ভৈরবে মিথ্যা মামলায় ১০ম শ্রেণির ছাত্রীসহ দুই বোনকে গ্রেফতার করে নির্যাতন

প্রকাশঃ মার্চ ২, ২০১৭

রাজীবুল হাসান, ভৈরব প্রতিনিধি-

কিশোরঞ্জের ভৈরবে পিকেটিং ও হত্যার মিথ্যা মামলায় বুশরা আক্তার পান্না (১৮) নামের ১০ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রী এবং তার বড় বোন দুই শিশু সন্তানের মা বন্যা আক্তার (২০) কে গ্রেফতার করে শারীরিক নির্যাতন করে আদালতে সোপর্দ করার অভিযোগ করেছে তাদের পরিবার।

তারা নিরপরাধ মেয়েদের মুক্তির দাবিসহ অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার, পুলিশের জৈষ্ঠ্য উপ-পরিদর্শক নজমুল হুদার বিচার দাবি করছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পৌর শহরের কমলপুর মুসলিমের মোড় এলাকার রিক্সাচালক খায়ের মিয়ার মেয়ে বুশরা আক্তার পান্না স্থানীয় কমলপুর হাজী জহির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক শাখার ১০ম শ্রেণির ছাত্রী। দুই সন্তানের জননী পান্না আক্তার । শিশু সন্তান নূরুল ইসলাম নূর (৭) ও গোলাম মোস্তফা (৫) কে নিয়ে কিছুদিন আগে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি শনিবার দুপুরে একটি মামলার সন্দিগ্ধ আসামী তাদের বড়ভাই কাউছার (২৫) কে গ্রেফতার করতে ভৈরব থানায় কর্মরত পুলিশের জেষ্ঠ্য উপ-পরিদর্শক মো: নজমুল হুদার নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম ওই বাড়িতে আসে। পুলিশ আচমকা তাদের বাড়ির টিনের তৈরি সদর গেইট ভেঙ্গে বাড়িতে ঢুকেন। তখন ঘরে থাকা দুই বোন পান্না আর বন্যা এগিয়ে এসে বাড়ির গেইটে কড়া না নেড়ে ভেঙ্গে ঢুকার প্রতিবাদ করেন। এই নিয়ে পুলিশের সাথে বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে নজমুল হুদা দুই বোনকে মারধর ও লাঠি দিয়ে প্রহার করে ঘরে ঢুকে কাউছারের খোঁজ করে।

এ সময় পুলিশ তাদের ঘরের আসবাব ও মালামাল তছনছ করতে থাকলে তারা এর প্রতিবাদ করেন। এক পর্যায়ে কাউছারকে না পেয়ে পান্না ও বন্যাকে আবারও মারধর করে থানায় ধরে নিয়ে যায়। পরে ২০১৬ সালে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধের সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের থানার অদূরে আলশেফা হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় বাসে থাকা এক যাত্রী পিকেটারদের ইট-পাটকেলে আহত হয়ে মারা যাওয়ায় করা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করে।

তাদের মা মরিয়ম বেগম বীনা বলেন, এ ঘটনায় তার মেয়েদেরকে অকথ্য গালাগালিসহ শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে তাদের মুক্তিসহ অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার নজমুল হুদার শাস্তি দাবি করেন ।

তিনি আরো জানান, গত সোমবার কিশোরগঞ্জ জেল-হাজতে মেয়েদের দেখতে গিয়েছিলেন। তখন মেয়েরা তাদের সাথে পুলিশ কর্মকর্তা নজমুল হুদাসহ অন্যদের অশালীন আচরণসহ শারীরিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। এ কথা বলে তিনি অভিযোগ করেন, মেয়েরা এমন অশালীন আচরণের কথা বলেছেন, যা আমি আপনাদের সামনে বলতে পারবো না। বলেই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

এদিকে আবুল খায়েরের বাড়িতে পুলিশি অভিযান ও পান্না-বন্যাকে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী গৃহবধু রীনা বেগম জানান, “পুলিশ বাড়িতে ঢুকেই মেয়ে দুটিকে মারধর শুরু করলে আমি তাদের কান্না চেচামেচি শুনে ছুটে আসি এবং তাদেরকে না মারতে অনুরোধ করি। তখন নজমুল দারোগা আমাকেও গালিগালাজ শুরু করলে আমি চুপ করে থাকি।”

গৃহবধু সামসুন্নাহার বেগম জানান, এক পর্যায়ে উপ-পরিদর্শক নজমুল হুদা মোবাইল ফোনে কল্ করে থানা থেকে নারী পুলিশ সদস্য এনে বন্যা-পান্নাকে উঠিয়ে নিয়ে যান।

বন্যা-পান্নার বাবা রিক্সাচালক খায়ের মিয়া জানান, তিনিসহ তার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগ সমর্থক। তিনি সদ্য সমাপ্ত পৌর এলাকার ৪নং ওয়ার্ডের একজন ভোটার (ডেলিগেটর) ছিলেন। তার ক্রমিক নং ৩০ আর সদস্য নং ৬০৬৭৫০।

তার অভিযোগ, তিনি একজন আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়া সত্বেও মেয়েরা কি করে বিএনপি-জামায়াতের পিকেটিংয়ে অংশ নিয়ে গাড়িতে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মানুষ হত্যা করলো ? মামলার বর্ণনা মতে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওই ঘটনা ঘটে। সেবার আমার ছোট মেয়ে জেএসসি পরীক্ষার্থী ছিলো। আর বন্যা তো ছিলো তার স্বামীর বাড়ি গজারিয়া ইউনিয়নের মানিকদী গ্রামে। তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট ঘটনায় তার মেয়েদের গ্রেফতার, নির্যাতন ও জেলে পাঠানোর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দাবি করেন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার নজমুল হুদার বিচার।

বন্যার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লেফটেন্টে মো: অহিদুর রহমান জানান, বুশরা বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির মানবিক শাখার শিক্ষার্থী । সে নম্র-ভদ্র ও শান্ত হিসেবে উল্লেখ করে। তিনি শির্ক্ষাথী পান্নার মুক্তি দাবি করেন।

অভিযুক্ত পুলিশের জেষ্ঠ্য উপ-পরিদর্শক মো: নজমুল হুদা জানান, ‘তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেন। পান্না ও বন্যা দুই বোন নাশকতা মামলার পলাতক আসামী ছিলেন বলে তিনি জানান। ওইদিন তাদেরকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ।’

 

Advertisement

কমেন্টস