ধর্মীয় দৃষ্টিতে মাতৃভাষা

প্রকাশঃ মার্চ ৯, ২০১৮

ভাষাসৈনিক লোকমান আহমদ আমীম-

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তথা ৮ ফাল্গুন ভাষা আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দেয়ার নানা কারণের মধ্যে অন্যতম ছিলো বাংলা ভাষা নাকি কাফেরের ভাষা। সুতরাং এ ভাষা খাঁটি মুসলমানদের জন্য নয়। অথচ বৈচিত্রময় সৃষ্টি, বৈচিত্রময় মানুষ এবং বৈচিত্রময় ভাষা আল্লাহরই নির্দশন। প্রকৃতপক্ষে ভাষা হল মানুষের ভাব প্রকাশের অন্যতম প্রধান বাহন। মানব সভ্যতার আদিম ও অন্যতম প্রয়োজনীয় বিষয় হল ভাষা।

মানুষের মনের ভাব আদান-প্রদান এবং সামাজিক ক্রিয়া কর্মের প্রয়োজনে ভাষা। মানুষের ভাবের আদান-প্রদান এবং সামাজিক ক্রিয়া কর্মের প্রয়োজনে ভাষার উৎপত্তি। এ ভাব বিনিময় বাহন রাতারাতি গড়ে উঠেনি। দিন, মাস, বছর আর শতাব্দী ধরে মানব সমাজের ক্রমবিকাশের পথ ধরে ভাষার সৃষ্টি। বাংলা ভাষায় লেখা হলেই যেমন কোন সাহিত্য ইসলাম হয় না বা ইসলামবিরোধী হয় না তেমনি প্রত্যেক ভাষা সম্পর্কেই সে কথা খাটে। বাংলা, উর্দু, হিন্দি সংস্কৃতি প্রভৃতি ভারতীয় উপমহাদেশীয় ভাষা। কিন্তু ভারতীয় বলেই তা ইসলামবিরোধী নয়। ইসলামী আদর্শ, আঞ্চলিকতা, ভাষা কিংবা ভাবের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়। বাংলা-ভারত আল্লাহর সৃষ্টির বাহিরে নয়। প্রত্যেক ভাষাতেই ইসলাম সংগত ও ইসলামবিরোধী ভাবধারা প্রচার করা যায় বিচিত্র ভাষা সৃষ্টির মাধ্যমেও বিশ্ব নিরন্তার প্রকাশ ঘটে। এক সময় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা বাংলা ভাষাকে অনার্য সংশ্রব দূষিত, গ্রাম্য ও ইতরীয় ভাষা বলে এ ভাষার গ্রন্থ রচনা পাপজনক মনে করতেন।

তারা বলতেন ‘অষ্টাদশ পুরান অথবা রামরচিত যে ব্যক্তি বাংলা ভাষায় শ্রবণ করবে, সে রৌরব নামক নরাকগামী হবে’। ১৮২৫-৩০ সনের দিকে রাজা রামমোহন রায়কে বাংলা ভাষায় উপনিষদের অনুবাদ করায় পণ্ডিত সমাজের নিকট লাঞ্ছিত হতে হয়েছিলো। শুধু সমাজ নয়, তখনকার দিনে ইংরেজি শিক্ষিত নব্য হিন্দুরাও বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞার চোখে দেখতেন। গৌড়ের পাঠান শাসকদের উৎসাহে রামায়ন ও মহাভারত প্রথম বঙ্গানুবাদ হয়। সেজন্য কৃত্তিবাস, কাশীদাসকে হিন্দু পণ্ডিতদের নিকট ‘নাটকীয়’ বলে আখ্যালাপ করেছিলো। ভাই গরীস চন্দ্র সেন প্রথমত কোরআনের আংশিক বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে ১৮৮১-৮৩ সালে। এ অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হলে একজন গোঁড়া মুসলমান উক্তি করেন, ‘জনৈক কাফের আমাদের কোরান পাক অনুবাদ করেছে, হাতের কাছে পেলে তার গর্দান নিতাম’। এই উক্তির মাধ্যেমে বক্তার কোন ধর্ম বোধ প্রকাশ পায়নি বরং অজ্ঞতাবশত ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রকাশ পেয়েছে।

ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের সাথে সাথে মুসলিম মনীষীরা উক্ত চিন্তাধারা পরিবর্তনে ব্রতী হন। প্রত্যেকের কাছে তার মাতৃভাষা অত্যন্ত প্রিয়। প্রায় হাজার বছর ধরে বাংলাদেশীরা বাংলা ভাষায় কথা বলে আসছে। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য মুসলিম আমির ও সুলতানদের সহায়তায় সমৃদ্ধ হয়। প্রসৃদ্ধ দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তাঁর ‘আলমুকাদ্দামা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন “সমগ্র মানব বা বিশেষ কোন জাতীয় সভ্যতা, আচার ব্যবহার, জীবিকা ও তদোপকরাণাদি একটা বিশেষ ভঙ্গিতে চিরকালের জন্য অপরিবর্তীত হয়ে থাকে না এবং তা কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিত্য নতুনভাবে ভঙ্গিতে প্রকাশিত বির্বতিত হয়ে থাকে। কালের বুকে যে শুধু ব্যক্তি, নগর, রাজ্য, যমানারই পরিবর্তন সাধিত হয় তা নয়, ভৌগলিক পরিবর্তন ও সংগঠিত হয়ে থাকে মুমিনদের পক্ষে সৃষ্টি রহস্য বুঝে নেবার এক বিরাট ইঙ্গিত”। প্রকৃতি এই অমোঘ বিধান অনুযায়ী অখণ্ড ভারত দ্বিখণ্ডিত হলো। প্রসিদ্ধ মুসলিম ঐতিহাসিক ফিরিশতা মতে, হাজার বছর আগে হযরত নুহু (আঃ) এর পূত্র হাম তোদীয় পূত্র হিন্দের নাম অনুসারে ভারতীয় উপমহাদেশের নাম “ হিন্দ” হিসেবে খ্যাত হয়। পরবর্তীকালে হিন্দুস্থান হিসেবে তা সুপরিচিত হয়। সিন্দুদের নাম ‘হিন্দ’ শব্দ হতে উৎপত্তি লাভ করে। এককালে হিন্দের অধিবাসীকেই ‘হিন্দু’ বলা হত। পরবর্তীকালে ভৌগলিক পরিচিত সম্প্রদায় বিশেষে ধর্মীয় পরিচিতি হিসেবে খ্যাত লাভ করে।

ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় জানা যায়, নূহু (আঃ) অধঃস্তন বংশধর জনৈকের নাম ছিল বঙ্গ। তার নাম অনুসারে আমাদের এ দেশের নামকরণ করা হয় বঙ্গদেশ। পরে তাই বাংলাদেশের নামে পরিচিত। সুতরাং এদেশের অধিবাসী জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের ভৌগলিক পরিচিতি হিসেবে বাঙালি বা বাংলাদেশী। ধর্মীয় পরিচয়ে আমরা কেউ মুসলমান কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ আবার কেউ খ্রিস্টান। ইসলামের প্রভাব সাহিত্যে যেমন অতি বাস্তব রূপরেখা নির্দশ করে তদ্রুপ মুসলমান নিরপেক্ষ শব্দ ভাণ্ডারে সাহিত্যে ভাষা সমৃদ্ধ। ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা করলে ভাষা ত্বত্তের প্রেক্ষিতে জয় বাংলা ও জিন্দাবাদ ধ্বনিতে কোন পার্থক্য নেই। ‘জিন্দাবাদ’ হচ্ছে ফারসি আর ‘জয় বাংলা’ হলো হিন্দি শব্দ। এ দুটির মূল ভাষা এক ও অভিন্ন ভাষাত্বাত্ত্বিকদের মতে যে মূল ভাষা বর্তমান সোভিয়েত রাশিয়ার ভলগা ও পার্শ্ববর্তী কাসপিয়ান সাগর উপকূলের প্রাচীন অধিবাসীদের ভাষা। তাদের একটি দল ইরানে এসে বসবাস শুরু করে। সেখানে তাদের ভাষা থেকে পাহলবি ভাষা। অমর কবি ফেরদৌসি পাহলবি ভাষায় ‘শাহনামা’ মহাগ্রন্থ লিখেছিলেন। এ পাহলবি ভাষার রূপ হচ্ছে ফারসি ভাষা। এককালে পাহলবি বা ফারসি ভাষায় ইরানের অগ্নিপূজারীরা কথা বলতো এখন মুসলমানেরা কথা বলে। অনুরুপ ভলগা এলাকায় অধিবাসীদের একটি দল প্রাচিন ভারতে এসে বসতি স্থাপন করে। তাদের মুখের ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর মূল ভাব থেকে এখানে অনেক ভাষা জন্ম নেয়। এসবের মধ্যে হিন্দিও একটি ভাষা। প্রথমদিকে এ ভাষায় পশ্চিম ভারতের একটি বিশেষ এলাকার অধিবাসীরা কথা বলতো। এখন হিন্দি ও ইংরেজি ভারতের রাষ্ট্র ভাষা। সেখানকার হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রয়োজনে হিন্দি ভাষায় কথা বলে তাই বলে এ জন্য কারো ধর্মচ্যুতি ঘটেনি। আরবি ফৎহে মক্কাকে আমার বাংলায় ‘মক্কা বিজয়’ বা জয় মক্কা বলে প্রকাশ করি।

এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে ‘জয়’ শব্দ ব্যবহার করি। যেমন জয় লাভ, জয়যুক্ত প্রভৃতি। এখানে ‘জয়’ শব্দ ব্যবহারে আমরা কোন আপত্তি করি না। কিন্তু জয়ের সাথে বাংলা যুক্ত করলেই যতসব আপত্তি ওঠে। অনেকে ইসলামিকতার ধোঁয়া তোলা হয়। বাস্তবে এক ভাষায় কথা বলা যা প্রচলিত তা অন্য ভাষায় হয়ত অপ্রচলিত। এমনকি পবিত্র কোরয়ানেও অনেক অনারবীয় হিব্রু শব্দ রয়েছে। যেমন- ইব্রাহিম, ইয়াকুব, ইসহাক, ইউনুস, ইউসুফ (আ.) প্রভৃতি।

