ব্লগারদের আমেরিকায় আশ্রয় পাওয়ার ভালোমন্দ দু’দিক

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৭, ২০১৬

আবদুল গাফফার চৌধুরী-

আমেরিকা মুক্তমনা বাংলাদেশি ব্লগারদের বাছাই করা কয়েকজনকে আশ্রয়দানের কথা ভাবছে। ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র এবং ব্লগার নাজিমুদ্দীন সামাদ সহিংস জঙ্গিদের হাতে সম্প্রতি নিহত হওয়ার পর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র মার্ক টোনার এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি ব্লগার যারা জীবন নাশের হুমকির মধ্যে রয়েছেন তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়া যায় কিনা তা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

এই খবরের ভালো মন্দ দু’টো দিক আছে। ভালো দিক হলো, যেসব তরুণ প্রতিভাবান ব্লগারকে বাংলাদেশ সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছেন না, তাদের বাছাই করা কয়েকজনকেও যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় দিলে তাদের জীবন নিরাপদ হতে পারে, তাদের লেখালেখির স্বাধীনতা বাড়বে। খারাপ দিক হলো, বাংলাদেশ থেকে বহুকাল ধরেই মেধা পাচার হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা, চাকরি-বাকরি লাভ, উন্নত জীবন যাপনের আশায় ঝাঁকে ঝাঁকে তরুণ দেশ ছাড়ছেন। তাদের মধ্যে মেধাবীদের সংখ্যা কম নয় এবং পশ্চিমা কোনো কোনো দেশ এই মেধাবীদের সাগ্রহে তাদের দেশে স্থান দিচ্ছেন। ফলে এই মেধাপাচার এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এভাবে বাংলাদেশ দিন দিন মেধাশূন্য হলে দেশটি চলবে কি করে? মালয়েশিয়ার মতো দেশ যেখানে বিদেশে শিক্ষা ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত মালয়েশিয়ান তরুণদের নানা অতিরিক্ত সুযোগসুবিধা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োগ করছেন, সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যখন দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তি দরকার, তখন সেই জনশক্তি বিদেশে ক্রমাগত পাচার হতে থাকলে দেশটির ভবিষ্যত্ কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

আমেরিকায় বাংলাদেশি ব্লগারদের বাছাই করা অংশকে আশ্রয় দেওয়া হবে এই খবর প্রচারিত হওয়ার আরো একটা খারাপ দিক আছে। বাংলাদেশের একশ্রেণির তরুণ যারা ব্লগার নয় কিন্তু বিদেশে চলে যেতে চায়, তারা এখন ব্লগার সেজে বিদেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। এই সুযোগ গ্রহণের জন্য তারা এমনসব দায়িত্বহীন ও উস্কানিমূলক লেখা প্রচার করতে পারে, যা জঙ্গিদের উত্সাহিত করবে এবং কিছু নিরীহ ও নির্দোষ ব্লগারের জীবনহানির কারণ ঘটাতে পারে। দেখা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে যেসব ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ধর্ম সম্পর্কে কিছু বৈজ্ঞানিক যুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন, ধর্মের অবমাননা করেননি। এমন কি সম্প্রতি নিহত নাজিমুদ্দীন সামাদেরও এ জাতীয় কোনো লেখা পাওয়া যায়নি। তবু ধর্মান্ধদের হাতে তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

ধর্ম নিয়ে উস্কানিমূলক লেখা-জোকা হোক এটা কেউ চায় না। এই ধরনের লেখা অবশ্যই সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য নিরুত্সাহিত করা দরকার। তাই বলে ধর্মান্ধদের দাবি মেনে ধর্ম নিয়ে মুক্ত আলোচনা বন্ধ বা নিষিদ্ধ করা হলে মুক্তজ্ঞান চর্চা ও সমাজ বিকাশের পথ বন্ধ হবে। ইসলাম ও ধর্ম নিয়ে মুক্ত আলোচনার পথ বন্ধ করেনি। বরং তাকে উত্সাহিত করেছে। মহানবী (দ:) বার বার মুসলমানদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোর না। তোমাদের আগে বহুজাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়ে গেছে (বিদায় হজের বাণী)। রসুলুল্লাহর (দ:) কথা যে কতো সঠিক তার প্রমাণ কি পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখন পাওয়া যাচ্ছে না?

ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লেখা আর ধর্মের অবমাননা করা এক কথা নয়। যুগে যুগে সকল ধর্মেই কিছু কুসংস্কার জন্মে, সেগুলো দূর করার জন্য সংস্কারক বা মোজাদ্দিদেরা আসেন। মোগল যুগের ভারতে এই ধরনের একজন ধর্মসংস্কারক ছিলেন মোজাদ্দিদে আল ফেসানি। ধর্মসংস্কার করতে গিয়ে বহু যুগে বহু মোজাদ্দিদ ও ইমামকে ধর্মান্ধদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। মওলানা আকরম খাঁ তার মোস্তফা চরিত গ্রন্থে এবং কোরআনের তফসিরে নবীর জীবন ও ধর্ম সম্পর্কে মুক্তমন নিয়ে আলোচনা করায় তাকে কাফের আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এই মওলানা আকরম খাঁ ১৯৫৪ সালে ঢাকায় পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘নিরীশ্বরবাদ যদি প্রকৃত বাণী মূর্তি ধারণ করে, তাহলে তাকেও আমাদের সাহিত্যে স্থান দিতে হবে।’ তিনি আজ বেঁচে থাকলে এবং এই উক্তিটি করলে হয়তো নাজিমুদ্দীন সামাদের মতো তাকেও নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হতো।

ব্রিটিশ আমলে বাংলার হিন্দু সমাজকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে বর্তমান আধুনিক ও উন্নত অবস্থায় আনা যেতো না, যদি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়ের মতো সংস্কারকেরা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে হিন্দু সমাজে সতীদাহ নিবারণ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের মতো কঠিন সংস্কারগুলো কার্যকর না করতেন, তখনকার ব্রিটিশ সরকার এই সংস্কারকদের পক্ষ নিয়েছিলেন এবং অনেক সংস্কারমূলক আইন প্রণয়ন করেছিলেন। তারা হিন্দু সমাজের তত্কালীন ধর্মান্ধ অংশের হুমকির তোয়াক্কা করেননি। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেসব সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস দেখাননি, বরং ভোটের রাজনীতির লোভে ধর্মের নামে তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ফলে প্রকৃত ধার্মিকতা নয়, মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার শক্তি আমাদের সমাজ দেহে বেড়েছে এবং যে কোনো মুক্ত আলোচনার জন্যই বিপজ্জনক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মুসলমান সমাজেও প্রকৃত ধর্মানুরাগের বদলে কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা বহুগুণ বেড়েছে। এ যেন বাংলাদেশের মুসলমানদের দ্রুত অন্ধকার মধ্যযুগে প্রত্যাবর্তন! অগ্রগতির বদলে সমাজ মানসের এই পশ্চাত্গতির কারণ কি? এর কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চায় দুর্বলতা এবং মৌলবাদের হুমকির মুখে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোরও ক্রমাগত পশ্চাত্পসরণের মধ্যে। ফলে ব্লগার হত্যা অব্যাহত রয়েছে। ব্লগারদের দেশত্যাগও বেড়ে চলেছে। এ পর্যন্ত ত্রিশজনের মতো ব্লগার দেশত্যাগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি ব্লগারদের আশ্রয় লাভের সম্ভাবনার খবর অন্যান্য ব্লগারকেও দেশত্যাগে উত্সাহিত করবে। অন্যদিকে ধর্মান্ধ ঘাতকেরা রয়ে যাচ্ছে অধরা। সরকার মনে হয় নিরুপায়। দেশ তাহলে কোনিদকে যাচ্ছে?

বাংলাদেশ যে আজ স্বাধীন এই স্বাধীনতা ধর্মান্ধদের দ্বারা অর্জিত হয়নি। হয়েছে আধুনিক শিক্ষায় আলোকিত, গণতন্ত্রমনা মানুষের আন্দোলন দ্বারা। আজ যে বাংলাদেশে উন্নত ও শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ দেখা যায়, তার পেছনে রয়েছে কাজি আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হুসেন, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল ফজল আরজ আলী মাতুব্বর প্রমুখ বহু মুক্তমনা মনীষীর অবদান। ত্রিশের দশকের ঢাকায় এদের অনেকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। এ যুগে জন্মালে এরা প্রত্যেকেই ধর্মান্ধদের চাপাতি হত্যার শিকার হতেন।

