‘শিকার’ই’ সাঁওতালদের জীবনধারণের অন্যতম সহায়ক নয়, আদি সংস্কৃতির অংশও

প্রকাশঃ মে ২৪, ২০১৮

বোরহান উদ্দিন।।

মনুষ্য গবেষণায় পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের প্রাচীনত্ব। বর্তমান মানব প্রজন্ম মানুষের আবির্ভাবের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সাথে পরিচিত। ফলে ধারণা করা হতো শুধু শিকার করেই সাঁওতালরা জীবন ধারণ করতো। কিন্তু বিবর্তনের ধারায় তা আর টিকেনি।  ক্রমশই প্রমাণ হলো শিকার’ই সাঁওতালদের জীবনধারণের অন্যতম সহায়ক নয়, আদি সংস্কৃতির অংশও।  এই প্রাচীন রীতি সাঁওতালদের প্রাচীনত্বকে স্মরণ করে দেয়। বদলে দেয় হাজারো বছরের ইতিহাস।

জানা যায় যে, মহাবরফ যুগে মানুষ ইউরোপে বসবাস করত। সম্ভবত, এরো আগে ভূতাত্ত্বিক যুগে মানুষ বসবাস করে এসেছে।  অনেক প্রাণির সঙ্গেও মানুষ নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে। আদিম ও বর্বর অবস্থা এবং বর্বর ও সভ্য অবস্থার মধ্যে সম্পর্কের ধারণা বস্তুগতভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্বাস করা হয় যে, বর্বর যুগের আগে ছিল আদিম অবস্থা। যেমন জানা গেছে সভ্য অবস্থার আগে ছিল বর্বর পর্যায়। এতে দেখা যায়, মানব জাতির উদ্ভবের ইতিহাসের উৎস এক, তার অভিজ্ঞতা এক ও প্রগতিও এক।

মানুষ যে নগণ্য অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল তা নিখুঁতভাবে পরিস্ফূট হয় মানুষের জীবন ধারণের আনুষঙ্গিক সামগ্রী লাভের কলাকৌশল। এর উপর নির্ভর করেছে পৃথিবীতে মানুষের প্রাধান্য কতটা খাটবে। মানুষ একমাত্র প্রাণী, যার খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে পুরোপুরি দখল আছে।  খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা পরিব্যাপ্ত করতে না পারলে মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে যেতে পারত না।  খাদ্যের বিভিন্নতা ও পরিমাণের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা না থাকলে জনবহুল জাতি গঠন সম্ভব হত না।  মানবজাতির মধ্যে প্রগতির যে ঢল নামে সম্ভবত তা খাদ্যদ্রব্যের উৎসের ক্রমবর্ধমানতার দরুন সম্ভব হয়েছে।

আমাদের মানুষের জীবনধারণের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ফলমূল নির্ভর আহার্য দ্রব্য, যার উৎস ছিল খুব সীমিত। যা ছিল মানুষ্য জাতির শৈশব অবস্থা।  যে ধরনের আহার্য দ্রব্যের কথা বলা হয়েছে তাতে বোঝা যায় মানুষ বসবাস করত গ্রীষ্মমণ্ডল বা ক্রান্তীয় অঞ্চলে।  আহার্য বস্তু হিসেবে মাছের ব্যবহারের শুরুতেই আগুনের আবিষ্কার হয়েছিল। মাছের উপর নির্ভর করতে শিখেই মানুষ জলবায়ু ও আঞ্চলিক বন্ধনের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে।  নদী, সমুদ্র ও হ্রদের তীর ধরে মানুষ আদিম যুগেই পৃথিবীর বিপুল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মাটির চুলা তৈরি করে রুটি বানানো, অস্ত্র দিয়ে শিকার করা বিশেষ করে তীর-ধনুকের সাহায্যে শিকার করা, যদিও এই অস্ত্রটি আসে বর্শা আবষ্কারের পর। কিন্তু অস্ত্র হিসেবে ফলপ্রসূ হয়ে দাঁড়ায়। তীর-ধনুকের উদ্ভব ঘটে আদিম যুগের শেষ পর্যায়ে যা আদিম সমাজকে বেশ শক্তিশালী করে তোলে। যেমন লোহার তরবারি শক্তিশালী করে বর্বর যুগকে আর আগ্নেয়াস্ত্র শক্তিশালী করে সভ্য যুগকে।

