেকের দিন শেষে মাথা গোজার ঠাই নেই। দিন শেষে কারও কারও ঠিকানা আবার ফুটপাতেই।

দীর্ঘ দু’মাস ধরে নগরীর অলি-গলিতে ঘুরে এসব বয়োজ্যেষ্ঠ অসহায় বাবাদের তালিকা করেছেন সম্মিলিত মানবিক জাগরণের (সমাজ)।

সংগঠনটির উদ্যোক্তার নাম অনুপম দেবনাথ পাভেল। মূলত উদ্যোমী এই তরুণ্যের ঐকন্তিক প্রচেষ্টায় প্রবীণ এই বাবাদের জন্য ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রাম জজ আদালতের তরুণ দুই উদীয়মান আইনজীবী অ্যাডভোকেট শূভাষীশ শর্মা, অ্যাডভোকেট রুবেল দেব অপু এবং রাজীবসহ আরও বেশ কয়েকজন তরুণ।

অনুপম দেবনাথ পাভেল বলেন, ‘সমগ্র বিশ্বে আজ অস্থির পরিস্থিতি। মানুষের অন্তরে প্রেম, আনন্দ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহানুভূতি, আন্তরিকতা নেই বললেই চলে। মানবীয় মূল্যবোধ আজ হুমকির মুখে। সেই হারিয়ে যাওয়া মানবীয় গুণাবলীর পূনরুজ্জাগরণের লক্ষে এবং দ্বীন দরিদ্র অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার প্রত্যয় নিয়ে, ‘বিপন্ন মানবতার সেবাই আমাদের ব্রত’ এই স্লোগানকে সামনে নিয়ে আমরা বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছি। কিছুদিন আগে ঠিক একই রকমভাবে অবহেলিত মা দের নিয়ে মা উৎসব উদযাপন করেছি এইখানে।”

অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা অ্যাড. কুবেল কুমার দেব অপু বলেন, দীর্ঘ দুই মাস ধরে চট্টগ্রাম শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে বয়োজ্যেষ্ঠ এসব অবহেলিত বাবাদের খুজেছি। চেষ্টা করেছি অন্তত একটা দিন হলেও তাদের মুখে হাসি ফোটাতে। সন্তান হিসেবে পাশে থাকতে।”

আরেক উদ্যোক্তা আ্যড শুভাশীষ শর্মা বলেন, বাবা, যাদের এই বয়সে বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সেবা পাওয়ার কথা, পরিবার পরিজনদের ভালবাসায় সিক্ত হওয়ার কথা কিন্তু তারা আজ রাস্তায় পেটের দায়ে বিভিন্নভাবে শ্রম দিচ্ছেন, খোলা আকাশের নীচে বাস করছেন, জরাজীর্ণ কুড়ে ঘরে দিনাতিপাত করছেন সেরকম ৭০ জন তালিকাভুক্ত বাবার মুখে হাসি ফোটাতে পেরে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি আরও ভাল কিছু করার। মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করার। অসহায় বাবাদের জন্য আজ ফ্রি চিকিৎসা সেবা, মেডিসিন, ইফতার, রাতের খাবার, নতুন কাপড় এসব আয়োজনে হয়তো দু:খ কিছুটা কমবে। এইভাবে হাসি ফোটানের মাধ্যমে আমাদের চারপাশে মানবিক জাগরণ সৃষ্টি করাই হচ্ছে আমাদের সংগঠনের প্রচেষ্টা।

Advertisement

কমেন্টস