‘স্বাধীনতার জন্যে প্রথম বুলেটটি নিক্ষেপ করে পুলিশ’

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ৩, ২০১৭

সাব ইন্সপেক্টর (অবসর) মো. শাহজাহান মিয়া: ছবি-নাজমুস সাকিব

ফারুক আহমাদ আরিফ ও নাজমুস সাকিব-

পুলিশ কর্মকর্তা মো. শাহজাহান মিয়া। সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরিজীবন শেষ করলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে রযেছেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীরা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হত্যাকাণ্ড শুরু করেন সেই সংবাদ ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানিয়ে প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন তিনি। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করেছেন বাংলাদেশের বিভিন্নপ্রান্তে।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও বিজয় দিবসসহ যুদ্ধের নানা ঘটনাপ্রবাহ শুনতে বিডিমর্নিং মুখোমুখি হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়ার। সাক্ষাৎকারে ছবি তুলেছেন নাজমুস সাকিব। তিন পর্বে ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারটি আজ প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: রাত কয়টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্তানীরা হামলা করে?

মো. শাহজাহান মিয়া: পাকিস্তানীরা হামলা করার আগেই আমাদের পুলিশ তাদের ওপর হিট করে। আমাদের রাজারবাগ পুলিশ ফোর্সের দুটি পক্ষ দুটিপথে প্রতিরোধের জন্যে প্রস্তুতি নেয়। একটি শান্তিনগর, মালিবাগ হয়ে অপরটি মালিবাগ, মগবাজার হয়ে। চামিলীবাগ একটি পক্ষ জনসাধারণকে নিয়ে ব্যারিগেট সৃষ্টি করে যাতে পাকসেনারা না আসতে পারে। এখানে এসে তাদের যেন থামতে হয়। এটি ছিল তৎকালীন ডন হাই স্কুল। এটি ছিল তিন তলা বিশিষ্ট এখন এটিকে ইস্টার্ন প্লাস মার্কেট। ডন হাইস্কুলের ছাদে ১০-১২ জন পুলিশ অবস্থান করছিল। যখন সেনাবাহিনীর গাড়ি এসে এখানে দাঁড়ায় তখন ব্যারিগেটে বাধাগ্রস্ত হয়। তখন ব্যারিগেট ভাঙার জন্যে ১৫-২০ জন পাকসেনা গাড়ি থেকে নেমে পজিশন নেওয়ার আগেই প্রথম গুলিটি ছুড়ে পুলিশ। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের জন্যে প্রথম বুলেটটি নিক্ষেপ করে পুলিশ। সেটি ছিল ডন হাইস্কুলের ছাদ থেকে। সেই বুলেটের আঘাতেই দুই জন পাকসেনা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। তার পরেই তারা আক্রমণ করে। শত শত নয় হাজার হাজার বুলেট, মেশিনগান, মর্টার নিক্ষেপ করে। এটি ছিল রাত ১১টা ৫০ মিনিট। আর তখনি যুদ্ধটি শুরু হয়ে যায়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ২৫ মার্চ রাতে এক সাথে তিনটি স্থানে আঘাত করার কথা শোনা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে। আসলে কোনটি?

মো. শাহজাহান মিয়া: সেদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমাদের পুলিশের ৩-৫টি পেট্টোল পার্টি ও ওয়্যারলেস সেট ছিল। একটা ওয়্যারলেস সেট মুভমেন্ট করতেছিল তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। তার কল সাইন ছিল ‘চার্লি সেভেন’। সম্ভব নামটি হবে আমিরুল। তখন আমি ওয়্যারলেস বেইজড স্টেশন রাজারবাগে অবস্থান করছি। পাশেই সহযোদ্ধা মনির অবস্থান করছে। তখন অন্যান্য যারা ছিল তারা এই মেসেজটি পাওয়ার পর চলে যায়। মেসেজটি ছিল Curly seven for base how do here me over তার উত্তরে আমি বলি Biased for Curly seven laud and clear send your massage over তখন সে মেসেজ পাঠায় Abut 37 tracks loaded with pak (pakistan)  army are proceeding to dhaka city  from the cantonment over তখন আমরা নিশ্চিত হয়ে গেছি যে, তারা ক্যান্টমেন্ট থেকে বের হয়ে শহরের দিকে আসছে। তখন আমার পাশের অনেকেই চলে যায়। কেউ কেউ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকেই চলে যায়। আবার অনেকেই আমার সাথে অবস্থান করে। এই মেসেজটা পাওয়ার পর আমরা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, পাকিস্তানীরা হামলা চালাবে। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, আমাদের অস্ত্রাগারের সামনে সময়ের যে ঘণ্টা বাধানো। রেললাইনের পাত দিয়ে তৈরি ঘণ্টা। এটাকে পাগলাঘণ্টা বলা হয়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: এটি জেলখানাতেও আছে।