আদিম স্তর পার হয়ে নিম্ন পর্যায়ের বর্বর যুগে লক্ষ্য করলে দেখা যায় চাষের সাহায্যে শস্য উৎপাদন এবং শস্যকে আহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়।  শস্য ফলানোর সাথে আহার্য হিসেবে মাংস ও দুধের ব্যবহার ব্যাপকভাবে মানব সমাজে প্রভাব ফেলে।  ফলে মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য পশুপাখি শিকার, পশুপালনের ফলে দুধ ও মাংসে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়। আবার জমি চাষের জোরে খাদ্যশস্যের ফলনে গৃহপালিত পশুরা মানুষকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করেছে। মানুষের অগ্রগতিতে এর একটা বিরাট অবদান রয়েছে। কালক্রমে লোহার ব্যবহার শেখার পর লোহ-ফলা ব্যবহার করে লাঙ্গলের ব্যবহার ঘটে। সাথে আসে কোদাল ও কুড়ুল। পশুচালিত লাঙ্গলকে এক নতুন কলাকৌশল হিসেবে গ্রহণ করে মানবজাতি।  এসব আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ বনজঙ্গল সাফ করে চাষের ক্ষেত্র বাড়ানোর চেষ্টা করে ফলে সীমিত জায়গায় ঘন জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন তত্ত্ব যা কালচার ও সমাজকে সময়ের সাথে পরিবর্তিত করে বর্ণনা করে। এটি সমাজতাত্ত্বিক বিকাশের এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজ বা সংস্কৃতির জটিলতা, সমাজ বিবর্তন প্রক্রিয়াটিকে জটিলতার হ্রাস করতে পারে বা জটিলতা মধ্যে কোন আপাতদৃষ্টে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছাড়াই প্রকরণ বা বিস্তার সৃষ্টি করতে পারে। সমাজ-সাংস্কৃতিক বিবর্তন একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা কাঠামোগত পুনর্গঠন সময় দ্বারা প্রভাবিত হয়। অবশেষে একটি ফর্ম বা কাঠামো তৈরি হয় যা পূর্বপুরুষদের ফর্ম থেকে গুণগতভাবে ভিন্ন।

এই সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, বিবর্তন তথা কাঠামোগত পুনর্গঠনের মধ্যদিয়ে সমাজব্যবস্থা শিল্পায়ন, নগরায়ন ও শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে আধুনিক সমাজে বিবর্তিত হলেও কিছু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় পূর্বপুরুষদের অনুসৃত কিছু কলাকৌশল জীবনধারণের সহায়ক হিসেবে সমাজে টিকিয়ে রেখেছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতালরা পূর্বপুরুষদের জীবনধারণের সামগ্রী লাভে শিকারের কলাকৌশল অনুসরণ করে আসছে যা বর্তমান আধুনিক সমাজব্যবস্থায় তাদের জীবনধারণের সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই খাদ্য সংস্থান ও আত্মরক্ষাকল্পেই মানুষ বুনো পশু-পাখিকে ভোঁতা পাথর, গাছের ফলা ইত্যাদি দিয়ে শিকার করতো। যখন মানুষ পাথর এবং কাঠের যন্ত্রপাতির ব্যবহার করতে শিখে তখনই তারা শিকার কার্যের সাথে পরিচিত হয়। তখন তারা বর্শাফলক, বল্লম, সড়কি ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দলবদ্ধভাবে শিকারে বেরুতো। এ সকল অস্ত্র দিয়ে প্রাণি হত্যা করে কিংবা আহত প্রাণিকে সাথে নিয়ে নিজ নিজ গুহায় ফিরে আসতো। বর্তমানের আধুনিক সভ্য জীবনে শিকার প্রিয় ব্যক্তিরা বন্দুক এবং তীর-ধনুকের সাহায্যে শিকার করতে বের হন। কেউ কেউ নিছক চিত্ত বিনোদনের উদ্দেশ্যে শিকারে বেরিয়ে পড়েন।

