বান্দরবানে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাস অর্ধলক্ষাধিক মানুষের

প্রকাশঃ জুন ১৯, ২০১৭

সোহেল কান্তি নাথ, বান্দরবান প্রতিনিধি-

পাহাড় ধসে বান্দরবানে প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। তার পরেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বাস করছেন প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।

জেলার সদর, লামা, রোয়াংছড়ি, থানছি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং রুমা উপজেলায় দুর্গম অঞ্চলগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ঢালুতে এসব মানুষ দির্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে। মাথাগোঁজার ঠাই হিসেবে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছে এসব হাজার হাজার পরিবার। বসবাসের প্রয়োজনে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা এবং বৃক্ষনিধনের কারণে ঘটছে একের পর এক পাহাড় ধ্বসের ঘটনা। এসব মানুষের প্রাণহানি ও বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও বান্দরবানে বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় কাটা।

ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের মতে, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীরা প্রায় শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ এবং যারা ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে তাদের মধ্যে হতদরিদ্র পরিবারের সংখ্যাই বেশি। জীবিকার তাগিদে পাহাড়ের ঢালুতে পাহাড় কেটে তৈরি করা আবাসস্থলগুলোতে কম ভাড়ায় বসবাস করা যায়। কিন্তু বৃষ্টি শুরু হলেই মাইকিং করে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া এবং কাগজে কলমে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে কিছুই নেই। যার কারণে প্রতি বছর প্রাণহানির ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে, সরকারি সূত্রমতে, পাহাড় ধসে ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী নারী-শিশুসহ ৬৮ জন গ্রামবাসী নিহত হয়। ২০০৬ সালে জেলা সদরের মারা গেছেন ৩ জন, ২০০৯ সালে লামা উপজেলায় শিশুসহ ১০ জন, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ৫ জন, ২০১১ সালে রোয়াংছড়ি উপজেলায় ২ জন এবং ২০১২ সালের ২৬ ও ২৭ জুন লামা উপজেলায় ২৯ জন এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ১০ জন এবং ২০১৫ সালে ২৬ জুন জেলা শহরের বনরুপা পাড়া ২ জন, ১ আগষ্ট লামায় হাসপাতাল পাড়ায় ৬ জন এবং ২০১৭ সালে ১৩ জুন জেলা শহরের লেমু ঝিরি ও কালাঘাটা এলাকায় ৬জন নিহত হয়েছে। সরকারি সূত্র জানান, ১৩ ও ১৪ সালে জেলার কোথাও পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

বান্দরবান মৃত্তিকা গবেষনা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবুল ইসলাম এর মতে, পাহাড় ধস তাৎক্ষণিক ঘটনা মনে হলেও এটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়ার ফসল। ভূমিক্ষয়ের মাধ্যমে পাহাড়ে ফাটল তৈরি হয় এবং ধস নামে। পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ হচ্ছে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা এবং উপর্যুক্ত পদ্ধতি অবলম্বন না করে পাহাড়ে চাষাবাদ করায়। তবে পাহাড় ধস বন্ধে বৃক্ষ নিধণ এবং পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। তা না হলে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঘটনা আরোও বাড়বে।

জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, অতিঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে লোকজনকে প্রাথমিকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ৭টি উপজেলার ইউএনও ও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিঝুঁকিপুর্ণ স্থানগুলো থেকে লোকজনকে প্রাথমিকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার জন্য। এছাড়াও পৌরসভা এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যারা রয়েছে তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে রাখার জন্য আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তত রাখা হয়েছে এবং তাদেরকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য পৌর কাউন্সিলারদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর বীর বাহাদুর এমপি বলেন, পার্বত্য এলাকায় যোগাযোগ ক্ষেত্রে রাস্তাঘাট করতে গেলে পাহাড়ের গায়ে হাতদিলে কি ভাবে তার প্রক্টেশন দেয়া যায় সেই লক্ষ নিয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়াও পাহাড় নিয়ে যারা গবেষণা করে তাদের মতামত নিয়ে সামনের দিনগুলোতে যেন এই দুর্ঘটনা না ঘটে সেভাবে কাজ করা হবে। তবে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে যারা বসবাস করছে তাদের তালিকা করা হচ্ছে এবং তাদেরকে পুর্ণবাসনের সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।

কমেন্টস