মো. শাহজাহান মিয়া: হ্যাঁ, সর্বত্রই আছে। তখন অস্ত্রাগারের একজন সশস্ত্র পুলিশ নিজ উদ্যোগেই সেটি বাজাতে থাকে। আগে আসছিল স্ব-উদ্যোগে, মরণের জন্যে। পাগলাঘণ্টা বাজানোর পরে যারা আসতে চায়নি তারাও চলে আসে অস্ত্রাগারের সামনে। তখন তারা উদ্বুদ্ধ ও উত্তেজিত হয়ে নিজেরাই শ্লোগান দিতে শুরু করে। বলতে লাগল বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। পদ্মা-মেঘনা যমুনা, তেমার আমার ঠিকানা ইত্যাদি…। তখন তারা অস্ত্রেও জন্যে চিৎকার করতে শুরু করলো। আগে যে অস্ত্রাগারটি খোলা হয়েছিল তা শেষ হয়ে যায়। আরেকটি অস্ত্রাগার ছিল সেখানে অনেক অস্ত্র। সেটি খোলার জন্যে চেষ্টা করতে লাগলো। অস্ত্রাগারের তালা খোলার কোন পরিবেশ নেই। প্রথমে বন্দুকের রাইফেলের গুলি দিয়ে খোলা যায় কিনা। আসলেতো গুলি করে খোলা যায় না। পরে শাবল দিয়ে সেটি ভাঙে। কারণ অস্ত্রাগারের তালাতো খুব শক্ত।  আরো ১০০-১৫০ ফোর্স অস্ত্র নিয়ে চলে যায়। ১১টা ৫০ মিনিটের সময় প্রথম বুলেটটি যখন পুলিশ নিক্ষেপ করে তার বিনিময়ে পাকিস্তানীদের ট্যাংক, কামান, মেশিনগান থেকে বৃষ্টির মত গুলি ছুড়ে। তখন আমি ও কামাল ওয়ারলেস স্টেশনে। তখন আমি কি করবো?  বঙ্গবন্ধুতো ৭ মার্চের ভাষণে তার নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন। তখন আমি কি করবো? তখন আমার বুদ্ধিতে, নিজের সাহসে, নিজের জীবনকে বিপন্ন করে একটা মেসেজ লেখলাম। সবাইকে যেন জানাতে পারি আমরা পাকসেনা দ্বারা আক্রান্ত। আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি। তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তোল, নিজেদের রক্ষা কর। মেসেজটি সারাদেশের প্রতিটি পুলিশ স্টেশনে, প্রতিটি সাবডিভিশনে পৌঁছে মেসেজটি পাঠাই। মেসেজটি হলো- Base for all station of east Pakistan police, very very important massage for you, keep note, keep listening, watch. ‘We are already under attacked by Pak army, try to save yourself, over and out.”মেসেজটা আবার বললাম। তখন কয়েকটি জেলা থেকে স্টেশন থেকে Roser out, Rose aloud বলে প্রাপ্তি স্বীকার করা হয়। পরে সারাদেশ থেকে ফিরতি মেসেজ আসতে থাকে। তারপর এখানে আর থাকার মত না। হঠাৎ অন্ধকারাছন্ন হয়ে যায় পুরো ঢাকা শহর। টেলিফোন লাইনও বিচ্ছিন্ন।

ফারুক আহমাদ আরিফ: কয়টা বাজে?