সময়ের বিবর্তনে অনেক শিকারীই শুধুমাত্র পশুর চামড়া দিয়ে পোশাক বানানোর উদ্দেশ্যে শিকার করে থাকেন। কেউবা আবার ব্যক্তিগত সক্ষমতা, পারিবারিক ঐতিহ্য বা বাহাদুরী প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বাড়ির দেয়ালে সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্যে ঝুলিয়ে রাখেন। আবার কেউ হয়তোবা অর্থ উপার্জনের হীন উদ্দেশ্যে শিকার করে থাকেন। কিন্তু সাঁওতালরা জীবনধারণের সহায়ক হিসেবে পশুপাখি শিকার করে আসছে আদিকাল থেকে। সাঁওতালদের শিকারব্যবস্থা কিভাবে তাদের জীবনধারণের অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করছে তা বিবেচনা করলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয়- শিকারের সাথে সাঁওতাল জীবন, অর্থনীতির সাথে সম্পর্ক, নিজস্ব উৎসবের সাথে সম্পর্ক এবং সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ইত্যাদি।

সাঁওতালরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলির একটি। সাঁওতালরা দলবদ্ধভাবে শিকার করে। এ শিকার নিয়ন্ত্রিত বাছবিচারহীন নয়। মূহুর্তে ব্যাপক ক্ষতিসাধনকারী তথাকথিত সভ্য সমাজের মারণাস্ত্র গুলি, বোমা কিংবা কামান তাদের অস্ত্র নয়। শিকারের পদ্ধতি হিসেব পূর্বপুরুষদের অনুসৃত কিছু পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি হিসেবে দেশীয়, নিজেদের হাতে বানানো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে যেমন- কোঁচ, বাটুল, মাটির গুলি, তীর, ধনুক, মুগুর, লাঠি, ট্যাঁটা, কারেন্ট জাল, জালি, বড়শি, ফাটক (ফাঁদ), বাঁশের কঞ্চি, খাঁচা ইত্যাদি। এরা নিজেদেরকে কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ রচিত মহাভারতে বর্ণিত কুরু-পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের প্রত্যাখ্যিত-ভাবশিষ্য একলব্যের বংশধর বলে বিশ্বাস করে এবং তীর চালনাকালে এখনও নিজেদের বৃদ্ধাঙ্গুল ব্যবহার করে না, কারণ তাদের আদিপুরুষ একলব্যকে গুরুদক্ষিণাস্বরূপ নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দান করেছিলেন।

এছাড়া আক্রমণের সময় শিকার বস্তুকে দুর্বল করতে ধোঁয়া ব্যবহার করা হয়। ধোঁয়া তৈরির জন্য শুকনো হলুদ গাছ, শুকনো মরিচ, শুকনো পাতা ব্যবহার করা হয়। নিজস্ব পদ্ধতির সাথে শিকারের পূর্বাভিজ্ঞতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। শিকারে নতুন সদস্যরা অভিজ্ঞদের অনুসরণ করে। এদেশে বন-জঙ্গল কমে যাওয়ায় সাঁওতালরা গ্রামের আশেপাশের ঝোপঝাড়ে বিভিন্ন প্রাণি শিকার করে থাকে। শিকারের বস্তু হিসেবে গাওড়া (বনবিড়াল), বিভিন্ন রকমের ইঁদুর, পাখি (হালদে পাখি, বাজপাখি, পেঁচা, ফিঙ্গে, ছুঁচে ব্যতীত), কাঠবিড়ালী, মাছ, কুঁচে, বিশেষক্ষেত্রে শিয়াল, খরগোশ, কচ্ছপ, কাঁকড়া, মেছোবাঘ সহ বনেজঙ্গলে-ঝোপঝাড়ে বিভিন্ন পশুপাখি শিকার করে। বিভিন্ন প্রাণীর পায়ের চিহ্ন, বিষ্ঠা, চলাচলের রাস্তা, গন্ধ, লোম বা পালক, গর্তের মুখ, বাসা ইত্যাদি দেখে শিকারের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। শিকারের সময় নিজস্ব ভাষা, ইশারা-ইঙ্গিত ব্যবহার করে যা দলের সদস্যরা অনুসরণ করে।

শিকার ধরার পর তারা নিজস্বভাবে আনন্দ-উল্লাস করে। শিকারে অংশগ্রহণকারী শিকারীই শিকারকৃত প্রাণীর অংশীদার হয়, তবে শিকারে মহিলাদের অংশগ্রহণ থাকে না। শিকারের সময় বিভিন্ন ট্যাবু-বিশ্বাস প্রচলিত যা সকলে মেনে চলে; যেমন, যেকোন দিন শিকার যাওয়া যায় তবে রবিবার পবিত্র দিন, বিভিন্ন পশুপাখি শিকার নিষিদ্ধ (হালদে পাখি, বাজপাখি, পেঁচা, ফিঙ্গে, ছুঁচে) কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে শিয়াল শিকার করে মাংস খেলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করে।