ব্রিটিশ আমলেও (এমন কি পাকিস্তান আমলেও) মুক্তবুদ্ধির চর্চার পরিবেশ বর্তমানের মতো এতোটা বিপজ্জনক ছিল না বলেই মওলানা আকরম খাঁর পক্ষে মোস্তফা চরিত, আবুল মনসুর আহমদের পক্ষে হুজুর কেবলা গল্প, মোতাহার হোসেন চৌধুরীর পক্ষে সংস্কৃতি কথা গ্রন্থ লেখা, আরজ আলী মাতুব্বরের পক্ষে তার দার্শনিক গ্রন্থগুলো লেখা সম্ভব হয়েছে। এই মুক্ত জ্ঞানচর্চা বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে নব জাগরণের সূচনা করেছিল। আজকের স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এই নব জাগরণের ফসল।

এখন এই ফসলের লুণ্ঠনের কাজ অবাধে চলছে। একদল ধর্মান্ধ বর্গির আবির্ভাব ঘটেছে বাংলাদেশে। বর্তমান সরকার যদি কঠোর হাতে এই বর্গিদমনে সাহস না দেখান, ব্লগার হত্যা ও ব্লগারদের দেশত্যাগ বন্ধ করতে না পারেন তাহলে মুক্ত জ্ঞান চর্চার অনুপস্থিতিতে দেশ ও সমাজ কুসংস্কারে ভরে যাবে। কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নই সামাজিক অবক্ষয় ও পশ্চাত্গতি রোধ করতে পারবে না। ধর্ম নিয়ে আলোচনা মানেই ধর্মের অবমাননা নয়। বাংলাদেশে দুধরনের ব্লগার আছে। যারা ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখেন। সমাজ প্রগতির জন্যই এই লেখালেখির প্রয়োজন। আরেক দল ব্লগার আছেন, যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধর্মের বিরুদ্ধে উস্কানি দানের জন্য দায়িত্বহীন কথাবার্তা লেখেন এবং দেশে অশান্তি ও হানাহানি সৃষ্টি করতে চান। সরকারের উচিত এদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কিন্তু সেই ব্যবস্থাটিও সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে। ধর্মান্ধ ঘাতকদের হাতে এই ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া কিছুতেই উচিত হবে না। সভ্য সমাজের মূল দায়িত্ব তার একজন নাস্তিক সদস্যেরও জীবনের নিরাপত্তা বিধান। তার প্রাণহননের কাজকে কোনো ভাবেই প্রশ্রয় না দেওয়া। ইসলামের এক খলিফা তার পুত্রহন্তাকে পর্যন্ত নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ন্যায়বিচারে দণ্ডিত না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যক্তির জীবনরক্ষা খলিফা হিসাবে আমার দায়িত্ব।

সরকার ধর্ম নিয়ে উস্কানিমূলক লেখা বন্ধ করুন। কিন্তু ধর্ম নিয়ে মুক্ত আলোচনার দুয়ার যেন বন্ধ না করেন। বন্ধ করলে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশ অব্যাহত রাখা যাবে না। উদ্দেশ্যমূলকভাবে যেসব ব্লগার ধর্মের বিরুদ্ধে উস্কানিদানের লেখা লেখেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বটিও সরকার নিজের হাতে রাখুন। হিংস্র ধর্মান্ধদের হত্যালীলা কঠোর হাতে বন্ধ করতেই হবে। এই ব্যাপারে প্রশাসনের কোনো অংশে যেন কোনোপ্রকার দুর্বলতা না থাকে।

জীবনের নিরাপত্তার অভাবে ব্লগারদের দেশত্যাগ সরকারকে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তাদের নিরাপত্তার কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে এক সময় দেখা যাবে দেশের তরুণ এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মেধাশক্তির বারো আনাই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। তাতে সুবিধা হবে অশিক্ষা ও ধর্মান্ধতা দ্বারা প্রভাবিত এমন তরুণ গোষ্ঠীর প্রশাসন পরিচালনা ও সরকার গঠনেও যাদের ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যাবে না। তালেবানদের তখন আর হিংসার আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতা দখল করতে হবে না। ক্ষমতাই তাদের কোলে পাক্কা ফলের মতো টুপ করে পড়বে। বাংলাদেশি ব্লগারদের আশ্রয় দানে আমেরিকার প্রস্তাব তাই প্রশংসনীয়; কিন্তু বাংলাদেশের নিজের স্বার্থেই ব্লগারদের নিজ দেশেই নিরাপত্তাদানের ব্যবস্থা করা উচিত।

‘দৈনিক ইত্তেফাক’ থেকে সংগৃহীত।

কমেন্টস