ফরিদপুর পৌরসভার পয়: ও সুয়ারেজ বর্জে ভয়ংকরভাবে দূষিত হচ্ছে কুমার নদ

প্রকাশঃ এপ্রিল ২০, ২০১৭

হারুন-অর-রশীদ,ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ

ফরিদপুর পৌরসভার উদ্যোগে পয়: ও সুয়ারেজ বর্জ নিষ্কাশন এবং নিত্যদিনের ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে মারাত্মক দুষিত হচ্ছে কুমার নদ। শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একমাত্র এই নদটি দিন দিন ভয়ংকরভাবে দূষিত হয়ে পড়ায় জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জীবাণু ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে।

প্রায় ৭৩ কিলোমিটার বিস্তৃত কুমার নদ ফরিদপুরে এসে অম্বিকাপুর হতে বাখুন্ডা পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে শহরের মধ্য দিয়ে। ফরিদপুর শহরের পানির সবচেয়ে বড় উৎস এই নদ। এটি ফরিদপুর শহরবাসীর কাছে অক্সিজেন ভান্ডার হিসেবেও সমাদৃত। নিত্যদিনের গোসল, রান্নাবান্না, কাপড় চোপড় ধোঁয়া বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কুমার নদের পানি। মাছ চাষ এবং কৃষি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্যও এ নদের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ এ কুমার নদ দুষণে কর্তৃপক্ষের তরফ হতেই চলছে নানা আয়োজন। কুমার নদের দুই পাশে অবস্থিত তিতুমীর বাজার ও হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার এলাকার আশেপাঁশে এ নদীর দুষণ চরম আকার ধারণ করেছে।

তিতুমীর বাজার সংলগ্ন শিব মন্দির এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাজারের সব ময়লা কুমার নদ ও নদ সংলগ্ন পাড়ে ফেলা হচ্ছে। শিব মন্দিরের উত্তর পাশে পৌরসভার ড্রেন দিয়ে পয়: বর্জ এসে পড়ছে নদে। শিব মন্দিরের দক্ষিণ পাশে বাঁধানো ঘাটের পাশে বাজারের যাবতীয় বর্জ ফেলা হচ্ছে। শরিয়তুল্লাহ বাজারের মাছ বাজার, মুরগি বাজার ও কসাই পট্টির যাবতীয় পয়:বর্জ ও আবর্জনা প্রতিদিন অবাধে ফেলা হচ্ছে নদে। আলিমুজ্জামান বেইলী ব্রিজের নিচে গড়ে উঠেছে ময়লার ভাগাঢ়। দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়া কষ্টসাধ্য। কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থাকাও দুষ্কর। এর মধ্যেই মানুষ গোছল করছে।

প্রতিদিন শহরের অসংখ্য মানুষ এ নদে গোসল করে। দুষিত পানিতে গোসল করে গায়ে চুলকানি হয়েছে অনেকের। মাঝে মাধ্যে নদীতে মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। নদী এবং নদীর পাড়ে ময়লা আবর্জনা পয়:বর্জ ফেলায় শহরবাসী সমস্যায় পড়ছে। এ ব্যাপারে পৌরসভা ও ব্যবসায়ীদের সাথে দেন আলোচনা করেও কোন ফল হয়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তিতুমীর বাজার, লালন বস্তি, রথখোলা, পূর্ব খাবাসপুর শেষ মাথা ও চর কমলাপুর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পৌরসভা নির্মিত বড় আকারের ড্রেন দিয়ে শহরের যাবতীয় নোংরা ও আবর্জনাযুক্ত বর্জ পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে। পৌরসভার অনেক অধিবাসীদের সুয়ারেজ লাইনের সংযোগ সরাসরি পৌরসভার ড্রেনের সাথে যুক্ত থাকায় প্রতিনিয়ত ময়লা আবর্জনার সাথে সাথে পয় বর্জ এসে মিশছে নদে।

২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে ফরিদপুর পৌরসভা ও একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে ২৫ হাজার হাউস হোল্ডারের মধ্যে থেকে ৮০০ হাউস হোল্ডারের সেফটিক ট্যাংকের উপর জরিপ করে। ওই জরিপ থেকে দেখা যায় বাসাবাড়ির ৪৫ ভাগ পরিবার কখনই সেফটিক ট্যাংক পরিস্কার করেনি। এর মধ্যে ৫৬ ভাগ পরিবারের সুয়ারেজ লাইন সরাসরি পৌরসভার নর্দমার সাথে যুক্ত করে দেওয়া রয়েছে। ওই সময় অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জরিপ করে দেখা গেছে ১৯ ভাগ প্রতিষ্ঠান কখনই সেফটি ট্যাংক পরিস্কার করেনি। এই ১৯ ভাগ প্রতিষ্ঠানের সেফটি ট্যাংকের সংযোগ সরাসরি পৌরসভার নর্দমার সাথে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন বাসাবাড়ির সেফটি ট্যাংকির সাথে পৌরসভার পানি নিস্কাশনের ড্রেনের অবৈধ সংযোগ রয়েছে। ডিজাইন মানদন্ড হিসেবে যে কোন সেফটিক ট্যাংক ও পিটের (রিং দিয়ে কুয়ার মত বানানো) পানি কখনও ভু উপরিতলের পানির সাথে মিশতে পারবে না বলে বিধান রয়েছে। ওই পানি শুধুমাত্র ফিলটারেশন হওয়ার পর মিশতে পারে । কিন্তু ফরিদপুর পৌরসভার নর্দমা দিয়ে সেফটি ট্যাংকের পানি সরাসরি ফেলা হচ্ছে কুমার নদে।

