সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাস

প্রকাশঃ জুলাই ৫, ২০১৮

সোহানুজ্জামান-

সাঁওতাল বিদ্রোহ, যাকে সাঁওতালি ভাষায় বলা হয় “সাঁওতাল হুল”, বাংলায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ। যার সূচনা হয়েছিল ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চার ভাই সিদু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব। তবে তার পূর্বে আরও একটি ইতিহাস রয়ে গেছে, সাঁওতাল বিদ্রোহের পূর্বে। ওয়াহিবারা আন্দোলন শুরু করেছিল, কিন্তু সেই আন্দোলন চলে গিয়েছিল অন্য খাতে।

একমাত্র সাঁওতাল বিদ্রোহ-ই প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন হিসেবে পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছিল। এই আন্দোলনের সাথে কেবল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের তুলনা করা যেতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসক, জমিদার, মহাজনদের ঠকবাজি, পুলিশ-দারোগাদের নির্যাতন, জুলুম, অত্যাচার ও অন্য সম্প্রদায়ের শোষণ ও নির্যাতন ইত্যাদি ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের অন্যতম কারণ।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় ভূমিব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানোর ফলে সেই প্রভাব পড়ে  সাঁওতাল পরগণাতেও। এর ফলে দীর্ঘদিন সাঁওতালদের মধ্যে যে ধরনের ভূমিব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাতে আঘাত আসে, যা সাঁওতালরা মেনে নেয়নি। এর ফলেই আসল সমস্যার সূত্রপাত হয়।

সাঁওতালরা খেপে ওঠে, শুরু হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ। বৈদেশিক শাসনব্যবস্থা বা ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা এবং দেশীয় সামন্ততন্ত্রের মূলোৎপাটন করার লক্ষ্য নিয়েই সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়।

এ প্রসঙ্গে ওল্ডহাম সাহেবে লিখেছেন, “পুলিশ ও মহাজনের অত্যাচারের স্মৃতি যাহাদের দেশপ্রেম জাগাইয়া তুলিয়াছিল, আন্দোলন তাহাদের সকলকেই আকৃষ্ট করিল। কিন্তু যে মূল ভাবধারাকে কার্যে পরিণত করিবার চেষ্টা হইতেছিল তাহা ছিল সাঁওতাল অঞ্চল ও সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা।”

অর্থাৎ, ভূমিব্যবস্থা থেকে সব দিকেই সেই সময়টাতে সাঁওতালরা নানাভাবে শোষণ নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। আর এর ফলেই সাঁওতালরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এই শোষণ ও নির্যাতনের শিকার শুধু সাঁওতালরাই হচ্ছিল এমন নয়, এই শোষণ নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল সেই অঞ্চলের নিম্নবর্গের মানুষেরা।

ফলে এ আন্দোলনে যে শুধমাত্র সাঁওতালরাই অংশগ্রহণ করেছিল তা নয়; সাঁওতালদের সাথে সাথে অংশগ্রহণ করেছিল সাঁওতাল পরগণা ও পার্শবর্তী জেলার কর্মকার, তেলি, চর্মকার, ডোম ও মোমিন সম্প্রদায়ের দরিদ্র মুসলমানরা। আশির দশকে নিন্মবর্গের ইতিহাস” বলে যে ইতিহাস-পাঠের সূচনা হয়, সেই ইতিহাস হিসেবে বিবেচনা করা যাবে সাঁওতাল বিদ্রোহকে, অনায়সে। অর্থাৎ, ভারতবর্ষে নিম্নবর্গের আন্দোলনসমূহের মধ্যে সাঁওতাল বিদ্রোহ অন্যতম, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়। তবে এর আগেও একটি ক্ষুদ্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, ১৭৮৪ সালে।  বাবা তিলকা মাঝি নামে একজন সাঁওতাল এই বিদ্রোহের সূচনা করেছিল এবং তাঁর বাঁটুলের (গুলতি) আঘাতে ভাগলপুর ও রাজমহলের কালেক্টর ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যু হয়।

যদিও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয় এবং ১৭৮৫ সালে তিলকা মাঝির ফাঁসি দেওয়া হয়। আর চূড়ান্ত সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয় ৩০ জুন, ১৮৫৫ সালে, সিদু ও কানুর নেতৃত্বে। ভাগনদিহি গ্রামের বিশাল বটগাছের নিচে সিদু ও কানু ভাষণ দেন। শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য দশ হাজার সাঁওতালের শপথ  গ্রহণ করে। এই বিশাল সাঁওতাল বাহিনী কলকাতা অভিমুখে প্রথম গণ-পদযাত্রা করে এবং এই বিশাল বাহিনীর দেহরক্ষী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। এই আন্দোলনের গণসমর্থন ছিল ব্যাপক

প্রথমদিকে সাঁওতাল বিদ্রোহ অহিংস থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই সাঁওতাল বিদ্রোহ সহিংস হয়ে ওঠে। এর একটি কারণ ছিল তাঁদের রসদের ভান্ডার শেষ হওয়া। প্রথমে বিদ্রোহীরা পাঁচক্ষেতিয়ার বাজারে উপস্থিত হয়ে এই বাজারের কুখ্যাত মহাজন মানিক চৌধুরী, গোরাচাঁদ সেন, সার্থক রক্ষিত, নিমাই দত্ত ও হিরু দত্তদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুণ্ঠন করে এবং পাঁচজনকেই হত্যা করে।

