হেফাজতের আনন্দে ব্যথিত নই, ব্যথিত একজন জাফর ইকবালের জন্য!

প্রকাশঃ মার্চ ১২, ২০১৮

আরিফ চৌধুরী শুভ।।

‘কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি দেওয়ায় লাখ লাখ শিক্ষার্থীর চাকরি পাবে। এর মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই,’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের দ্বিমত করবেন আমার মতো অনেকেই। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম সার্টিফিকেট পেয়েছে। উচ্চ বেতনে সরকারি চাকুরি পেয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে হেফাজতের প্রতি এমন সহানুভূতি কেবল সরকারই দেখাতে পারে। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীকে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রথম অংশটি প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় অংশটি প্রমাণ করবে কে? পিছিয়ে থাকা একটি জনপদকে টেনে তোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন মাত্র। এটি অব্যাহত থাকা দরকার। যদিও অনেকেই সমালোচনা করে বলছি, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি আওয়ামী লীগের ভোট বাড়ানোরই একটি কৌশল। এই কৌশল কতটা সফল হবে তার জন্যে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সমালোচকদের।

আবার অনেকেই বলেছেন সরকার হেফাজতকে সুবিধা দিয়ে খাল কেটে কুমির আনার ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু আমার মতে কুমির যদি খাল কাটার আগেই লুকিয়ে থাকে, তাহলে সরকারেরই বা করার কি। আমাদের নিউরণে এমন ভাবনার জন্যেও কিন্তু বিভিন্নভাবে মাওলানারাই দায়ী। কিন্তু কিভাবে?

একাত্তরে পাকিস্তানীরা যখন কাপড় তুলে হিন্দু না মুসলামান এই সরল অংকে হিন্দু নিধন চালাচ্ছিলো, তখনও ৯০ শতাংশ মাওলানা বলেছে, পাকিস্থান আমাদের জাতি ভাই, পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিধর্মীদের বিতাড়িত করে ইসলাম রক্ষা করতে এসেছে তারা। পাকিস্তানীরা আমাদের মারবে কেন? তাদের সাহায্য করা আমাদের ইমানী দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু যখন গণহারে বাঙালি নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা শুরু করেছে জাতি ভাই পাকিরা, পালাবদলে মাওলানাদের বউ বাচ্চারাও ধর্ষণের মুখোমুখি হলেন, ঠিক তখনই টনক নড়েছে অনেক মাওলানার। সব মাওলানাদের চোখে পাকিস্তানিদের এমন নির্মম অত্যাচার সহ্য না হলেও তখন যেসকল মাওলানারা প্রতিবাদ করেছেন জাতি ভাইদের, তাদেরও বাঁচিয়ে রাখেনি পাকিরা। ততদিনে মাওলানাদের আর কিছুই করার ছিল না। কুমিরতো জলে, স্থলে, আকাশে পাতালে তারাই ঢুকিয়েছেন ধর্ম রক্ষার অযুহাতে। বোকামিটা কি মাওলানারা তখন করেননি? খেসারততো তাদের দিতেই হবে।

মাওলানাদের ধারণাই ছিলো না স্বশস্ত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে অপ্রশিক্ষিত অস্ত্রহীন বাঙালিরা যুদ্ধে জিতে যাবে। আমরা মরেছি, মেরেছি এবং ঠিকই জিতেছি। আশির দশক পর্যন্ত স্বাধীন দেশে কোন মাওলানাই গলা উঁচু করে কথা বলতে পারেনি। বিড়ালের মতো চুপ করে থাকা ঐ সকল মাওলানারা আশির দশকের পর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হতে নানামুখি কৌশল বাস্তবায়ন করেছেন। যদিও তাদের একটি বড় অংশ সরকার ও জনগণের কাছে জামায়াত, শিবির নামেই চিহ্নিত হয়েছে। বাকি অংশ হলো সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট আজকের হেফাজতে ইসলাম। যদিও আমরা বিভিন্ন সমীকরণে এই হিসাবকে গুলিয়ে ফেলি। বোকার মতো কখনো ‘এ’ দল আবার কখনো ‘বি’ দলের ভোটের হাতিয়ারে লালিত পালিত হয়ে জামায়াত একসময় একটি আত্মঘাতী, অপশক্তি ও অপরাজনীতি চর্চার দলে পরিণত হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গবাসীর নিকট। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিচার করা হচ্ছে জামায়েতের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের।

তবুও আতঙ্ক কাটছে না আমাদের মনের। আজ যে হেফাজতকে সমর্থন দিয়ে সরকার শক্তিশালী ও অলঙ্কিত আসনে বসাচ্ছেন, এই হেফাজাত কি একদিন জামায়েতের মতো আত্মঘাতী ও অপশক্তির দলে পরিণত হবে? এমন চিন্তা থেকেই অনেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, হেফাজতকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে খাল কেটে স্বাধীন ভূমিতে কুমির আনছে সরকার।

একাত্তরে বুক ফুলিয়ে চলা, গনিমতের মাল বলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা মাওলানা আর তাদের উত্তরসূরিরা আজও বিশ্বাস করে না আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আমাদের শহিদদের ত্যাগকে। তারা শহিদ মিনার আর স্মৃতিসৌধসহ শহিদদের স্মরণে নির্মিত সকল ভাষ্কার্যকে তুলনা করেন মূর্তির সাথে। আমাদের নির্যাতিত সম্ভ্রম হারানো নারীদের এই মাওলানারাই তুলনা করে তেঁতুলের সাথে।