মো. শাহজাহান মিয়া: ১২টার উপর। আমি চেষ্টা করেছিলাম মনিরকে নিয়ে জেনারেটর চালু করতে কিন্তু সম্ভব হয়নি। তখন মনিরসহ বেরিয়ে পড়লাম। ৪ তলার ছাদে উঠলাম হামাগড়ি দিয়ে।  দেখলাম সেখানে আরো ২০-৪০ জন সেখানে রয়েছে। সেখানে ম্যানহলের ঢাকনা ছিল তা দিয়ে বেরিগেটের ব্যবস্থা করলাম। মনির, আবু সামা, গিয়াসউদ্দিন, সালামসহ আমরা ৫ জন।  প্রথম দিকে পাকসেনাদেও সাথে আমাদের যুদ্ধ হয়নি। রাত আড়াইটা পর্যন্ত তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভিতরে ঢুকতে পারেনি। সেখানে ৫টি ব্যারাক ছিল এসব ব্যারাক ট্যাঙ্কেও সাহায্যে ভেঙে ভিতরে ঢুকে। সেখানে ছিল প্রসাশনিক বিল্ডিং এর দিকে আসতে থাকে। একটি শহীদবাগ অপরঠি ছিল চামেলিবাগের দিকে। হেভি মেশিনগান, লাইট মেশিনগান সব কিছু তারা ব্যবহার। তখন ১০০-১৫০ পুলিশ শাহাদাৎবরণ করে। অনেকে আগুনে পুড়ে মারা যায়। প্রসাশনিক ভবনের দিকে যখন এগিয়ে আসে তখন রাত আড়াইটা থেকে তিনটা তখন তারা এলএমজি দিয়ে সরাসরি গুলি করছে আমরাও রেলিং ধরে গুলি করছি। ওয়াল ছিদ্র হয়ে কামানের গোলা, মর্টারের গোলা ঢুকতাছে। তখনতো টিকার মতো পরিবেশ নাই। যখন দেখা গেল আমাদের ২০-৩০ রাউন্ডি গুলি এগুলো শেষ হয়ে আসছে তখন আমাদের কেউ কেউ রেলিং বেয়ে, পাইপ বেয়ে নিচে নেমে কাঁটাতারের বেড়া টপকিয়ে বেরিয়ে চামিলিবাগ দিয়ে চলে যায়। আমরা ৫ জন ছাদে আটকে যায়। তার মধ্যে একজন ছাদে মারাও যায়। আগুন এসে পড়ছে, পিআর এর ব্যারাকের টিন এসে পড়ছে। তখন আমরা ৫ জন পানির টাংকির নিচে আশ্রয় নিই। তারা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে ডাকদে থাকে। তুমসাবকো লা জাও হেন্ডসাফ কারলিয়ে। বাইনচুতকা বাচ্চা কাহা মে। এসব বলে খোঁজাখুজি করতে থাকে। তখন তাকিয়ে দেখে আমরা কয়েকজন পানির টাংকির নিচে। তাদেও ডাকে যখন আসছি না তখন তারা বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে বের করে আনে। তখন বলে আমাদের হেন্ডসাব। তখন আমরা তাদের সামনে ৫ জন হাত উঁচু করে দাঁড়াই। তখন এসএমজি হেভি মেশিনগান দিয়ে আমাদের দিকে ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। ওদেরতো হেভি নিশান সঠিক  স্পেসিফিক কিন্তু ইচ্ছা করেই আমাদের মাথার ২/১ ইঞ্চি উপর দিয়ে ফায়ার করে। ভাবছি এখানেই মৃত্যু কিন্তু না। আমাদেরকে রাইফেল, রাইফেলে বাট দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে নিচে নামিয়ে আনে। সেখানে কনক্রিটের রাস্তা ছিল। সেখানে দেখা গেল এক থেকে দেড়শ পুলিশ সদস্য আমরা এখানে আটকে গেলাম। তারমধ্যে ২০-৩০ ম্যাসের কর্মচারী। তখন ১৫০ মত পুলিশ ছিল। ‘বিজয়ের মাসে বিজয়ীদের কথা’

কমেন্টস