ঐতিহ্যগতভাবে, সাঁওতালরা প্রধানত কৃষক। প্রায় ৯৫% কৃষিতে কর্মরত রয়েছে। সমাজ-সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্যদিয়ে সমাজ পুনর্গঠনের এই সময়ে এসে শিক্ষা, সংস্কৃতির দিক দিয়ে দেশের অন্যান্য সম্প্রদায় উন্নতি লাভ করলেও সাঁওতালরা এসব ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে। অতীতে সাঁওতালদের অধিকাংশরই জমি ছিল, কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে, অর্থদণ্ড ও জমিদারদের শোষণ, জমি অবৈধ দখল, দারিদ্র্য এবং নিরক্ষরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের সাঁওতালরা অধিকাংশই তাদের জমির মালিকানা হারিয়েছে। ফলে বর্তমান সময়ে সাঁওতালদের ৯০% জমি ভূমিহীন। ভূমির মালিকানা নির্ভর করছে সমতল ভূমির উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জনগোষ্ঠীদের ওপর। ফলে এসব জমিতে বর্গাচাষী বা দিনমজুরি হিসেবে কাজ করে সাঁওতালরা।

গবেষণা ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সমস্ত ভূসম্পত্তির মালিক উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হিন্দু-মুসলমান। তারা নিম্ন আয়ের মানুষদের বিভিন্ন উপায়ে জমি ইজারা দিয়ে থাকেন। এর অংশ হিসাবে, দরিদ্র ও অধীনস্ত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কিছু জমি ইজারা পেয়ে থাকে এবং যারা পায় না তারা কৃষিজমিতে কাজ করে জীবিকার্জন করে। এভাবে কৃষি কাজ থেকে অর্থ উপার্জন করে নিজের ও পরিবারিক জীবনধারণ অত্যন্ত কঠিন। তাই, নিজের ও পরিবারকে ভালো রাখার জন্য সাঁওতালরা বনজঙ্গলে ভালো খাবারের প্রয়োজনে পশুপাখি শিকার করে থাকে। ফলস্বরূপ, তাদের মাংসের চাহিদার পূরণ হয়, অর্থনৈতিক দিক থেকে কিছুটা স্বচ্ছলতা আসে।

তাই, কৃষি কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বনেজঙ্গলে পশুপাখি শিকার করে। সাঁওতালের শিকারের এদেশের অর্থনীতিতে একটি বড় প্রভাব রয়েছে। কারণ সাঁওতালরা যে বন্যজন্তু শিকার করে তা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ। তারা যেসব ধান, গম, ভুট্টা, আখ, পাট ইত্যাদি প্রধান অর্থকরী ফসলের ক্ষতির কারণ সেসব প্রাণী  শিকার করে। ফলস্বরূপ, আমাদের কৃষি অর্থনীতি ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যায়। বনজঙ্গলে যেমন শিয়াল, বনবিড়াল, নেকড়ে, খরগোশ, মেছোবাঘ ইত্যাদিও আমাদের গৃহপালিত পশুপাখিদের ক্ষতি করে। আর এইসব শিকারের মাধ্যমে সাঁওতালরা এদেশের গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ভূমিকা পালন করে। বন্যপশুর ঘণত্ব বৃদ্ধিরোধকল্পে শিকার করা ভাল বলে দাবী করছেন গবেষকগণ। খাদ্যশস্যাদির জন্যে ক্ষতিকারক স্তন্যপায়ী জীব ও পাখি নিধনে বিভিন্ন সময়ে শিকার কার্য পরিচালনা করা হয়ে থাকে। কীট-পতঙ্গ দমনের স্বার্থে এবং খাদক পশুর অনুপস্থিতিজনিত কারণে পশু-পাখির ঘণত্ব রোধে এ ধরনের শিকার হয়। সেজন্যে আধুনিক বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় শিকারকে আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবের সাথে সাঁওতালদের শিকার ব্যবস্থা বিভিন্নভাবে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। সাঁওতালরা খুবই উৎসবপ্রিয় জাতি। বাঙালিদের মতো এদেরও বারো মাসে তেরো পার্বণ। তাদের বছর শুরু হয় ফাল্গুন মাসে। প্রায় প্রতিমাসে বা ঋতুতে রয়েছে পরব বা উৎসব যা নৃত্যগীতবাদ্য সহযোগে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। নববর্ষের মাস ফাল্গুনে যেমন অনুষ্ঠিত হয় স্যালসেই উৎসব, তেমনি চৈত্রে বোঙ্গাবোঙ্গি, বৈশাখে হোম, আশ্বিনে দিবি, পৌষ শেষে সোহরাই উৎসব পালিত হয়। সোহরাই উৎসব সাঁওতালদের একপ্রকার জাতীয় উৎসব যা পৌষ সংক্রান্তির দিন অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপিত হয়। এই উৎসবের চতুর্থ দিনে মাছ বা কাঁকড়া ধরতে সাঁওতালরা সবাই দলবেঁধে জাল আর পলো নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সাঁওতালরা এটিকে বলে ‘হাকু কাটকোম’।

