প্রশ্নপত্রফাঁসে বেকুবের আনন্দবিলাস

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৮

ফারুক আহমাদ আরিফ-

দেশে দীর্ঘদিন যাবত যে বিষয়টি আলোচিত সমালোচিত হচ্ছে সেটি হচ্ছে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। ফাঁস প্রশ্নে পাশ করে অনেক শিক্ষার্থী নিজের জীবনে নিজেই দিচ্ছে বাঁশ। আর এতে দায়িত্বশীল মহলের গলায় পড়েছে লায়লন সুতার আঁশ।

একটি ঘটনা বলে শুরু করছি। ঘটনাটি আমার ছেলেবেলার। ছেলেবেলা বললেও ভুল হবে। কেননা তখনো আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আমার দাদা প্রাইমারি স্কুলের হেড মাস্টার। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থানা থেকে তিনি নিজে নিয়ে আসেন। স্কুলে আলাদা কোন অফিস না থাকায় সবকিছু দাদা নিজ ঘরে এনেই রাখেন। আমার আব্বা যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়েন তখন থেকে শুরু করে আমি নিজে যখন প্রাইমারিতে পড়ি এই দীর্ঘ সময়ে স্কুলের প্রশ্নপত্রের নিরাপদ স্থান ছিল দাদার কোঠা (ঘরের কামরা)র খোলা রেকে। কখনো দাদার টেবিলের উপর। কিন্তু কেউ কোনদিন সেই প্রশ্নপত্রে হাত দেয়া তো দূরে থাক সেদিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়ওনি।

আব্বা থেকে শুরু করে ৪ কাকা, ৪ ফুফু সবাই তাদের সময়ে নিজ নিজ ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে পড়াশুনায় এগিয়ে গেছে। আমাদের কারো মাথায় কখনো চিন্তা জাগেনি স্কুলের সেই প্রশ্নে হাত দেই। কিন্তু বাধ সাধলো শেষের দিকে। আমার সবচেয়ে ছোট কাকা ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তার বন্ধুরা তার সাথে বায়না ধরলো তুই তোর বাবার টেবিল থেকে প্রশ্নপত্র চুরি করে আনতে পারলে তোকে আমরা মনে করবো সত্যিই তুই সাহসী। কিন্তু তিনি কোনভাবেই রাজি না হওয়ায় নানা ধরনের কলা-কৌশলে তাকে রাজি করায়। ছোট কাকাও জীবনে নতুন একটা কিছু করার অদম্য উদ্যম নিয়ে নিজেকে বীর বানানোর জন্যে তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে দেন। তিনিও রাজি হয়ে গেলেন যেভাবেই হোক তার বন্ধুদের কাছে প্রমাণ করতে হবে সে সাহসী বীর (যদিও চুরি করে)।

যেই বুদ্ধি সেই কাজ। একদিন আলো-আধারি অর্থাৎ মাগরিবের নামাজের সময় সে প্রশ্নপত্র চুরির সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যায়। সাথে তাকে প্রহরা দেয় তার সেই সব গুণধর বন্ধুরা।

