কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে চাই ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

ফারুক আহমাদ আরিফ-

মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনার উৎস। শুধু বাঙালি নয় বিশ্বের বুকে এটিই প্রথম ভাষাতাত্ত্বিক রাষ্ট্র। ১৯৫২ সালের সেই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের সেই লড়াকু সৈনিকদের খোঁজ রাখেনি রাষ্ট্র। নেই তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে সমৃদ্ধ কোন জাদুঘর।

সেই ৭৫০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলা পাল রাজবংশের আমলে বিকশিত বাংলা ভাষা হঠাৎ করেই নয় বরং দীর্ঘ সংগ্রাম করে সেন রাজাদের আমলে নিজের রাজশক্তি হারিয়ে কাঙালে পরিণত হয়।

তবে বাংলা ভাষার জন্ম নিয়ে একক মহল একক ধরনের মতামত দিয়ে যাচ্ছেন। কারো মতে হযরত আদম আ. এর পৌত্র বঙ থেকে বাঙাল। কারো মত ভিন্ন। সেদিকে আমি যাচ্ছি না।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদের ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’ বক্তব্যের প্রতিবাদে জ্বলে উঠা আগুন এক সময় মহান ভাষা আন্দোলনে রুপ নেয়। সেই আগুনে পাকিস্তানী জান্তারা পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে তারা বাঙালিকে দমিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু পেল না। অবশেষে তাদের সেই অন্যায়ের ফল দাঁড়াল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশাল পরাজয়।

ভাষা আন্দোলন ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ বছর চলা এক দীর্ঘ অান্দোলন। এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন অগনিত। আহত হয়েছেন হাজার হাজার। কেউ হয়েছেন স্বামীহারা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের সৈনিকদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি জাদুঘর নেই। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের দোতলায় ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’ নামে একটি ছোট্ট পরিসরে জাদুঘর উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ সেটির আর কোন উন্নতি অগ্রগতি নেই।

অন্যদিকে ২০০৫ সালে ধানমন্ডি ১০ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ভাষাসৈনিক কাজী গোলাম মাহবুবের পরিবারের প্রচেষ্টায় ‘ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও জাদুঘর’ নামে বেসরকারি উদ্যোগে একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকাটিসহ ভাষাসৈনিকদের ছবি, দুর্বল পত্রিকা, আসবাবপত্র  ও ভাষাসৈনিকদের দুর্লব দলিলপত্র রয়েছে।

ভাষাসৈনিকদের সাথে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় ধরা পড়লো যে, সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’ নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি জাদুঘর করা প্রয়োজন।

সেখানে ভাষাসৈনিকদের তালিকা, ছবি, দলিলপত্র, ভাষাসৈনিকদের ব্যবহার্য আসবাব বা তৈজষপত্র, বইপত্র রাখা যায়। কেননা ভাষা আন্দোলনের সৈনিকরাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বীজবপণকারী। তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন না করা হলে এই জাতির কোন অস্তিত্ব থাকে না। সম্মান থাকে না।

মুক্তিযুদ্ধবিষয় জাদুঘরটি যেভাবে সকলের সহযোগিতা নিয়ে করা হচ্ছে এটি ঠিক এমনিভাবে করা সম্ভব। প্রতিটি ঘর থেকে প্রত্যেক ব্যক্তিই তাঁর সাধ্যমত সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে।

ভাষাসৈনিক সাবির আহমেদ চৌধুরী, ভাষাসৈনিক সাবেক বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু, ভাষাসৈনিক ড. শরীফা খাতুন, ভাষাসৈনিক অধ্যাপক মনোয়ারা ইসলাম, ভাষাসৈনিক অধ্যাপক হালিমা খাতুন, ভাষাসৈনিক অধ্যাপক ফুলে হোসেন, ভাষাসৈনিক শামসুল হুদা, ভাষাসৈনিক খাজা মহিউদ্দীন আহমদ প্রমুখ ভাষাসৈনিকদের একই দাবি সরকার ভাষাসৈনিকদের স্মৃতি রক্ষার্থে এগিয়ে আসুক।

ভাষাসৈনিকদের একটি তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাদেরকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন, একুশে পদকসহ যাবতীয় পদকের সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক ভাষাসৈনিক তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে, কারো কারো প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কারো কারো স্মৃতিচারণমূলক বইয়ে এই দাবি দীর্ঘদিন যাবত করে আসছেন। ভাষা আন্দোলনের গবেষক ও ‘ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও জাদুঘর’র নির্বাহী পরিচালক এম আর মাহবুবও দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে যাচ্ছেন। তিনিও সরকারি পর্যায়ে একটি জাদুঘর করার দাবি জানিয়ে আসছেন।

এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে ভাষা আন্দোলনের উপর একটি জাদুঘর নির্মাণ করা প্রাণের দাবি। তাই সরকার এ বিষয়ে এগিয়ে আসবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

১৩ ফেব্রুয়ারি-২০১৮, রাত ৩টা ৩৫ মিনিট
লালমাটিয়া, ঢাকা-১২০৭

কমেন্টস