আবার উৎসবের ষষ্ট দিনটি মূলত শিকারকেন্দ্রিক। সাঁওতালদের ভাষায় এটি ‘সেন্দ্ররা’। ঐদিন সকালে একদল সাঁওতাল তীর ধনুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শিকারে। আর গোত্রের অন্যরা মাঝি হাড়ামসহ গ্রাম পরিষদের পাঁচ সদস্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ-গান ও বিভিন্ন খেলা দেখিয়ে চাল তুলে তা জমা রাখে মাঝি হাড়ামের বাড়িতে। দিনশেষে শিকার থেকে ফেরা শিকারিদের নিয়ে চলে নানা প্রতিযোগিতা। একটি মাঠে একটি কলাগাছ দাঁড় করিয়ে তার ওপর রাখা হয় মাঝি হাড়ামের স্ত্রীর হাতের তৈরি তিনটি তেলের পিঠা। দূর থেকে তীর ধনুক দিয়ে যে কলাগাছ লাগাতে পারে সেই হয় বিজয়ী। বিজয়ীকে আবার পালন করতে হয় বেশ কিছু নিয়ম। পাঁচটি ধনুক মাটিতে লম্বালম্বি সাজিয়ে বিজয়ীকে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে এর চারদিক ঘুরে মাটিতে থাকা ধনুক একটি একটি করে তুলতে হয় এবং একই নিয়মে আবার মাটিতে সাজাতে হয়। অতঃপর কলাগাছটি গোত্র পরিষদের পাঁচ সদস্যের জন্য পাঁচ টুকরো করে বিজয়ী কাঁধে তুলে নেয়। এই অবস্থায় বিজয়ীকে সবাই কাঁধে তুলে হৈ-হুল্লোড় করে নিয়ে আসে মাঝি হাড়ামের বাড়িতে। এ সময় সবাইকে আপ্যায়ন করা হয় মুড়ি আর হাঁড়িয়া দিয়ে।

অন্যদিকে শিকারগুলো দিয়ে চলে খিচুড়ি রান্না। খিচুড়ি আর হাঁড়িয়ায় ভাসতে থাকে গোটা গ্রাম। সাঁওতালদের সম্মিলিত আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াও বিবাহ সম্পর্কিত উৎসব, শিশু জন্মকেন্দ্রিক আচার অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানগুলিতে আত্মীয়স্বজনদের আনন্দ দেওয়ার জন্য নৃত্য-গীত আয়োজন করা হয়। এতে সাঁওতালরা আত্মীয়দের ভাল খাবার পরিবেশন করার জন্য বন্য পশুপাখি শিকার করে। বিভিন্ন উৎসব উদ্যাপনের আনন্দেও সাঁওতালরা পশুপাখি শিকার করে।

