পিতৃতান্ত্রিকতার প্রভাব থেকে ক্ষমতাবান নারীরাও মুক্ত নন

প্রকাশঃ মার্চ ৮, ২০১৮

আকরামুল হক।।

সারা বছর জুড়েই পত্রিকার পাতায় নারীর প্রতি সহিংসতা দেখতে দেখতে গা সওয়া হয়ে পাঠক সংবাদটি ভাল করে পড়েন বলে মনে হয় না। একটু চোখ বুলিয়েই সংবাদটি ছেড়ে যান, অন্য সংবাদের দিকে। এতে করে এক ধরণের নির্লিপ্ততা প্রকাশ পেলেও সেটি নিজের কাছেই থেকে যায়। এ সমস্ত সংবাদ যখন প্রকাশ হয় তখন রাষ্ট্রের প্রশাসন ও কর্তাব্যক্তিরা কি ভাবেন? প্রথমেই রাষ্ট্রের পুলিশ ভ্রু কুঁচকে একগাদা প্রশ্ন ছুঁড়েন সহিংসতার শিকার নারী ও তাঁর পরিবারটির দিকে। একইসাথে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাও জনপ্রতিনিধিদের। বেশীভাগ ক্ষেত্রেই এ সমস্ত নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা সহিংসতার শিকার নারীর প্রতি সদয় না হয়ে, নির্যাতকের পক্ষাবলাম্বন করেন।

দেশে ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুদের অবস্থা ভয়াবহ। ধর্ষিত নারী ও শিশুকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেতে যে পরিমাণ হয়রানির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা বলা কহতব্য না। দেশে গোটা দুয়েক ঘটনা গণমাধ্যমে ও স্যোশাল মিডিয়ায় আলোড়ন তুললে প্রশাসন ও পুলিশ একটু নড়েচড়ে বসে। নিম্ন আদালতে হয়তো রায় হয়ে যায়, উচ্চ আদালতে শুরু হয় কাল ক্ষেপণের খেলা। আসামীরা যদি প্রভাবশালী হয় তাহলে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুটির জীবন ভয়াবহ মাত্রায় নরক বানিয়ে ছাড়ে নির্যাতকরা।

দেশের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে এ মন্ত্রণালয় ধর্ষকদের পক্ষে আইন বানিয়েছে, ধর্ষিত নারী ও শিশুকে বিয়ে করতে পারবে ধর্ষকরা। খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজে এ আইনের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। সংসদে এতজন নারী প্রতিনিধি থাকার পরেও, যেখানে প্রধানম্নত্রী নারী, স্পীকার নারী, বিরোধীদলীয় প্রধান নারী সেখানে পিতৃতান্ত্রিকতার পক্ষে বাজে আইনটি পাশ হয়েছে। বিয়ের বয়স কমানোর জন্য দেশে কোন আন্দোলন হয়নি, কেউ কোন জোরালো দাবিও করেনি তাও আইনটি পাশ করা হয়েছে, বিশেষ বিবেচনার ফাঁদে ফেলে কমানো হয়েছে নারীদের বিয়ের বয়স।

রাজনীতিকদের কাজে কর্মে ভূতের মত পিছন দিকে হাঁটার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাজনীতিকদের মধ্যে এখন ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা সরাসরি নারী স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিব্ধ করছে। সরকারি হিসাবেই দেশে নারী নির্যাতন বেড়েছে শতকরা আশি ভাগেরও বেশী নারী পারিবারিক বলয়ে নির্যাতিত হন, তাও আবার স্বামীর হাতেই নির্যাতিত হন বেশীরভাগ। জরিপের এ হাল দেখেই বোঝা যায় মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নির্যাতনের শিকার নারীদের অবস্থা যতটা প্রকাশিত হচ্ছে সার্বিক অবস্থা তার চেয়েও ভয়াবহ।

পরিবারের কিশোরী মেয়েটি নিজ পরিবারেই প্রথমে যৌন হয়রানির শিকারে পরিণত হয়। নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কর্মজীবী নারীদেরও নেই, পরিবারের পিছনে টাকা ব্যয় করতেও কর্মজীবী নারীদের স্বামীদের ইচ্ছে অনিচ্ছার উপরই নির্ভর করতে হয়। দেশের মাঠে ঘাটে ও নানান শিল্পে একই মানের কাজ করেও নারীরা সম মজুরী হাতে পান না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ৪ হাজার ৫৩৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ নির্যাতনের ভয়াবহ দিক হলো শিশু ও কিশোরীদের উপর দলগত ধর্ষণ।

গত বছর প্রায় শতাধিক ঘটনা ঘটেছে দলগত ধর্ষণের নির্বাচন উত্তর সহিংসতায়ও আমারা দলগত ধর্ষণ দেখেছি বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পরে। দেশে না্রীদের প্রতি সহংসতার প্রধান কারণ হলো রাজনীতিতে চরম পিতৃতান্ত্রিকতার প্রভাব। দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রে নারীরা বসে থাকলেও, নিজেরা পিতৃতান্ত্রিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত নন। হাজার বছরের সংস্কার এ সমস্ত নারী রাজনীতিবিদরা বয়ে চলেছেন পিতৃতান্ত্রিকতার প্রতিভু হিসাবে। এর সাথে যোগ হয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের অসংবেদনশীলতা ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব।

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হলে নারীদেরই সর্বাগ্রে লড়াইয়ে নামতে হবে। বিশেষ করে পরিবারের ছেলে শিশুটির সাথে নিজ পরিবারের মেয়ে শিশুটির সম বন্টনের নীতি প্রয়োগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে জোর দিয়েই বলতে চাই কর্মজীবি নারীরা নিজেদের অর্জিত সম্পদ ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে সমবন্টনের পদক্ষেপ নেবেন। যেহেতু আপনারা সম্পদ বন্টনে পারিবারিক পর্যায়েই ধর্মীয় উৎপীড়নের শিকার, সেহেতু এ অচলায়তন ভাঙতে আপনাদেরই সবার আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। পুরুষদের প্রতি আবেদন রইলো নারী দিবসে নিজ মেয়েটিকে নিয়ে সেলফি তুলে স্যোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা সময় প্রতিজ্ঞায় নামুন আপনার অর্জিত সম্পদ কন্যা ও ছেলেতে সম বন্টন হবে। সম্পদের সমবন্টনের নীতিই নারীর প্রতি সহিংসতা কমাবে, সম্পদ নারীর ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসাবেও কাজ করবে। নারীর হাত ধরেই উৎপাদন ও বন্টন সমৃব্ধশালী হোক।

কমেন্টস