এ সংবাদ শুনার পর দিঘী থানার দারোগা মহেশলাল  দত্ত সদলবলে সিদু কানুকে গ্রেপ্তার করতে আসে, কিন্তু নিজেরাই সাঁওতালদের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মূলত এই দারোগা-হত্যার মধ্য দিয়েই সাঁওতাল বিদ্রোহের আরম্ভ।

এ প্রসঙ্গে হান্টার বলছেন, “যখন সাঁওতালগণ কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিয়াছিল, তখন তাহারা সশস্ত্র বিদ্রোহের কথা ভাবিয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। … অভাবের তাড়নায় তাহারা মহাজনদের গৃহ লুন্ঠন করতে বাধ্য হলেও দারোগা হত্যার ঘটনাটিই তাহাদের অভিযানের চরিত্র ও রূপ বদলাইয়া দেয়।”

বিদ্রোহের প্রথম দিকেই সাঁওতালরা তাদের পুরোনো শত্রুদের বেছে বেছে হত্যা করতে থাকে। মহেশলাল দত্তের হত্যার পর সাঁওতালরা হত্যা করে গোদ্দা মহকুমার কুরহুরিয়া থানার বড় দারোগা প্রতাপনারায়ণকে। এরপর কানুর হাতে মৃত্যুবরণ করে কুখ্যাত আরেকজন দারোগা ‘খানসাহেব’। এরপরে বারহাইতের বিশাল বাজার দখল করে নেয় বিদ্রোহীরা এবং সেই বাজারের বড় বড় মহাজনকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা এবং তাদের সকল মালামাল লুন্ঠন করে নেয় বিদ্রোহীরা।

এরকম অবস্থায় বিভিন্ন ছোট ছোট পদে থাকা কর্মকর্তারা তাদের চাকরি ছেড়ে দেয় প্রাণের ভয়ে। ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা একবারে ভেঙে পড়ে। টনক নড়ে ইংরেজ সরকারের। বড় বড় পত্রিকাগুলো এ বিদ্রোহের কথা ফলাও করে তাদের পত্রিকাতে ছাপতে থাকে।

ভাগলপুরের কমিশনার এ-অঞ্চলের সামরিক অধিনায়ক মেজর বরোজকে নির্দেশ দেন রাজমহল পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে বিদ্রাহীদেরকে বাধাদান করতে। মেজর বরোজ  পার্শবর্তী অঞ্চল থেকে আরো সৈন্য এবং হাতি সংগ্রহের পরে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হয়।

১৬ই জুলাই ভাগলপুর জেলার পিয়ালপুরের নিকটবর্তী পীরপাঁইতির  ময়দানে দুই পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয় এবং ইংরেজ বাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এ বিষয়ে কে. কে. দত্ত তাঁর ‘সাঁওতাল ইন্সারেকশন’ গ্রন্থে বলছেন, “বিদ্রোহীরা নির্ভীকচিত্তে প্রাণপনে যুদ্ধ করিয়াছিল। তাহাদের যুদ্ধাস্ত্র কেবল তীর-ধনুক আর এক প্রকার কুঠার (টাঙ্গি)। তাহারা মাটির উপরে বসিয়া পায়ের দ্বারা ধনুক হইতে তীর ছুঁড়িতে অভ্যস্ত।”

ইংরেজরা এই পরাজয়ের পর সাঁওতালরা আরও সাহস পায় এবং  তাদের কর্মকান্ড সমানভাবে চালিয়ে যেতে থাকে। এবং তা বিহারের গোদ্দা, পাকুড় ও মহেশপুর অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

এই বিষয়টি সমগ্র ইংরেজ শাসনের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এবং এর ফলে ইংরেজ প্রশাসন দ্রুতই এই আন্দোলনকে থামাতে চাচ্ছিল। ফলে পূর্ব ভারতের সকল সৈন্যবাহিনী ও কামান এই অঞ্চলে সমাবেত করা হয়। এবং এই সকল সৈন্যবাহিনী পরিচালনার জন্য সর্বাপেক্ষা দক্ষ সেনাপতিদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এবং এই বিশাল বাহিনীর কাছে সহজেই সাঁওতাল বিদ্রোহীরা ধরাশায়ী হয়।

এছাড়া হাতি দ্বারা তাদের বাড়ি-ঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়। হাতির তলে পিষ্ট হয়ে হাজার হাজার সাঁওতাল নারী ও শিশু মাারা যায়। এবং একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে চলে যায় সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং বিদ্রোহীরা হতাশ হয়ে পড়ে, চোরাগোপ্তা হামলা চালালেও অল্পকিছুদিনের মধ্যে এই বিদ্রোহ স্থিমিত হয়ে পড়ে। এরই মাঝে সিদু ও কানু  ইংরেজ বাহিনীর হাতে ধৃত হন এবং তাদেরকে ফাঁসির মাধ্যমে হত্যা করা হয়। এছাড়া চাঁদ ও ভৈরব ইংরেজদের সাথে যুদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ করেন। ফলে এই বিদ্রোহ নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।

বিদ্রোহের অন্যান্য নেতৃবৃন্দও একে একে ইংরেজেদের হাতে ধৃত হয় এবং প্রাণ বিসর্জন দেন। এবং এর কিছুদিনের মধ্যেই সাঁওতাল বিদ্রোহের অবসান হয়। কিন্তু এর একটি গভীর তাৎপর্য ছিল। এই আন্দোলনের স্পিরিট পরবর্তীতে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে-সংগ্রামে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।

কমেন্টস