সামাজিক বৈষম্যের দিক বিবেচনা করে দেখা যায় যে, সাঁওতালরা বনজঙ্গলে শিকার করে এবং তাদের অধিকাংশই সমাজের অন্যান্য স্তরের লোকেরা অবহেলা করে। সাঁওতালরা বন্য পশু এবং মৃত প্রাণী গ্রহণ করে, যা দেশের অন্যান্য ধর্মে নিষিদ্ধ। তাই এসব এলাকায় ধর্মীয় বৈষম্যের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও রয়েছে। হাটবাজার থেকে গ্রামীণ এলাকা পর্যন্ত তারা অবহেলিত। গবেষণার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, একটি চায়ের দোকান সাঁওতালদের জন্য নির্দিষ্ট। তারা অন্য কোন স্টলে যেতে পারে না; চায়ের কাপ, পানির গ্লাস ইত্যাদি অন্যান্য সম্প্রদায়ের থেকে সাঁওতালদের জন্য পৃথক রাখা হয়েছে। এমনকি তারা দোকানের সমস্ত পাত্র ধরতে বা স্পর্শ করার অনুমতিও পায় না।

এটাও জানা যায় যে, যখন সাঁওতালরা উচ্চ-মধ্যবিত্তদের জমিতে কৃষি কাজ করে, সেসব  হিন্দু-মুসলমানরা কৃষি কাজের সময় সাঁওতালদের খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে খাবারগুলি পৃথক পাত্রে পরিবেশন করে; বিশেষত কলা পাতায় পরিবেশন করা হয়। ফলস্বরূপ, সাঁওতালরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে মিশতে পারে না। আবার সাঁওতালদের ভাষা-সংস্কৃতি অন্যদের চেয়ে পৃথক। ফলে সাঁওতালদের ভাষা সংস্কৃতি জনসাধারণের কাছে অজানা। এই বৈষম্যের কারণেও সাঁওতাল সমাজ ও সংস্কৃতি হারাতে বসেছে। এভাবে বিভিন্ন বৈষম্যের কারণে সাঁওতাল জীবন-সংস্কৃতি অবহেলিত হওয়ার ফলে তাদের শিকারব্যবস্থা তাদের খাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহের মধ্যদিয়ে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার সহায়ক হয়েছে।

সাঁওতালরা ভীষণ পরিশ্রমী হয়। দিনের শুরুতেই বেরিয়ে পড়ে কাজের জন্য। কেউ কাজ করে কৃষি জমিতে, কেউ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্যত্র। বর্তমানে সাঁওতালরা সমাজপেশাগত দিক থেকে মূলত দু’শ্রেণীতে বিভক্ত- কৃষক ও শ্রমিক। পূর্বে সমাজপেশাগত দিক থেকে কৃষক, শ্রমিক ও শিকারি এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। বনাঞ্চল বিলীন হওয়ায় শিকারী বৃত্তিরও বিলুপ্তি ঘটেছে। ফলে শিকারীরা পরিণত হয়েছে কৃষক-শ্রমিকে। তবে অবসর সময়ে অর্থাৎ যখন কৃষি কাজের চাপ থাকে না, তখন কেউ কেউ মাছ ধরে, পশুপাখি শিকার করে এবং গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রস্তুত করে সময় কাটায়।

এভাবে অন্যের জমিতে কাজ করে কিংবা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করে সংসার চানালো কষ্টকর হয়ে পড়ে। অর্থাভাবে মানবেতর জীবনযাপনেও তারা অভ্যস্ত। তবে আত্বসম্মানবোধ বড়ই প্রখর; ধনে গরিব হলেও মনের ঐশ্বর্যে যেন রাজাধিরাজ। কাজের অভাব, জরা-ব্যাধি, বার্ধক্যের ভয়াবহতায় তারা নিত্যই মরনের বিষাক্ত ছোবল প্রত্যক্ষ করে। তবুও তারা তাদের কর্মীর গৌরবদীপ্ত হাতকে ভিক্ষুকের কলঙ্কিত হাতে রূপান্তরিত করে না কখনো। এ কারণেই বাংলার হিন্দু-মুসলিম সমাজের ভিক্ষুক-সন্ন্যাসীদের হীনমন্যতা সাঁওতাল সমাজের দরিদ্র মানুষের হৃদয়বৃত্তিকে প্রভাবিত করতে পারেনি। ফলে কৃষিকাজের পাশাপাশি বনজঙ্গলে শিকারকে বেছে নিয়েছে স্বছল জীবনধারণের অন্যতম উপায় হিসবে। তাই সাঁওতালদের জীবনে শিকারব্যবস্থা আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করছে যা তাদের জীবনধারণের অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজই করে না, আদি সংস্কৃতির অংশও।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ফোকলোর বিভাগ।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

কমেন্টস