ভাষাগত আধিপত্য বয়া অন্য যে কোন রকমের সঙ্কীর্ণতা ইসলামের প্রকৃত অগ্রগতির পথে ক্ষতিকর। পোমকস বয়া বুলগেরীয় মুসলমানদের উপর জোর করে তুর্কি ভাষা চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টি অটোমন বয়া ওসমানী সাম্রাজ্যের পতনের উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের জাতীয় ও মাতৃভাষা বাংলা। পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপের মুখে দেশের ঐতিহ্যবাহী নাম ও ভাষা পরিবর্তন করা হয়েছিল। বাংলাদেশের উপর অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার পরিণতিতে এ দেশের মানচিত্রই পাল্টে যায়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরব দেশে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে আরবের ঐতিহ্যবাহী ‘আরব’ নামটি এবং নিজ মাতৃভাষা ‘আরবীয়’ কোন পরিবর্তন সাধন করেননি। এমনকি বদর যুদ্ধে বন্দীদের মধ্যে যারা মুক্তিপণ পরিশোধ করতে অপারগ ছিল সে সমস্ত অমুসলিম বন্দীদের প্রত্যেককে দশ দশ জন মুসলিম বালক-বালিকাকে আরবি ভাষা শিক্ষা দানের বিনিময়ে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন। এভাবে সব বন্দী মুক্তি পেল। অমুসলিমদের ভাষা তাদের দ্বারা মুসলমানদের শিক্ষা দানের দরুন ইসলামের ভরাডুবি হয়নি বরং নিরক্ষরতা দূর হয়েছে। অথচ অসাধু মুসলিম জাহান নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবে আছে। ইসলাম উদারতার ধর্ম, সহনশীলতার ধর্ম, পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃতপক্ষে মানুষ কতগুলো মৌলিক অধিকার বয়া স্বাধীনতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। যেমন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ইত্যাদি। কাজেই কোন ভাষাকে সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ ইসলাম ধর্মে নেই।

আল্লাহ তা’লা ইরশাদ করেন, ‘আকাশ-জমিন সৃষ্টির মধ্য এবং তোমাদের বিভিন্ন রঙ ও ভাষার ভিন্নতার মধ্যে বিজ্ঞানের জন্য আল্লাহর নিদর্শনের খোরাক রয়েছে, ‘(সূরা আর রোম)। কুরআনের এই আয়াতে ভাষার বিভিন্নতাকে আল্লাহ তা’লার নিদর্শন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এদেশের মানুষ তিক্ত ও দুঃসময় অভিজ্ঞতা লাভ করে ভাষার প্রশ্নে। কারণ এ দেশবাসীর ভাষা হাজার বছরের সুখ-দুঃখের ভাষা বাংলাকে চিণ্হিত করা হলো সাম্প্রদায়িক ও বিজাতীয় ভাষা হিসেবে। এভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য অপব্যবহার করা হয়। সে সময় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ধর্ম ও ভাষাকে একই সারিতে এনে মূল্যায়ন করে পবিত্র ইসলামকে সঙ্কীর্ণ ধর্মমত হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা চালায়। বিগত দুটি মহাযুদ্ধে পৃথিবীর বুকে ঝড় বয়ে দিয়ে গেল। এছাড়া ১৯৪৭ ওয়ে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক উত্থান পতন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধনী ও নির্ধন জনসাধারণের মধ্যে আকাশচুম্বি পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। এমনকি নগর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে বহু দূরে পল্লীর শান্ত স্নিগ্ধ ও অনাড়ম্বর জীবনকেও অস্থির করে তুলেছে। জীবন ধারণের নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যেও অগ্নিমূল্য সমাজে সাধারণস্তরের লোকের সংসারে করেছে দূর্বিসহ, জীবন যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত, অনেককে পরাজিত। জীবনপাত করে যারা কঠিন মাটির বুকে শষ্য ফলাচ্ছে, সুখ-সৌন্দর্য ও বিলাশে মাল-মশলা মাথায় বৈইছে যারা, তারা আজ অভাবের তাড়নায় মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এই নির্বাক জাতির মুখে ভাষা ফুটাবে কে? বাংলা ভাষা পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি লোকের ভাষা। পৃথিবীর ১৫০টি প্রতিষ্ঠিত ভাষার মধ্যে ৮ম স্থানীয় ভাষা। মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে যারা প্রাণ বিসর্জন দেন তাদেরকে বলা হয় শহীদ। বায়ান্নোর মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাঙালির সত্ত্বাকে ও মাতৃভাষার মর্যাদা দিতে গিয়ে যারা আত্মদান করলেন তারাও শহীদ। সে সমস্ত শহীদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান প্রদর্শন তখনি হবে যখন আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে পারবো।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক; ঢাকা রেসিডেনসিয়েল মডেল কলেজ ও খতীব, মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ, ঢাকা।

কমেন্টস