খুবই দু:খ হয় তখনই, যখন দেখি এই রাষ্ট্র তাদেরই আজ দায়িত্ব নিচ্ছে রাজনীতির স্বার্থে। একাত্তরে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি বীর সন্তান মরেছে সরাসরি পাকিস্থানীদের হাতে, আর আমরা মরে যাচ্ছি পাকিদের দোসরদের হাতে। আমরা রক্তাক্ত হচ্ছি একজন জাফর ইকবালের মতো। জঙ্গি ফয়জুরের ছুরকাঘাতে ড. জাফর ইকবাল কতটুকু ব্যথা পেয়েছেন জানি না, তবে ৪৭ বছরের এই বাংলাদেশের হৃদয় ব্যথিত হয়েছে অপশক্তি নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণে আজও ব্যর্থ বলে।

আজও আমাদের বোনেরা প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানির শীকার হচ্ছেন জয় বাংলা স্লোগানধারী কতিপয় কুলাঙ্গারদের লালসার কারণে। আমার বোনদের স্পর্শকাতর স্থান ধরে আনন্দোলন থেকে গ্রেফতার করছে স্বাধীন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্বরত পুলিশ। কে দেবে কাকে সমবেদনা? কার কাছে জানাবো সমবেদনার আবেদন?

আমি ক্ষমা চাচ্ছি ড. জাফর ইকবালের কাছে। আমি ক্ষমা চাচ্ছি বাংলামোটরে ৭ মার্চ জয় বাংলা স্লোগানের কবলে পড়ে নষ্ট রাজনীতির উশৃঙ্খল তরুণদের হাতে শ্লীলতাহানির শিকার কলেজ ছাত্রীর কাছে। আমি ক্ষমা চাচ্ছি সরকারি চাকুরিতে বয়স ৩৫ করার আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিগ্রহের শিকার বোনটির কাছে। আমরা আপনাদের স্বপ্নের বাংলাদেশটি আজও দিতে পারিনি বলে দু:খ প্রকাশ করছি।

আজ আমাদের দেখতে হচ্ছে শুধু সরকারি চাকুরিতে আবেদনের বয়স বাড়ানোর জন্যে এই রাষ্ট্রে কেউ কেউ আন্দোলন করে গ্রেফতার ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। বিপরীতে রাষ্ট্র কাউকে দলবল নিয়ে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করার সুযোগ দিচ্ছে। সত্যি এই দৃশ্যের জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। মুক্তিযোদ্ধারা কি প্রস্তুত ছিলেন?

আমি হেফাজতকে বলবো চাকুরি আর সার্টিফিকেটের আনন্দে আপনারা পেটে মেদ জমাবেন না। হেলিকাপ্টারে ছড়ে মোটা বাণ্ডেলের জন্যে পুঁথিগত ওয়াজ বন্ধ করে শুদ্ধতার বাণী চর্চা করুন। দেশের জন্যে, মানবতার জন্যে কাজ করুন। নারীকে তেঁতুলের সাথে তুলনা বন্ধ করুন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের দিয়ে গাড়ি থামিয়ে, বাসের ভীড় ঠেলে, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে পাঠিয়ে ওয়াজের নামে চাঁদাবাজী বন্ধ করুন। চাকুরি পেয়ে দাম্ভিকতার সুরে গলাবাজি করবেন না। রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করে কাওমি শিক্ষার্থীদের আরো আধুনিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, আবিষ্কারক, কবি, সাহিত্যিক এমন কি স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করুন। মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে স্বীকার করুন। মনে রাখবেন, শুধু টুপি আর জুব্বা পরলেই যেমন মাওলানা হওয়া যায় না, তেমনি রাষ্ট্রের অনুগ্রহে উচ্চ বেতনে চাকুরি পেলেই আপনি যোগ্য হয়ে যাননি।

পরের ঘরে খাওয়া আর আল্লাহর ঘরে আযান দেওয়ার মধ্যে যদি দাম্ভিকতা থাকে, তাহলে এই দাম্ভিকতা থেকে আমি বঞ্চিত। কারণ আমিও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি কোন না কোন মাওলানার পেছনে। কিন্তু আমি গর্ববোধ করি এই ভেবে যে, আমার রক্তে একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার রক্ত। তিনি শুয়ে আছেন এদেশের মাটিতে।

রবীন্দ্রনাথ জাতীয় সঙ্গীত লেখেছেন বলে আপনারা পড়বেন না কেন? রবীন্দনাথের জাতীয় সঙ্গীতে স্বদেশ প্রেমের যে আবেগ ভালোবাসা ও মমতা আছে, পারলে সেই রকম আবেগ ও মমতা দিয়ে একটি সঙ্গীত লিখে রাষ্ট্রের কাছে জমা দিন।

উচ্চ শিক্ষিত সাড়ে ২৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটদের ন্যূনতম নলেজও কওমির একতরপা জ্ঞান অন্বেষণকারী শিক্ষার্থীরা রাখে না।এর ভুরি ভুরি প্রমাণ আপনাদের কাছেই আছে। তবুও তারা সমামানের। আবেগ প্রবণ বাঙালি সমাজে যে সম্মান এই আলেম সমাজ আজও পাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কাছে, তাও পেতো না যদি সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী আপনাদের মতো হতো। আমরা আলেমদের সম্মানের জায়গাটা দিতে চাই। সরকার চাকুরি ও সার্টিফিকেট দিয়ে আলেমদের সম্মানিত করেছে। এবার আলেমরাই ভেবে দেখবেন এই সম্মান কিভাবে ধরে রাখবেন।

শুধু ওস্তাদের কথায় রাস্তা দখল করবেন না। যে রাষ্ট্র আজ আলেমদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকারি চাকুরির ব্যবস্থা করছে, সেই রাষ্ট্রের জন্যে আলেমরা সম্পদে পরিণত হবে, মাথা ব্যথার কারণ নয়।

লেখক: সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন।

কমেন্টস