১৯৯৭ সালের ইনভায়েরনমেন্ট কনজারভেশন রুল অনুযায়ী সুয়োজেরের পানির কোয়ালিটি নির্ধারণ করা হয় বিওডি (বযোলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, জৈবিক অক্সিজেনের চাহিদা) ও ফোকাল পলিফর্র্ম (পয়বর্জ থেকে যে জীবানু উৎপন্ন হয়) মাত্রার ভিত্তিতে।

ফরিদপুর পৌরসভার বড় তিনটি নর্দমার মুখ থেকে পানি সংগ্রহ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর কৌশল বিভাগে পরীক্ষা করে দেখা গছে ওই পানিতে অস্বাভাবিক মাত্রায় বিওডি ( জৈব দুষণ) ও ফোকাল পলিফর্র্ম (অজৈব দুষণ) রয়েছে। পানিতে বিওডি বা জৈব দুষণ বেশী থাকার অর্থ হলো অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া। এর ফলে এই পানিতে মাছ ও শৈবাল জাতীয় জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ হ্রাস পায় এবং পানি শুদ্ধকরণের জন্য ভাল ব্যকটেরিয়া জন্মাতে পারে না। ফলে পানির স্বাভাবিক বিশুদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পানির জীব বৈচিত্র ধ্বংস হয়ে যাতে পারে। বিওডি প্রতি লিটার পানিতে ৪০ মি.গ্রাম থাকলে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। সেখানে ওই পানিতে রয়েছে ৩৮০ মি.গ্রাম যা স্বাভাবিকের চাইতে সাড়ে নয়গুণ বেশি।

অপর দিকে ফোকাল পলিফর্র্ম বা অজৈব দুষণ ১০০মিলি লিটার পানিতে ১০০০ মাত্রাকে সহনশীল ধরা হয়। সেখানে ওই পানিতে রয়েছে ২৫৪০ অর্থাৎ আড়াই গুণেরও বেশি। অপরদিকে ফোকাল পলিফর্র্ম মূলত মলবাহী জীবানুর জন্ম দেয়। এর ফলে পানি ব্যবহারের উপযোগী তো থাকরেই না উপরন্তু ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানাবিধ জটিল রোগের সুষ্টি করে।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. অরুণ কান্তি বিশ্বাস বলেন, নদীর পানিতে বিওডি, ফোকাল পলিফর্র্ম মাত্রা বেশি হওয়ায় কুমার নদের পানি দূষিত হয়ে গেছে। নদর্মার পানি সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এটি কঠোর ভাবে বন্ধ করতে হবে। পাঁশাপাশি নদীতে বাধ দিয়ে মাছ শিকারকর বন্ধ করাসহ নদীর স্বাভাবিক চলাচল অব্যাহত রাখতে হবে।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ, পৌরসভার নর্দমা সংযোগ সরাসরি নদীর সাথে হতে পারে না। নর্দমার পানি শোধন করে ফেলা যেতে পারে। কিন্তু তা না করে পৌরসভা সরাসরি নর্দমার পানি নদীতে ফেলছে।

ফরিদপুর পৌরসভার মেয়র শেখ মাহাতাব আলী বলেন, আমরা উপায়হীন হয়ে নর্দমার পানি নদীতে ফেলতে বাধ্য হচ্ছি। তবে আমাদের পরিকল্পনা আছে নর্দমার মুখে আলাদা রিজারভার নির্মাণ করে পানি রিফাইন করার । তিনি বলেন, পয়:বর্জের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ফরিদপুর পৌরসভা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রাকটিক্যাল একশনের যৌথ উদ্যোগে বিল এন্ড মেরিন্ডা গেট ফাউন্ডেশন ও ইউকে এইড এর অর্থিক সহায়তায় ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ ফর সানট্রেবল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস ইন ফরিদপুর, বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় বৈজ্ঞানিক ভাবে পয়বর্জ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, যে সব গ্রাহক সুয়েরেজের সংযোগ সরাসরি পৌরসভার নর্দমার সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর আহমেদ বলেন, নাগরিক বা পৌরসভার কোন সুয়েরেজ বা নর্দমার সংযোগ সরাসরি কোন নদী, বা খাল বা উন্মুক্ত জলাশয়ে যুক্ত করার নিয়ম নেই। যতদ্রুত সম্ভব পৌরসভা ও পৌরবাসীকে এ সংযোগগুলি অপসারণ করে নিতে হবে। পরিবেশ দুষণ ও জনস্বাস্থের জন্য কোন হুঁমকি আমরা মেনে নিতে পারি না।

Advertisement

কমেন্টস