ঘর থেকে এক সেট প্রশ্নপত্র নিয়ে যখন কাকা ঘর থেকে বের হয়েছে এমনি সময় কাকতালীয়ভাবে দাদার মুখোমুখি পড়ে। দাদাকে দেখে ভো-দূর। হাতে তার প্রশ্নপত্র। দাদা এই দৃশ্য দেখে ঘরের সামনে পড়ে থাকা আছাড়হীন দা তার দিকে ছুড়ে মারে। সামান্য একটু জন্যে কাকার পায়ের গোড়ালীতে গালেনি। কাকা প্রশ্নপত্র ফেলে কোথায় পালালো তাকে আর খোঁজে পাওয়া যায়নি। দাদাও তার পিছু পিছু দৌড়। কিন্তু কাকাকে আর ধরতে পারেননি। পরের দিন কাকাসহ তার কোন বন্ধুই পরীক্ষার হলে যাননি। এমনকি সেই বছর কাকাকে স্কুলে কোন পরীক্ষাতেই অংশগ্রহণ করতে দেননি দাদা। তিনি স্কুলে ঢুকে তার সহকারী শিক্ষকদের বলেছিলেন তার সেই ছেলে যেন কোনভাবেই কেউ স্কুলে ঢুকতে না দেয়। কিন্তু অন্যান্য স্যারেরা (দয়া করে) তাকে পরবর্তীতে স্কুলে ঢুকে পড়ালেখা করতে দিয়েছে কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নিতে দেননি। এটাই ছিল তার শাস্তি। পরে জেনেছিলাম কাকার বন্ধুরা পরীক্ষা খারাপ করছে। এই ফল নিয়ে তারা হাইস্কুলে ভর্তি হতে পারবে না এই জন্যে কাকাকে দিয়ে এই কাজ করিয়ে ছিল।

যাইহোক কিন্তু এতে শাস্তি সবাইকেই কম বেশি পেতে হয়েছিল। আমার আব্বা ও অন্যান্য কাকারা সেই কাকাকে পিটিয়েছিল। তাকে এমন শাস্তি দেয়া হয়েছিল সে লজ্জায় অনেকদিন পরিবারের লোকদের কাছেও নিচু হয়ে থাকত। দেখে মনে হতো সে জেলখানার কয়েদি। আমরাও তার সাথে মিশতাম না। খেলতাম না। এমনকি সে যখন খাওয়া-ধাওয়া করতো তখন কেই তাকে সঙ্গও দিত না। সে সবার মাঝে থেকেও (আডক) একঘরে হয়ে গিয়েছিল। এই শাস্তি ছিল আরো ভয়ানক।

এখন আসি মূল পর্বে। প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্লে গ্রুপ থেকে বিসিএস। সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। কোনভাবেই সেটি রোধ করা যাচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাহেব অসংখ্য বুদ্ধি বের করেছেন কিন্তু তার কোন বুদ্ধিই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সেই চোরাইপথ বন্ধ করতে পারেননি। অবশ্য তিনি এখন বলছেন বিজি প্রেস থেকে নয় কেন্দ্রে নেয়ার পথে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এখানে তার কিছু করার নেই। ২৮ জানুয়ারি, জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রশ্নপত্র আগে বিজি প্রেস থেকে ফাঁস হয়ে যেত। আমরা বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার পরে এখন তা হয় না। দেড় মাস ধরে এসএসসি পরীক্ষা, আর আড়াই মাস ধরে এইচএসসি পরীক্ষা চলে। এই দীর্ঘদিন প্রশ্ন পাহারা দিয়ে রাখাটা কঠিন কাজ।’

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইনও কম যান না। তিনিও গণমাধ্যমে বলে চলছেন প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে নতুন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নতুন নতুন বুদ্ধি আবিষ্কার করছেন তারা। এখন নতুন বুদ্ধির মধ্যে যোগ হয়েছে (১) প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রিন্টার পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেই প্রিন্টারে তা প্রিন্ট হবে এগুলো দেয়া হবে শিক্ষার্থীদের হাতে। সচিব সাহেবের মাথায় কি বুদ্ধি না অন্যকিছু আছে তা জানি না। একটি থানায় ৫/৭ হাজার শিক্ষার্থী থাকে। এতগুলো প্রশ্ন প্রিন্ট দিতে কতক্ষণ সময় যাবে এই জ্ঞান নেই অথচ তিনি বড় কথা বলে যাচ্ছেন। আর প্রিন্টে আরো বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার সুযোগ থাকে। কেননা অনেক সময় ভালো ছাপা না হওয়ার অভিযোগে হাল্কা ছাপা প্রশ্নটি ডাস্টবিনে চলে যাবে সেখান থেকে পরীক্ষার্থীদের হাতে। (২) পদ্ধতিটি হচ্ছে ‘অটোমেটেডভাবে প্রশ্ন প্রণীত হবে। সবার কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করা হবে। কমিটি প্রশ্নের মান যাচাই করে প্রশ্ন ব্যাংক হবে।

