সমাজের ভেদাভেদেই ‘মানুষ’ পুরুষ কিংবা নারী হয়

প্রকাশঃ মার্চ ৮, ২০১৮

মৃত্তিকা সেন গুপ্তা।।

আজ ৮ ই মার্চ ‘বিশ্ব নারী দিবস’। হঠাৎ করেই আজ সবাই আলাদাভাবে দিনটা অনুভব করতে শুরু করেছে। ভাবখানা এমন! যেনো সূর্য আজ পশ্চিম দিক থেকে উঠেছে! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আজ প্লাবিত হবে ‘Happy Women’s Day’ হ্যাশট্যাগে।সত্যি করে বলুনতো, আসলেই কি হ্যাপি হবার মতো কিছু হচ্ছে আমাদের চারপাশে? আজকের দিনটার তাৎপর্য আমরা রোজ কিভাবে পালন করে থাকি তা দেখে আসি চলুন!

যখন একটা পুত্র সন্তান হয়,তার বিছানা থেকে শুরু করে পড়ার টেবিল এমনকি দেয়ালের রং সবকিছু হবে নীল! কিন্তু কন্যা সন্তানের কথা আসলে, তখন সব হতে হবে গোলাপি। কেনো? এর পেছনে যুক্তিটা কি? একটা বাচ্চা মেয়ের জন্মদিনের উপহার কেনো সবসময় খেলনা হিসেবে রান্নাবান্নার সেট দেয়া হয়? যেখানে একটা ছেলেকে দেয়া হয় ‘রিমোট কন্ট্রোলড’ গাড়ি!! আমরা কি তাহলে অবচেতন মনেই আমাদের ছোট্ট বাচ্চা মেয়েগুলোকে শেখাচ্ছিনা যে তোমার জায়গাটা কিন্তু রান্নাঘরেই!

কেনো একটা ছেলে কাঁদলে তাকে বলা হয় মেয়েদের মতো কাঁদবেনা। তাহলে কি চোখের জল লিঙ্গভেদে পরা উচিত? নাকি চোখের জল ফেলাটা শুধু মেয়েদের কাজ? কেনো বাড়িতে অতিথি এলে সবসময় ঘরের মেয়েকেই বলতে হবে ‘এক কাপ চা করে নিয়ে আয় তো মা’! অথচ ঘরের ছেলেটা হয়তো সামনেই বসা থাকে, তাকেতো কখনো অনুরোধ করা হয়না যে ‘ যা বাবা চা করে নিয়ে আয়তো’! কেনো?একটা মেয়ে হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে বসতে গেলেই শুনতে হয়, ‘ঠিক করে বসো’। মেয়েরা এভাবে বসে না। কেনো? নিজের সুবিধে মতো আরাম করে পা ছড়িয়ে বসা কি শুধু পুরুষের অধিকার?

হিন্দুধর্ম মতে, ছেলের বিয়ের সময় ছেলের মা উপস্থিত থাকাটা নাকি ছেলের জন্য অমঙ্গলজনক! ভাবুন কতোটা অসভ্য আর অপমানজনক নিয়ম এটা! যে মা পৃথিবীর আলো দেখালো, সেই মা কিভাবে সন্তানের শুভদিনের সাক্ষী হলে তা তার অমঙ্গলের কারণ হতে পারে? অথচ এই ভণ্ড নিয়মটা আজো ঘরে ঘরে পালিত হচ্ছে!! কন্যা দান কি জিনিস আবার? কন্যাকে দান কেন করতে হবে? আমরা কি পণ্যদ্রব্য নাকি, যে বিয়েতে দান করতে হবে? কেনো সন্তানকে সবসময় বাবার পদবী বহন করতে হবে? মার পদবী কেনো নয়? মেয়েরা কেনো মৃত বাবা-মায়ের মুখাগ্নি করতে পারবেনা? বাবা-মায়ের শেষকৃত্যের কাজগুলো করা থেকে নিষিদ্ধ কেনো ঘোষিত হবে? বাবা-মা কি শুধুই আমার ভাই বা দাদার? আমার নয়? ছেলে হাফপ্যান্ট পরলে কুল! মেয়ে হাফপ্যান্ট পরলে যৌন আবেদনময়ী। এটা কি পুরুষের কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নয়? মেয়ে ধর্ষিত হলে সব মেয়েরই দোষ। মেয়ের গায়ে লাগে তখন ‘বাজে মেয়ের’ ট্যাগ।আর ছেলে বিন্দাস ঘুরে ফিরে বেড়ায়! এবং সমাজ এচিন্তার সাথেই আরামছে বেড়ে উঠছে। তাই মেয়ে বড় হলে শেখানো হয় সাবধানে চলতে,আর ছেলেকে শেখানো হয় রাস্তায় প্রস্রাব করতে!সত্য কথা বলতে পুরো পৃথিবীটাই চলে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ করে! নারী দিবস পালনের সার্থকতা আজ কতুটুকু তা উপরের বক্তব্য থেকে কিছুটা হলেও বুঝে গেছেন আশা করি!

২০১৮ সাল চলছে, এখনো মেয়েরা রাস্তায় নিরাপদ ভাবে চলতে পারে না।কর্মস্থলে নিরাপত্তা নেই। গ্রামেগঞ্জে,শহরে ধর্ষণের কোনো থামাথামি নেই! তাও ৮ ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস পালিত হচ্ছে! এই দিনটা যে পালিত হচ্ছে তার কিছু নীতিমালা রয়েছে।যার কোনোটাই বাস্তবিক জীবনে আপনারা মানতে চান না এবং আমাদেরও সুযোগ না দিয়ে বরং কোণঠাসা করে রাখতে চান। দৃষ্টিভঙ্গি এখনো অনেক বদলানো বাকি আপনাদের।নইলে আমাদের সামনে আগানো কষ্টকর। একচেটিয়া ভাবে বেশিদিন চলতে পারবেন না। আপনার জীবনে কোনো না কোনো নারী সে হতে পারে আপনার মা, বোন, দিদি, প্রেমিকা, স্ত্রী, কন্যা এরা ছাড়া আপনার জীবনটা ভাবুন তো একবার? নিরস মরুভূমির মতো লাগছে তো? আপনার যেমন কখনো মায়ের কোলে মাথা রেখে,প্রেমিকা/স্ত্রীর হাত ধরে বা ছোট্ট কন্যা সন্তানের ছোটোছোটো আঙ্গুলগুলো ধরে বাঁচার আলাদা স্বাদ নিতে হয়,আমাদেরও আপনাদের সাহায্য ছাড়া চলা মুশকিল! আপনাদের পেছনে না হেঁটে যাতে পাশাপাশি হাঁটতে পারি সে পরিবেশটা রাখতে চেষ্টা করুন! একমাত্র নারী দিবস পালনের সার্থকতা সেদিনই পূরণ হবে, এর আগে নয়। বিশ্ব নারী দিবসের শুভেচ্ছা সকল নারী এবং পুরুষকে!

কমেন্টস