রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় ভুয়া ডিবি চক্রের সদস্যরা

প্রকাশঃ মার্চ ২১, ২০১৭

বিডিমরনিং ডেস্ক-

হাতে ওয়াকিটকি, হাতকড়া, গায়ে ডিবি লেখা জ্যাকেট, কোমরে গোঁজা পিস্তল। অভিযানের সময় সঙ্গে থাকে ডিবি লেখা কালো গ্লাসের মাইক্রোবাস। এভাবেই ডিবি পুলিশ সেজে ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে ১২টি গ্রুপ। এদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭০।কঠোর সাজা না হওয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

চক্রটির মূল টার্গেট হুন্ডি ব্যবসায়ী, সোনা চোরাকারবারি। এছাড়া সুযোগমতো যাকেই পায় তাকেই ছোঁ-মেরে গাড়িতে তুলে নিয়ে সবকিছু কেড়ে নেয় এই ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারীরা।বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হলেও কঠোর শাস্তি হয় না। জেলখানায় বসেই চক্রের হোতারা সদস্য সংগ্রহ করে দল চালাচ্ছে। চুক্তির টাকা বকেয়া রেখেই জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছে। কারাগারের একাধিক অসাধু কর্মকর্তা ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাকরিচ্যুত কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে ভুয়া চক্রের সদস্যরা কাজ করছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মহরম আলী যুগান্তরকে বলেন, ভুয়া ডিবি চক্রের সদস্যরা মাঝে মধ্যেই গ্রেফতার হয়। তবে গ্রেফতার হয়ে বেশিদিন তাদের জেলে থাকতে হয় না। মোটা অংকের টাকা দিয়ে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাই, ডাকাতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় টাকা বাকি রেখেই তারা কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ঢাকার রায়েরবাজার এলাকা থেকে ভুয়া ডিবি চক্রের মূল হোতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে শাকিলকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল জানায়, এবার গ্রেফতারের ২৫ দিন আগে সে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছে। এর আগে শাকিল অন্তত তিনবার গ্রেফতার হয়েছে।

সহকারী কমিশনার মহরম আলী আরও জানান, গ্রেফতার হয়ে জেলে গিয়ে দল গঠন ও সদস্য সংগ্রহ করে তারা। এরপর জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধ করে তারা।

চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধ সংক্রান্ত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দলের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীতে ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারী ১২টি গ্রুপ সক্রিয়। এই চক্রের সোর্স রয়েছে বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরে। তাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। এ চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন সময় আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। তবে শাস্তি না হওয়ায় আবারও একই অপরাধ করে এ চক্রের সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভুয়া ডিবি আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৭০/১৭১/৩৯৯/৪০২ ধারায় মামলা হয়। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের জেল। সরকারি অফিসার পরিচয়ে অপরাধ করার দায়ে তাদের ২ বছরের শাস্তি হওয়ার কথা। কিন্তু গ্রেফতারের পর তাদের তিন মাসও জেলে থাকতে হয় না। বাইরে থাকা এই চক্রের সদস্যরা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের জামিনে বের করে আনে।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, আদালতে এই চক্রের লোক ঠিক করা থাকে। মোটা অংকের টাকার চুক্তিতে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করে কিছু আইনজীবী। চুক্তির পুরো টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে না পারলেও জামিনে বের হওয়ার পর ছিনতাই, ডাকাতি করে টাকা পরিশোধ করে চক্রের সদস্যরা। এ চক্রের সদস্যরা জেলে বসে দল গঠন করে। অন্য অপরাধে জড়িয়ে যারা জেল খাটছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এ চক্রের সদস্যরা। খাওয়া ও গোসলের সময় এদের সঙ্গে আলোচনা হয়। জেল থেকে বের হয়ে তাদের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হলেই জামিনের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর বাইরে থাকা চক্রের মূল হোতাদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করে। এভাবেই কারাগারে বসে চিহ্নিত অপরাধীদের নিয়ে দল গঠন করে তারা।

ডিবির রামপুরা জোনের সহকারী কমিশনার জানান, সম্প্রতি খিলগাঁও এলাকা থেকে ১১ ভুয়া ডিবিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সম্প্রতি ১১ অপরাধ সংঘটনের কথা স্বীকার করেছে তারা। মূল হোতা এবং প্রত্যেক সদস্য একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।তবে তিন মাসের বেশি কেউ কারাগারে থাকেনি। এদের জামিনের জন্য আদালতে নির্দিষ্ট কয়েকজন আইনজীবী কাজ করেন বলে জানিয়েছে চক্রের সদস্যরা।

গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, প্রত্যেক গ্রুপে থাকে ৬-১০ জন সদস্য। আর দলনেতা থাকেন সহকারী কমিশনারের ভূমিকায়। তার সঙ্গে থাকে পিস্তল ও ওয়াকিটকি। এই ভুয়া ডিবি পরিচয়দানকারী চক্রের প্রত্যেক গ্রুপে থাকে পিস্তলধারী দু’জন ভুয়া এসআই। আর লাঠি হাতে থাকে একজন ভুয়া কনস্টেবল। তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিটি গ্রুপের রয়েছে নিজস্ব সোর্স। সোর্সদের তথ্যের ভিত্তিতে এভাবেই সংগঠিত হয়ে শিকার খোঁজে এ প্রতারক চক্রের সদস্যরা।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. আবদুল্লাহ আবু যুগান্তরকে বলেন, গুরুতর অপরাধে জামিন হওয়া উচিত নয়। তবে দুর্বল চার্জশিট ও মামলার এজাহারের কারণে জামিন হতে পারে। হাতেনাতে গ্রেফতার এমন গুরুতর অপরাধে জড়িতদের এত তাড়াতাড়ি জামিন হওয়া উচিত নয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনের আশ্রয় যে কেউ চাইতে পারেন। কোনো অপরাধীর পক্ষে যদি কোনো আইনজীবী লড়েন সেটা তার নৈতিকতার ব্যাপার।

 

 

Advertisement

কমেন্টস