এই পদ্ধতিতে গোপনীয়তা নিশ্চিত হবে জানিয়ে সচিব বলেন, যিনি অ্যাডমিনিস্ট্রেটের দায়িত্বে থাকবেন তিনিও জানবেন না কী সেটে প্রশ্ন হবে। পরীক্ষার ১৫ মিনিট আগে প্রশ্ন প্রণয়ন হতে পারে। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রের প্রতিটি পরীক্ষা কক্ষে স্ক্রিন থাকবে। পরীক্ষা শুরুর সময় অর্থাৎ ১০টায় সেটি ওপেন হবে, এতে প্রশ্ন ছাপানোরও প্রয়োজন নেই। পর্দায় দেখে দেখে পরীক্ষা দেবে শিক্ষার্থীরা। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ থাকবে না।’

বিডিমর্নিং এ ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘প্রশ্ন ফাঁসের রেকর্ড; নতুন পদ্ধতি প্রণয়নে যা ভাবছে মন্ত্রণালয়’ শীর্ষক সংবাদের এ কথা জানা গেল।

মিস্টার হাবার দারুণ বুদ্ধি। এভাবে পরীক্ষা দিলে যে তিনি নিজেও পাশ করতে পারবেন না সে কথা তাকে কে বুঝাবে? চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ‘প্রশ্ন ফাঁস হবে না, মন্ত্রী সাহেব সব পরীক্ষা নিন ‘এসিএসডিইএম’ মডেলে!‘ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লেখেছিলেন আরিফ চৌধুরী শুভ। সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে ৬টি ধাপের কথা বলা হয়েছিল। তার একটি সচিব সাহেবের কথার সাথে মিলে যাচ্ছে। কিন্তু সচিব সাহেব কি আরিফ চৌধুরী শুভ’র সেই নিবন্ধের বুদ্ধিটি যদি নিয়ে থাকেন তবে তাকে ডেকে নিয়ে বাকি বিষয়গুলোও তার সাথে কথা বলে পরিষ্কার করতে পারেন।

এই মডেলে বেশ কিছু বিষয় জটিল থাকলেও এক সাথে বসে আরো কিছু বুদ্ধি পরামর্শ করে আরো সহজ কিছু বের করা যেতে পারে।

তবে যত যা কিছু করা হোক না কেন মানুষের মধ্যে নৈতিকতা না থাকলে অটোমেটিভ কেন কোন মেটিভই কাজ করবে না। আর নৈতিকতা থাকলে প্রশ্নপত্র কাগজে ছাপা থাকলেও কেউ স্পর্শ করবে না। কিন্তু আমার সেই কাকার মতো বন্ধুদের সহায়তা করার জন্যে যদি চুরি করে বীর সাজতে যায় মাঝখান থেকে তার শিক্ষাজীবন শুধু নয় পারিবারিক জীবনও হুমকির মুখে পড়বে। তাই এসব প্রশ্নপত্রফাঁসে বেকুবের আনন্দবিলাস না করে মানুষের মাঝে নৈতিকতা তৈরির ব্যবস্থা নিন। আপনি আমি নিজে নৈতিকতা অনুস্বরণ করি তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না।

এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ ক্লাস হচ্ছে কিনা। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে পড়াশোনা করাচ্ছেন কিনা এসব তদারকি করে ক্লাসে ভালোভাবে পড়িয়ে পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ করা প্রয়োজন। সবাইকে মানুষের মত মানুষ করতে সকলের শ্রম স্বার্থক হোক।

লেখক: মুখপাত্র- নো ভ্যাট অন এডুকেশন

কমেন্টস